ভর্তি শূন্য শত শত কলেজ: শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির প্রথম ধাপের ভর্তি ফলাফলে দেখা গেছে, সারা দেশের ৮,০১৫ কলেজ ও মাদরাসার মধ্যে ৩৭৮টি কলেজে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। দ্বিতীয় ধাপে বেড়ে হয়েছে ৪১৩ কলেজ। এটি নিছক সংখ্যা নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে— এই শত শত কলেজে যখন শিক্ষার্থী নেই, তখন এর দায় নেবে কে?

সমাজ সচেতনরা মনে করেন শিক্ষার্থীরা আজ কলেজ বেছে নিচ্ছে মান, অবকাঠামো, শিক্ষক ও ফলাফলের ভিত্তিতে। যেখানে সুনাম নেই, ল্যাব-লাইব্রেরি নেই, যোগ্য শিক্ষক নেই—সেই কলেজগুলো স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারাচ্ছে। রাষ্ট্রের শিক্ষা পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। গত এক দশকে অনুমোদন পেয়েছে বহু বেসরকারি কলেজ, কিন্তু মান নিশ্চিত হয়নি। এর ফলে অনেক কলেজ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অচল হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা ঢাকাসহ কিছু নামকরা কলেজকে ঘিরেই প্রতিযোগিতায় নামছে। ফলে নগরকেন্দ্রিক চাপ তৈরি হচ্ছে, অথচ প্রান্তিক অঞ্চলের কলেজগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। এ বৈষম্যই স্পষ্ট করছে শিক্ষাব্যবস্থার অক্ষমতা।

অনেকে মনে করেন এখনই সময় প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার । যেসব কলেজে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না, সেগুলোকে হয় মানোন্নয়ন করতে হবে, নইলে একীভূত বা ভিন্নধর্মী শিক্ষায় (ভোকেশনাল/টেকনিক্যাল) রূপান্তর করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে গ্রামীণ কলেজে বিশেষ প্রণোদনা চালু করা জরুরি। যদি এখনই সংস্কার না হয়, তবে ভবিষ্যতে “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা” কেবল স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।

বাংলাদেশে শত শত কলেজে ভর্তি শূন্য থাকার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব একটি প্রধান কারণ। দেশে প্রায় ৯,৩১৪টি কলেজ ও মাদ্রাসায় ২৭ লাখের বেশি আসন থাকলেও, মাত্র ২৪০-২৫০টি কলেজ মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করে। ফলে, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা ঢাকার নটর ডেম, ভিকারুননিসা বা রাজউকের মতো নামকরা কলেজে ভর্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে, যেখানে আসন সংখ্যা সীমিত। এর ফলে গ্রামীণ ও কম মানের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে অনীহা প্রকাশ করে। এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা আসনের তুলনায় কম। ২০২৫ সালে ১৩ লাখ ৩ হাজার শিক্ষার্থী পাস করলেও, মাত্র ১০ লাখ ৭৩ হাজার ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। কারিগরি শিক্ষা বা বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক কারণে অনেকে উচ্চশিক্ষায় না গিয়ে ঝরে পড়ছে। শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যা গ্রামীণ কলেজগুলোকে অপ্রিয় করে তুলেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা শহরকেন্দ্রিক মানসম্মত কলেজ পছন্দ করেন। এছাড়া, কুমিল্লা বোর্ডের মতো কিছু অঞ্চলে গণিতে দুর্বল ফলাফলের কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এই সমস্যা সমাধানে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষা বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছাড়া ভর্তি শূন্যতার সমস্যা ক্রমশ তীব্র হবে।

 শত শত কলেজে শিক্ষার্থী না পাওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর যে প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো- এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মানের বৈষম্য প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীরা নামকরা ও ভালো সুবিধাসম্পন্ন কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতা করে, ফলে কম পরিচিত বা অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল কলেজগুলো উপেক্ষিত থাকে। এটি গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আগ্রহ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়, যা শিক্ষার সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষার প্রতি উচ্চ প্রত্যাশা এবং নির্দিষ্ট কলেজে ভর্তির চাপ শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কলেজ না পাওয়া তাদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে, যা শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।

 এই পরিস্থিতি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থী না থাকলে কলেজগুলোর আয় কমে, যা শিক্ষকদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে শিক্ষার মান আরও হ্রাস পেতে পারে।

অধিকাংশ কলেজ গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব বা আঞ্চলিক চাহিদা বিবেচনা না করেই। অনেক স্থানে উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই, তবুও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদানের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। তৃতীয়ত, বেকারত্বের চাপে শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী শিক্ষা বা কারিগরি খাতে ঝুঁকছে, যা সাধারণ কলেজভিত্তিক শিক্ষাকে আরও অনাকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এই সমস্যার সমাধানে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে জনসংখ্যা, শিক্ষার্থী চাহিদা ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষণ করতে হবে। বিদ্যমান কলেজগুলোতে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আইসিটি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে কলেজগুলোকে কর্মমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। চতুর্থত, দুর্বল কলেজগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী কলেজ একীভূত করে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করা। যদি শিক্ষার্থীরা দেখে যে পড়াশোনা শেষে কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়ন ও সুযোগ রয়েছে, তবে তারা আবারও কলেজমুখী হবে। অন্যথায়, ভর্তি শূন্য কলেজগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের প্রতীক হয়ে থাকবে।

ভর্তি শূন্য শত শত কলেজ আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের এক স্পষ্ট চিত্র। তবে এই সংকট কোনোভাবেই অমোচনীয় নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে পরিস্থিতি পরিবর্তন সম্ভব। প্রথমত, কলেজগুলোর সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান কলেজগুলোতে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক ল্যাব, লাইব্রেরি, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হলে পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজার ও জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো কলেজ পর্যায়ে সংযোজন করলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত হবে।

অনিয়ন্ত্রিত অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ করে একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা নীতি অনুসারে কলেজ স্থাপন করতে হবে। যেখানে জনসংখ্যা, প্রয়োজন ও কর্মসংস্থান বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং শিক্ষার প্রয়োজনই হবে প্রধান মানদণ্ড।

সবশেষে, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ও সামাজিকভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। কলেজগুলোকে স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

অতএব বলা যায়, ভর্তি শূন্য কলেজের শূন্যতা দূর করতে হলে শুধু ভবন নয়, প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। সময়োপযোগী উদ্যোগ নিলে এই শূন্যতা পূর্ণ হবে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নে, আর শিক্ষাব্যবস্থা হবে জাতির প্রকৃত শক্তি।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ৩০/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.