নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলাধীন সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ল্যাব সহকারী (অপারেটর) পদে নিয়োগ দেওয়ায় তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তারের মাসিক বেতন ভাতা (এমপিও) বন্ধ করে দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) বেতন বন্ধের বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল শিক্ষাবার্তা’কে নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে “বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়: ২ বছর পর জানা গেল তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক“, ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘তদন্ত গিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিলেন জামালপুর শিক্ষা অফিসের চার কর্মকর্তা” শিরোনামে এবং সর্বশেষ গত ৩০ জুন ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে “এমপিও বন্ধে শোকজ: বকশীগঞ্জের প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষককে বাঁচাতে মাউশিতে তদবির“ শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
মাউশি সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলাধীন সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ল্যাব সহকারী (অপারেটর) পদে নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, জামালপুর এবং জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলাদা দুইটি তদন্ত করে মাউশিতে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। প্রাপ্ত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর ১৮.১ এর (গ) এবং (চ) ধারা মোতাবেক বেতন ভাতার সরকারী অংশ কর্তন করা হবে না, পত্র প্রাপ্তির ১০ কর্ম দিবসের মধ্যে জবাব প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক প্রথমে তার জবাব না দিলে মাউশি ২য় বার শোকজ করেন। ২য় শোকজের জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর ১৮.১ এর (গ) এবং (চ) ধারা মোতাবেক বেতন ভাতার সরকারী অংশ কর্তন করা হয়।
জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকের শ্যালিকা সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তা এবং প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজা ল্যাব সহকারী (অপারেটর) মোঃ মহসিন আল সিফাত এর নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও শুধু মাত্র প্রধান শিক্ষক এবং সহকারি প্রধান শিক্ষকের বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি জানতে চাইলে মাউশির মাধ্যমিকের শিক্ষা কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন জানান, ল্যাব সহকারী মোঃ মহসিন আল সিফাতের বিষয়টি গত ৩ আগস্ট ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে শুনানী করা হয়েছে। অচিরেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে পারবেন।
শিক্ষাবার্তার অনুসন্ধানে ও জেলা প্রশাসক এবং জামালপুর জেলা শিক্ষা অফিসের করা তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিগত টানা ১৬ বছর ধরে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তার শ্বশুর গোলাম মোস্তফাকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে বোর্ড থেকে বাগিয়ে এনেছেন। এবং এই সময়ে কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির নিকট আত্মীয়। যে কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় সেই কমিটি ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড অনুমোদন দেয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। অর্থ্যাৎ দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১। এই নিয়োগ দেখানো হয় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে অর্থ্যাৎ তড়িঘড়ি কমিটির মেয়াদ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়। প্রকৃত পক্ষে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারীরা জানতে পারেন ৮ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখের পর যখন টানা ১৬ বছর পর সভাপতি গোলাম মোস্তফা সভাপতি পদ হারান।
বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারী ও বর্তমান কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত খাতা কলমে এই নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ নভেম্বর ২০২১ ইং তারিখের পর যখন মোঃ গোলাম মোস্তফা বিদ্যালয়টির এডহক সভাপতি। যেহেতু এডহক কমিটি এই নিয়োগ দিতে পারে না এবং গোলাম মোস্তফা টানা ১৬ বছর কমটির সভাপতি থাকার ফলে পরবর্তীতে আর সভাপতি হবার সুযোগ পাবেন না নিশ্চিত হবার পর তড়িঘড়ি করে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ইং তারিখের নিয়মিত কমিটির একদম শেষ মুহুর্তে অর্থ্যাৎ ব্যাকডেট দেখিয়ে ১১ ফেরব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে নিয়োগ দেখানো হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া সভাপতি গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের শ্যালিকা শরিফা আক্তারের হাজিরা খাতার স্বাক্ষর দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
জানা গেছে, পূর্বের তারিখে দেখিয়ে নিয়োগ দেওয়া সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তার বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে নিয়োগ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান দেখানো হলেও ৩০ অক্টোবর ২০২২ ইং তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয়টির হাজিরা খাতায় সহকারী শিক্ষক পদের স্বাক্ষর করেছেন তিনি। ১ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখ থেকে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে স্বাক্ষর করছেন। শুধু তাই নয় পূর্বের তারিখে ভুয়া রেজুলেশন এবং ভুয়া নিয়োগ বিধিতে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার আরও একটা প্রমাণ পাওয়া যায় এমপিওশীট দেখে। ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেখানো হলেও তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে এমপিওভুক্ত হন নিয়োগ পাওয়ার ১৭ মাস পরে।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, অনিয়ম করে নিয়োগ জালিয়াতি করে কেউ পার পাবে না। দুর্নীতির বিষয়ে মাউশি জিরো টলারেন্স। তদন্তের প্রতিবেদনের আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
