নিজস্ব প্রতিবেদকঃ অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে তদন্তকারী চার কর্মকর্তা প্রধান শিক্ষকের বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে দফারফা করে সরেজমিনে তদন্ত শেষ করেছেন জামালপুর জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারি পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম, সহকারি পরিদর্শক মো. শফিকুল আলম, সহকারি পরিদর্শক জাকারিয়া হোসেন এবং গবেষণা কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। যদিও তদন্তের চিঠিতে তিন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ থাকলেও তদন্তে যান চার কর্মকর্তা। আর তদন্তে যাওয়া ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রধান শিক্ষক হলো, জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।
গত ১২ অক্টোবর ২০২৪ ইং তারিখে “বকশীগঞ্জের সাধুরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়: ২ বছর পর জানা গেল তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর প্রকাশিত সংবাদের কপি সংযুক্ত করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে ১৪ অক্টোবর লিখিত অভিযোগ দেন বিদ্যালয়টির সদ্য সাবেক অভিভাবক সদস্য মোঃ মনিরুল ইসলাম। বিষয়টি দ্রুত আমলে নিয়ে জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয় মাউশি। জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এই তদন্তের দায়িত্ব দেন জেলা শিক্ষা অফিসের তিন কর্মকর্তাকে। গতকাল ২ নভেম্বর সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে তদন্তে আসেন তারা।
জানা গেছে, জালিয়াতি করে এবং পূর্বের তারিখ দেখিয়ে পারিবারিক ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে সভাপতির মেয়ে ও প্রধান শিক্ষকের আপন শ্যালিকাকে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজাকে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে নিয়োগ দেয় বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ও সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা। এই গোলাম মোস্তফা প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের শ্বশুর।
শিক্ষাবার্তার অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত টানা ১৬ বছর ধরে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তার শ্বশুর গোলাম মোস্তফাকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে বোর্ড থেকে বাগিয়ে এনেছেন। এবং এই সময়ে কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির নিকট আত্মীয়। যে কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় সেই কমিটি ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড অনুমোদন দেয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। অর্থ্যাৎ দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১। এই নিয়োগ দেখানো হয় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে অর্থ্যাৎ তড়িঘড়ি কমিটির মেয়াদ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়। প্রকৃত পক্ষে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারীরা জানতে পারেন ৮ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখের পর যখন টানা ১৬ বছর পর সভাপতি গোলাম মোস্তফা সভাপতি পদ হারান।
বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারী ও বর্তমান কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত খাতা কলমে এই নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ নভেম্বর ২০২১ ইং তারিখের পর যখন মোঃ গোলাম মোস্তফা বিদ্যালয়টির এডহক সভাপতি। যেহেতু এডহক কমিটি এই নিয়োগ দিতে পারে না এবং গোলাম মোস্তফা টানা ১৬ বছর কমটির সভাপতি থাকার ফলে পরবর্তীতে আর সভাপতি হবার সুযোগ পাবেন না নিশ্চিত হবার পর তড়িঘড়ি করে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ইং তারিখের নিয়মিত কমিটির একদম শেষ মুহুর্তে অর্থ্যাৎ ব্যাকডেট দেখিয়ে ১১ ফেরব্রুয়ারি ২০২১ ইং তারিখে নিয়োগ দেখানো হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া সভাপতি গোলাম মোস্তফার মেয়ে এবং প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের শ্যালিকা শরিফা আক্তারের হাজিরা খাতার স্বাক্ষর দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল তদন্তে আসা কর্মকর্তারা যে সকল কাগজে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যায় তা তারা চাননি। অভিযোগকারী বিষয়গুলো তুলে ধরতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রধান শিক্ষককে সে সকল কাগজ প্রধান শিক্ষককে জেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে পরবর্তীতে দিয়ে আসতে বলেন। তদন্তে স্কুলে উপস্থিত থাকা দুই ঘন্টা সময় পুরোটাই প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর তদন্ত শেষে কর্মকর্তারা প্রধান শিক্ষকের বাসভবনে প্রবেশ করে দীর্ঘ দুই ঘন্টা পর বের হন। প্রধান শিক্ষকের আতিথিয়তা শেষ মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে দফারফা করে বাসা থেকে বের হইন। এই সংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও চিত্র শিক্ষাবার্তা’র হাতে এসেছে।
অভিযোগকারী মনিরুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, তদন্তে এসে তদন্তকারী কর্মকর্তারা অভিযুক্তের বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষে বের হওয়ায় কি প্রমাণ করে না তারা তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পৃথিবীর কোথায় তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্তের বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে? এছাড়া বিদ্যালয়ে তদন্তে এসেও তারা সরাসরি প্রধান শিক্ষকের পক্ষে এসে কাজ করেছেন। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক বলে বেড়াচ্ছেন, একদিনেই তদন্ত শেষ করে দিলাম। অভিযোগ দিয়ে কি করতে পারল? আমরা যারা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা সবাই হতাশ হয়েছি। সরকার পতন হলেও এইসব ঘুষ বাণিজ্যের কারণে আমরা হাসিনার আমলেই রয়ে গেছি।
জানা গেছে, জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এস.এম.মোজাম্মেল হাসান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। প্রায় সময়ই তিনি স্বশরীরে তদন্তে যেতে পারেন না। ফলে তিনি তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর অফিসের কর্মকর্তাকে পাঠান। আর এই সুযোগে মোটা অংকের আখের গুছিয়েছেন তারা।
এছাড়া জেলা শিক্ষা অফিসের অন্যতম ঘুষ বাণিজ্যের হোতা হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন। টানা আট বছর জেলা শিক্ষা অফিসে কর্মরত থেকে ঘুষ বাণিজ্যের আখরায় পরিণত করেছেন তিনি। স্কুলে জাল সনদের সাপ্লাইয়ের হিসেবে পরিচিত তিনি। ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া অনেক শিক্ষকের জাল সনদ সরবরাহ করেছেন তিনি। এছাড়াও টাকার বিনিময়ে শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করানোর লিয়াজুকারী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত তাঁর।
তদন্তে গিয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বাসায় গিয়ে খাবার খাওয়ার নিয়ম আছে কি’না জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারি পরিদর্শক মো. শফিকুল আলম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, তার বাসায় গিয়েছি এটা ঠিক। কিন্তু খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছিল না। কেউ ডাকলে তো না করা যায় না।
প্রধান শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে তদন্তকরার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা সঠিক না। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি অস্বীকার করেন।
সহকারি পরিদর্শক মো. শফিকুল ইসলাম শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, আসলে এই উদ্দেশ্যে তার বাসায় যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এস.এম.মোজাম্মেল হাসান শিক্ষাবার্তা’কে বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ বলেনি। আমি অসুস্থ্য থাকায় তাদেরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যার বিরুদ্ধে তদন্ত তাঁর বাড়িতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করা সঠিক করেনি। আমি খোঁজ নিচ্ছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৩/১২/২০২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
