।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। কারণ, এই পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এই বৃত্তি মূলত সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষায় উৎসাহ দিতে এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। কিন্তু সমালোচকরা এটিকে বৈষম্যমূলক বলছেন। প্রশ্ন হলো—সরকারের যুক্তি কতটা যৌক্তিক?
পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি ঐতিহ্য। এর মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা প্রদান, যাতে তারা উচ্চতর শিক্ষায় অগ্রসর হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তি থেকে উপকৃত হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র ইনফরমেশন অফিসার আব্দুল্লাহ শিবলী সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত পরিবারের। এই বৃত্তি তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তারা ফি দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে, তাই সরকারি অর্থায়নে বৃত্তি দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের উদ্যোগে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বৃত্তি পরীক্ষা নেয়, যেখানে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারে না। ফলে সরকারি বৃত্তি পরীক্ষা কেবল সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে।
সংবিধানের ১৭(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে সকল শিশু শিক্ষা লাভের সমান সুযোগ পাবে।” এছাড়া ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুযায়ী সরকার বিনা খরচে প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেবে।
সমালোচকরা বলছেন, একই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে থাকা সত্ত্বেও একটি শ্রেণিকে আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা বৈষম্যমূলক। কারণ কিন্ডারগার্টেনের সব শিক্ষার্থী সচ্ছল নয়; অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারও সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পাঠায়।
সরকারের মতে, এই বৃত্তি পরীক্ষার লক্ষ্য হলো পিছিয়ে পড়া সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। যেহেতু কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় ফি দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে, তাই তাদের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন নেই।
তাছাড়া, মন্ত্রণালয় বলছে, এখানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই, কারণ বেসরকারি স্কুলের অভিভাবকরা নিজেদের অর্থে শিক্ষা গ্রহণের পথ বেছে নিয়েছেন।
সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি রাখা নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়, কারণ তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে দুর্বল। তবে এর অর্থ এই নয় যে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের সবাই সচ্ছল। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারও সন্তানকে স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করায়। তাই সমান সুযোগের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সরকারের করনীয় :
একক জাতীয় বৃত্তি পরীক্ষা: সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
আয়ভিত্তিক বৃত্তি: শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানের ধরন নয়, পরিবারের আয় বিবেচনায় বৃত্তি প্রদান।
সমন্বিত নীতি: সরকার ও কিন্ডারগার্টেন খাতের মধ্যে সমন্বয় করে সবার জন্য ন্যায্য সুযোগ তৈরি করা।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বৃত্তি পরীক্ষা বৈষম্যমূলক কি না, তা বিতর্কযোগ্য বিষয়। সরকারের যুক্তি বাস্তবতাভিত্তিক হলেও সংবিধানের আলোকে সমতার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করা যায় না। শিক্ষা মৌলিক অধিকার; তাই যে কোনো নীতিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বৃত্তি পরীক্ষার কাঠামোতে পরিবর্তন বা নতুন সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া এই বিতর্কের সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষা যদি সবার হয়, তবে সুযোগও সবার হওয়া উচিত।
লেখক: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৩/০৮/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
