বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়: ২ বছর পর জানা গেল তিনি সহকারী প্রধানশিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ে জালিয়াতি করে এবং পূর্বের তারিখ দেখিয়ে পারিবারিক ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে সভাপতির মেয়ে ও প্রধান শিক্ষকের শ্যালিকাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজাকে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ও সাবেক সভাপতির বিরুদ্ধে। 

জানা গেছে, ২০২১ সালের ৯ জানুয়ারি ইং তারিখে নাম সর্বস্ব জাতীয় দৈনিক এশিয়া বাণী এবং ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাহান পত্রিকার কপি কম্পিউটারের দোকান থেকে ‘এডিট করে’ একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও একজন ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এই দুই পত্রিকার অরিজিনাল কপিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখানো তারিখে সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ের কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি। এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয় বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক শরিফা আক্তার যিনি বিদ্যালয়টির তৎকালীন সভাপতি গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের শ্যালিকা। উল্লেখ্য যে, বিদ্যালয়টির তৎকালীন সভাপতি গোলাম মোস্তফা প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের আপন শ্বশুর। অন্যদিকে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজা মোঃ মহসিন আল সিফাতকে। এই নিয়োগ পরীক্ষার জন্য যে ডিজি প্রতিনিধি চেয়ে আবেদন করা হয় সেই আবেদনের কপি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাওয়া যায়নি। 

শিক্ষাবার্তার অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত টানা ১৬ বছর ধরে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তার শ্বশুর গোলাম মোস্তফাকে  ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে বোর্ড থেকে বাগিয়ে এনেছেন। এবং এই সময়ে কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির নিকট আত্মীয়। যে কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় সেই কমিটি ময়মনসিংহ শিক্ষা  বোর্ড অনুমোদন দেয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। অর্থ্যাৎ দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১। এই নিয়োগ দেখানো হয় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে অর্থ্যাৎ তড়িঘড়ি কমিটির মেয়াদ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়। প্রকৃত পক্ষে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারীরা জানতে পারেন ৮ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখের পর যখন টানা ১৬ বছর পর সভাপতি গোলাম মোস্তফা সভাপতি পদ হারান।  

বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারী ও বর্তমান কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত খাতা কলমে এই নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ নভেম্বর ২০২১ ইং তারিখের পর যখন মোঃ গোলাম মোস্তফা বিদ্যালয়টির এডহক সভাপতি। যেহেতু এডহক কমিটি এই নিয়োগ দিতে পারে না এবং গোলাম মোস্তফা টানা ১৬ বছর কমটির সভাপতি থাকার ফলে পরবর্তীতে আর সভাপতি হবার সুযোগ পাবেন না নিশ্চিত হবার পর তড়িঘড়ি করে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ইং তারিখের নিয়মিত কমিটির একদম শেষ মুহুর্তে অর্থ্যাৎ ব্যাকডেট দেখিয়ে ১১ ফেরব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে নিয়োগ দেখানো হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া সভাপতি গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের শ্যালিকা শরিফা আক্তারের হাজিরা খাতার স্বাক্ষর দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বের তারিখে দেখিয়ে নিয়োগ দেওয়া সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তার বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে নিয়োগ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান দেখানো হলেও ৩০ অক্টোবর ২০২২ ইং তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয়টির হাজিরা খাতায় সহকারী শিক্ষক পদের স্বাক্ষর করেছেন তিনি। ১ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখ থেকে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে স্বাক্ষর করছেন। শুধু তাই নয় পূর্বের তারিখে ভুয়া রেজুলেশন এবং ভুয়া নিয়োগ বিধিতে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার আরও একটা প্রমাণ পাওয়া যায় এমপিওশীট দেখে। ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেখানো হলেও তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে এমপিওভুক্ত হন নিয়োগ পাওয়ার ১৭ মাস পরে। 

কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর নিয়োগে তিনজনকে প্রার্থী দেখানো হয়। এরা হলেন, কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে তিনজন প্রার্থী তার মধ্যে, মহসিন আল সিফাত (যিনি নিয়োগ পেয়েছেন) প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজা,  মোঃ শাহরিয়ার পারভেজ (প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজা) মহসিন আল সিফাতের আপন বড় ভাই এবং সিদরাতুল মুনতাহা সুলতানা হল শাহরিয়ার পারভেজ এর আপন শ্যালিকা। 

এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এর বহির্ভুত পদ অর্থ্যাৎ প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক  ও কর্মচারী নিয়োগে যদি প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সভাপতির কোন আত্মীয় প্রার্থী হন তাহলে সেই নিয়োগ বোর্ডে প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সভাপতি উপস্থিত থাকতে পারবেন না। নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তার সভাপতি গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং প্রধান শিক্ষকের আপন শ্যালিকা। এছাড়া ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থী প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের আপন ভাতিজা। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের উপস্থিত থাকার কথা না থাকলেও তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ডিজি প্রতিনিধি হিসেবে বকশীগঞ্জ উলফাতুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এই আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে বকশীগঞ্জের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অন্তত অর্ধশত ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত থাকা বকশীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছারোয়ার আলমের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি অবসরে চলে গেছেন। 

নিয়োগ জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। 

অন্যদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছারোয়ার আলম অবসরে চলে যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।  বর্তমানে বকশীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ ফাঁকা রয়েছে। 

জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির বর্তমান সভাপতি ও বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অহনা জান্নাত ছুটিতে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

জানতে  চাইলে জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এস.এম.মোজাম্মেল হাসান অসুস্থ্য থাকায় তিনি কোন বক্তব্য দিতে পারেননি। 

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রওশন আরা খান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন। 

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজিজ উদ্দিন বলেন, অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১২/১০/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.