।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এই চিরন্তন সত্যটি শুধু একটি বাক্য নয়, বরং একটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সভ্যতার ভিত্তি। আর এই শিক্ষাব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষকরা। কিন্তু সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের ঘিরে একটি প্রস্তাব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে—সেটি হলো দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ছুটির পরিমাণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা।
বর্তমানে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ৭৬ দিন ছুটি দেওয়া হয়ে থাকে। সরকার চায় এই ছুটি ১৬ থেকে ২০ দিন কমিয়ে ৫৬ থেকে ৬০ দিনে নামিয়ে আনতে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বছরের বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, দুর্যোগ কিংবা প্রশাসনিক কারণে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তাই নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করতেই এই পরিকল্পনা।
প্রথম দর্শনে এই সিদ্ধান্ত যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। শিক্ষকরা বলছেন, এটি হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ কাগজে-কলমে ৭৬ দিন ছুটি থাকলেও শিক্ষকরা বাস্তবে কখনোই তা ভোগ করতে পারেন না। সরকারি বিভিন্ন দিবস, জাতীয় অনুষ্ঠান, প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি পালন করতে হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য ছুটি থাকলেও শিক্ষকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। অন্য পেশাজীবীদের অনেকেরই এসব দিবসে কর্মস্থলে যেতে হয় না, কিন্তু শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে গিয়ে অনুষ্ঠান পালন করেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ—এই সিদ্ধান্ত আসলে শিক্ষকদের প্রতি একধরনের বৈষম্য। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন; তাকে পরীক্ষার দায়িত্ব, প্রশাসনিক মিটিং, পাঠ পরিকল্পনা, ট্রেনিং, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, এমনকি নির্বাচন ও জরুরি সরকারি কাজে যুক্ত হতে হয়। এসব দায়িত্ব পালনের পর ছুটি বলতে যা বোঝায়, তা নিছকই এক মিথ।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে শিক্ষক সমাজের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ আরও বাড়বে। এতে শিক্ষকদের কর্মউৎসাহ কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পাঠদানের মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি—ছুটি কমানো কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি কমাতে পারে? উত্তরটি সহজ নয়। কারণ শিক্ষার মান শুধু সময় দিয়ে মাপা যায় না। এটি নির্ভর করে গুণগত পাঠদান, উপযুক্ত শিক্ষক, কার্যকর কারিকুলাম এবং পাঠদানের পরিবেশের ওপর। শুধু ক্লাসের সময় বাড়ালেই শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। বরং একঘেয়েমি ও ক্লান্তি শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহহীনতা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত ছুটি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন, ফিনল্যান্ড, কানাডা, জাপান ইত্যাদি দেশে শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক পুনরুজ্জীবনের সুযোগও রয়েছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে, শিক্ষক যদি সুস্থ, স্বস্তিকর ও প্রফুল্ল থাকেন, তাহলে পাঠদানও হবে প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। একদিকে রয়েছে শিক্ষক-সংকট, অন্যদিকে রয়েছে পদোন্নতি ও বেতন বৈষম্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পাঠ্যসূচির চাপ, প্রশিক্ষণের অভাবসহ নানা সমস্যা। তার ওপর ছুটি কমিয়ে দিলে এটি হবে শিক্ষকদের প্রতি আরেক দফা অনিচ্ছাকৃত অবমূল্যায়ন।
আরও একটি দিক স্মরণে রাখা প্রয়োজন—নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী। কারণ হিসেবে উঠে আসে—প্রাপ্ত সম্মান, বেতন ও পেশাগত পরিবেশের অভাব। এই বাস্তবতায় ছুটি হ্রাসের সিদ্ধান্ত তরুণদের শিক্ষকতা পেশা থেকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে।
তবে সরকার যে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ নিতে চায়—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সেই উদ্যোগ হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, বাস্তবভিত্তিক এবং শিক্ষক-সমাজের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে। ছুটি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে কি? তারা কি এতে সম্মত? নাকি এটি শুধুই প্রশাসনিক ভাবনা?
শিক্ষার উন্নয়ন কেবল শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক নয়—এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবেশ, নীতি ও ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফসল। শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা দেখিয়েই একটি শক্তিশালী শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষকরা যদি ক্লান্ত, হতাশ ও অনুৎসাহী হন, তবে সেই ক্লাসরুমে জ্ঞানের আলো নয়, বরং নিস্তেজতা ছড়াবে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন সময়ের দাবি। তবে সেই পরিবর্তন হতে হবে বাস্তবতানির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক। ছুটি কমিয়ে নয়, বরং শিক্ষকদের প্রকৃত অবস্থা বুঝে তাদের সম্মান, বিশ্রাম ও পেশাগত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চায়, তাহলে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
