একটি ‘ভাই’ ডাক কতটা ভয়ংকর? প্রমাণ করলেন গাইবান্ধার এসিল্যান্ড

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থার শিকড় যত গভীরে, তত গভীরে গেঁথে আছে সম্বোধন সংস্কৃতি। “স্যার” বলাটা যেন একটি অলিখিত আইন। কিন্তু এই সংস্কৃতির বৈধতা কতটা? আর যখন কোনো নাগরিক এই অলিখিত নিয়ম ভেঙে “ভাই” বলে সম্বোধন করে, তখন কী হওয়া উচিত?

সম্প্রতি গাইবান্ধা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও এক গণমাধ্যমকর্মীর মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সোমবার দুপুরে সময় টেলিভিশনের গাইবান্ধা প্রতিনিধি বিপ্লব ইসলাম জমির খারিজ সংক্রান্ত তথ্য জানতে এসিল্যান্ড মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ফোন দেন। আলাপের সময় সাংবাদিক তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করলে এসিল্যান্ড হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন,
“এসিল্যান্ডকে ভাই বলার কোনো বিধান নেই।” এরপর তিনি কল কেটে দেন। সাংবাদিক একাধিকবার কল করলেও তা রিসিভ করা হয়নি। পরে আবার ফোন রিসিভ করলে তিনি সাংবাদিককে জানান, আগে ঠিক সম্বোধন শিখে তারপর ফোন করতে হবে।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনজ্ঞরা মতামত দিতে থাকেন।

গাইবান্ধা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন: “আইনে কাউকে ‘স্যার’ বলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাজ জনগণকে সেবা দেওয়া। সম্বোধন নিয়ে শর্ত চাপানো আইনবিরোধী।”

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন, সরকারি বিধিমালা বা প্রশাসনিক আচরণবিধিতে কোথাও উল্লেখ নেই যে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে অবশ্যই ‘স্যার’ সম্বোধন করতে হবে। অর্থাৎ ‘স্যার’ বলা বাধ্যতামূলক নয়, বরং এটি একটি সামাজিক রীতি বা শিষ্টাচার হিসেবে প্রচলিত।

স্যার সম্বোধন নিয়ে আইনের ব্যাখ্যায় বলা আছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) ও ২১(২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া এবং বিনয়ের সঙ্গে আচরণ করা।

অতএব, কর্মকর্তারা সেবক, প্রভু নন। সম্বোধন নিয়ে কোনো জোরজবরদস্তি বা শর্ত চাপানো সাংবিধানিক নীতির বিরোধী।

1979-এ সরকারি কর্মচারীর আচরণ বিধিতে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা নাগরিকের সঙ্গে শালীন ও বিনয়ী আচরণ করবেন। কিন্তু নাগরিককে ‘স্যার’ বলতেই হবে—এমন কোনো ধারা নেই।

সংবিধানের ২১(২) অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা নাগরিকের সেবক। সম্বোধন নিয়ে হুমকি বা অপমান করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে (বিশেষ করে ইসলামের আলোকে) সরকারি কর্মকর্তার এই আচরণ—সম্বোধনের কারণে নাগরিককে অপমান করা—কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ইসলামে ক্ষমতার অবস্থানে থাকা ব্যক্তির জন্য বিনয়, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল আচরণ কঠোরভাবে নির্দেশ করা হয়েছে।

কুরআন ও হাদিসে বলা হয়েছে, ক্ষমতা একটি আমানত (trust)। সরকারি কর্মকর্তা হলে সে জনগণের সেবক, প্রভু নয়।

কুরআনে আল্লাহ বলেন:“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করবে।”(সূরা আন-নিসা: ৫৮)

অর্থাৎ, সরকারি দায়িত্ব পালন মানে জনগণের প্রতি ন্যায় ও সমান আচরণ করা। সম্বোধনের মতো তুচ্ছ কারণে খারাপ ব্যবহার করা এই ন্যায়নীতির পরিপন্থী।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:“যার অন্তরে সরিষা দানার পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”(সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১)

‘স্যার’ না বলার কারণে ক্ষিপ্ত হওয়া আসলে অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ক্ষমতার কারণে নিজেকে উঁচু ভাবা বড় গুনাহ।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থে রাজা বা প্রশাসকের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের কল্যাণ করা।মনুস্মৃতি (৭.৩৫) বলছে: “রাজা প্রজাদের রক্ষা করবে পুত্রের মতো। যে প্রজাদের কষ্ট দেয়, সে নিজের বিনাশ ডেকে আনে।”

অতএব, সম্বোধনের কারণে নাগরিককে অপমান করা ধর্মীয় নীতি লঙ্ঘন।

কেমন অপরাধ :
বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা যদি কোনো নাগরিককে ‘স্যার’ সম্বোধন না করার কারণে খারাপ ব্যবহার করেন, তাহলে এটি আইনি, প্রশাসনিক এবং নৈতিক—তিন দিক থেকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

১৯৭৯ সালের আচরণবিধির ধারা ৩: সরকারি কর্মকর্তা সর্বদা শালীন, বিনয়ী ও জনগণবান্ধব আচরণ করবেন। কোনো ধরনের রূঢ় আচরণ, অপমান, হুমকি বা অসদাচরণ এই বিধির লঙ্ঘন।

