শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের মোবাইল নিষিদ্ধ: শিক্ষার মানোন্নয়নে খোড়া যুক্তি

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

ডিজিটাল যুগে শিক্ষার মান উন্নয়নে কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা আলোচনা চলছে। উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে আরও প্রাণবন্ত ও বাস্তবমুখী করতে শ্রেণিকক্ষে ট্যাবলেট, স্মার্টফোন, ডিজিটাল বোর্ড, ইন্টারনেটভিত্তিক কনটেন্ট—এসবকে অন্তর্ভুক্ত করছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র প্রায়ই চোখে পড়ে। সম্প্রতি চাঁদপুর জেলার শিক্ষা প্রশাসন মাধ্যমিক পর্যায়ে ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, যেখানে অন্যতম একটি শর্ত হলো—কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্যও বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন আনার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে—এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ ভালো না হওয়ায় শিক্ষার মান উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাবিদরা প্রশ্ন তুলছেন—ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যুগে মোবাইল নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ২৯ আগস্ট শিক্ষা দপ্তরে চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়—জেলার মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অংশীজনদের সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে ১৩টি জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসএসসি ফলাফলের মান নিয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক সমালোচনার মুখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ডিসির দাবি, সাম্প্রতিক কর্মশালায় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা দপ্তরের প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা একমত হয়েই এসব নিয়ম তৈরি করেছেন।

নির্দেশনাগুলোতে শুধুই মোবাইল নিষিদ্ধ নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা।তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ।শিক্ষককে ক্লাস শুরুর ১৫ মিনিট আগে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক। প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং ব্যবসা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন।শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকেই প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া।অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন। নিয়মিত হোমওয়ার্ক ও ক্লাস টেস্ট। ডিজিটাল ল্যাবের ব্যবহার বৃদ্ধি।দুপুরের নাশতায় অভিভাবকদের উৎসাহ দেওয়া।টিফিন ব্রেকের পর হাজিরা গ্রহণ।শ্রেণিকক্ষে আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি ভর্তি না করা ইত্যাদি। জেলা প্রশাসকের এই ১৩ দফা প্রশংসায় ভাসলেও  এই ১৩ দফার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের নির্দেশনা।

শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর হাতে মোবাইল থাকা শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর নাকি উপকারী—এ নিয়ে দেশে-বিদেশে বহু গবেষণা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষকরা মোবাইল ব্যবহার করে পাঠদানকে আরও কার্যকর করছেন। যেমন—ক্লাসে দ্রুত তথ্য যাচাই। অডিও-ভিডিও কনটেন্ট দেখানো। ডিজিটাল লার্নিং অ্যাপ ব্যবহার।হোয়াইটবোর্ডের বিকল্প হিসেবে মোবাইল থেকে প্রজেক্টর চালানো। শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইন কুইজে অংশগ্রহণ করানো এসবের মাধ্যমে পাঠ্যবিষয়কে প্রাণবন্ত করে তোলা যায়।

কিন্তু চাঁদপুরের প্রশাসন মোবাইলকে বরং “বিক্ষিপ্তির হাতিয়ার” হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করলে মনোযোগ নষ্ট হয়, ক্লাসের পরিবেশ নষ্ট হয়, এমনকি শিক্ষার্থীরাও মোবাইলকে নকলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। প্রশ্ন হলো—ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে, প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে তা নিষিদ্ধ করাই কি সমাধান?

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেমন ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া—শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। তারা মোবাইল নিষিদ্ধ করছে না, বরং নিয়ন্ত্রিত ও শিক্ষাবান্ধব ব্যবহার নিশ্চিত করছে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মোবাইলভিত্তিক কুইজ খেলেন। সিঙ্গাপুরে ক্লাসরুমে ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়। ভারতে অনেক রাজ্যে শিক্ষকদের মোবাইল ব্যবহার করে পাঠদানকে সমর্থন জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়, বরং সঠিকভাবে কাজে লাগানোই এখনকার মূল প্রবণতা।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে—মোবাইল নিষিদ্ধের বদলে ব্যবহারবিধি নির্ধারণ করা উচিত। শিক্ষকরা যেন পড়ানোর সময়ে মোবাইলকে সহায়ক টুল হিসেবে কাজে লাগান, সেটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। যদি শিক্ষক মোবাইল অপব্যবহার করেন, তার জন্য নীতিমালা প্রয়োগ করা উচিত—কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের মোবাইল নিষিদ্ধ  যৌক্তিক নয়।

একজন শিক্ষক ব্যঙ্গ করে বলেন—“যে দেশে ডিজিটাল ল্যাব বানানো হয়েছে, সেখানে শিক্ষককে মোবাইল ছাড়া ক্লাসে পাঠানো মানে সৈনিককে বন্দুক ছাড়া যুদ্ধে পাঠানো।” বেশিরভাগ শিক্ষক মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা তাদের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করছে।শিক্ষকের উপস্থিতি ঠিক আছে কি না, তা নিয়ন্ত্রণ করা যৌক্তিক। শিক্ষকের কোচিং ব্যবসা সীমিত করা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য।কিন্তু মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত আসলে শিক্ষকের মর্যাদাকে খাটো করছে। তাদের প্রশ্ন—শিক্ষকের যদি মোবাইল ব্যবহার সত্যিই ক্ষতিকর হয়, তবে কেন সরকারি প্রশিক্ষণগুলোতে ই-লার্নিং ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়?

শিক্ষকেরা যদি নিয়ম মানতে অনীহা প্রকাশ করেন, প্রশাসনের পক্ষে সবকিছু মনিটর করা কঠিন হবে। অর্থাৎ, নীতিমালা দেওয়া সহজ; কিন্তু বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে—শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে মোবাইল নিষিদ্ধ করে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষককে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা মানে শিক্ষার্থীকেও প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অভিভাবক-বিদ্যালয়ের সম্পর্ক মজবুত করা, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা—এসব পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। কিন্তু শিক্ষককে মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

ডিজিটাল যুগে শিক্ষককে মোবাইল ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠানো মানে অন্ধকারে আলো নিভিয়ে জ্ঞানচর্চা করার চেষ্টা করা। এর বদলে প্রশাসনের উচিত হবে—শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া, সঠিক গাইডলাইন তৈরি করা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। কারণ, প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করে নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব।

লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা ।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ৩০/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.