২০১৮ সালের শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার ধারা ৩:
যদি কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অসদাচরণ করেন বা আচরণবিধি ভঙ্গ করেন, তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া নাগরিক সনদ (Citizen’s Charter) অনুযায়ী প্রত্যেক সরকারি দপ্তর বাধ্যতামূলকভাবে সেবা দিতে বাধ্য। সম্বোধনের কারণে সেবা না দেওয়া দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হবে।

শাস্তির ধরন হতে পারে:

সতর্কবার্তা, ভর্ৎসনা, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত (বেতন বৃদ্ধির সুবিধা বন্ধ),পদাবনতি (Demotion),চাকরিচ্যুতি পর্যন্ত শাস্তি (Dismissal).

নাগরিক চাইলে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন:

জেলা প্রশাসক (ডিসি) অফিসে,বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে।

বাংলাদেশের কোনো আইন বা সরকারি বিধিমালায় উল্লেখ নেই যে, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ বলতেই হবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একজন সরকারি কর্মকর্তা আসলে জনগণের সেবক। অথচ এই সেবকের মানসিকতা যখন উল্টো রূপ নেয়, তখন এমন ঘটনা ঘটতে বাধ্য।

‘স্যার’ সংস্কৃতি কোনো নতুন বিষয় নয়। এর শেকড় ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশ শাসনামলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ‘স্যার’ বলা হতো ক্ষমতার শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য। স্বাধীনতার পরও এই অভ্যাস থেকে বের হতে পারেনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।

আজও সরকারি অফিসে গেলে দেখা যায়, নিচের থেকে উপরের স্তর পর্যন্ত সবাই একে অপরকে ‘স্যার’ বলছে। এমনকি সমবয়সী বা জুনিয়র কর্মকর্তারাও সিনিয়রকে ‘স্যার’ ছাড়া সম্বোধন করেন না। এতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের শ্রেণি বিভাজনমূলক মানসিকতা, যা নাগরিকের সঙ্গে কর্মকর্তার সম্পর্কেও প্রতিফলিত হয়।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই মন্তব্য করেন:

-“স্যার না বলার কারণে ক্ষেপে যাওয়া ঔপনিবেশিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।”

-“জনগণের টাকায় বেতন নেওয়া একজন কর্মকর্তার উচিত নম্র থাকা।”

-“ভাই বলে সম্বোধন করা অসম্মানজনক নয়। বরং এটি বন্ধুত্বপূর্ণ।”

এখানে মূল প্রশ্ন হলো—কীভাবে একজন নাগরিক সরকারি কর্মকর্তাকে সম্বোধন করবেন?

বাংলা ভাষায় সম্বোধনের জন্য বিভিন্ন শব্দ আছে—স্যার, ভাই, আপনি, মহোদয়, সম্মানিত ইত্যাদি। এদের মধ্যে কোনোটিই আইন দ্বারা বাধ্যতামূলক নয়। সম্বোধন ব্যক্তির শিষ্টাচার ও ভদ্রতার পরিচায়ক।
কিন্তু যখন এটি বাধ্যবাধকতা বা ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।

সরকারি কর্মকর্তারা নাগরিকের সেবক—এটি সাংবিধানিক সত্য। কিন্তু বাস্তবে চিত্র উল্টো। অনেক কর্মকর্তার মধ্যে দেখা যায় ‘আমি ক্ষমতাবান, তাই আমাকে বিশেষ সম্মান দিতে হবে’—এমন মানসিকতা।

এটি শুধু ব্যক্তিগত অহংকার নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। নবীন কর্মকর্তাদেরও প্রশিক্ষণে অনেক সময় শেখানো হয়—কীভাবে ‘প্রোটোকল’ বজায় রাখতে হয়। কিন্তু সেখানে সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে সমান সম্মান ও সহমর্মিতা শেখানো হয় না।

প্রশ্ন হলো—এ ধরনের আচরণের জন্য প্রশাসনে কোনো মানসিক সংস্কার কর্মসূচি আছে কি? না থাকলে, এখনই তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার সময় এসেছে।

গণতন্ত্রে সম্বোধনের স্বাধীনতা যেমন আছে, তেমনি আছে ভদ্রতার বাধ্যবাধকতা। কিন্তু সম্বোধন নিয়ে হুমকি বা অপমানের পরিস্থিতি তৈরি করা অনৈতিক এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

আমাদের প্রশাসনে মানবিকতার ঘাটতি আছে—এটাই বাস্তবতা। সম্বোধন কোনো সম্মান নয়, আচরণই প্রকৃত সম্মান।

কোনো নাগরিক একজন কর্মকর্তাকে ভাই, স্যার, মহোদয়—যা-ই বলুক না কেন, তার প্রাপ্য সেবা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।

এটি শুধু আইনি নয়, নৈতিক দায়িত্বও বটে। সমাজে যদি এমন অবস্থান তৈরি হয় যে সম্বোধন দিয়ে শ্রেণি বিভাজন নয়, বরং সহমর্মিতা ও সমতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখনই আমরা সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগোতে পারব।

লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা। 

শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.