এইমাত্র পাওয়া

“৫৪ বছর পরও শিক্ষকরা রাস্তায়—জাতীয়করণ হবে কবে?”

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষক সমাজ ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলন কেবল কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত শিক্ষকদের জীবনমান, সামাজিক মর্যাদা এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন এতো বছরের দাবি আজও বাস্তবায়িত হয়নি? অদৃশ্য বাধাগুলো কোথায়?

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর শিক্ষাব্যবস্থার বড় সংস্কারের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলেই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়, যেখানে শিক্ষার প্রসার, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে যায়।

স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষকরা সবসময় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। প্রতিবাদস্বরূপ শিক্ষক সংগঠনগুলো গত পাঁচ দশকে অসংখ্যবার আন্দোলন করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষক সংগঠনগুলো ১০ দিন, ২০ দিন, এমনকি ৪০ দিন পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি, অনশন, আমরণ কর্মসূচি পালন করেছে এবং নির্যাতিত হয়েছে।

এ আন্দোলনের পথে কেবল কষ্ট নয়, ঝরেছে রক্তও। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার—সবকিছুই সহ্য করেছেন শিক্ষকরা। এমনকি আন্দোলন ভণ্ডুল করতে জোরপূর্বক অনশন ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও জাতীয়করণের দাবিটি আজও পূরণ হয়নি।

আমরা প্রায়ই বলি—“শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। শিক্ষাই ৭৫% অবদান বেসরকারি শিক্ষকদের তবুও সরকারি শিক্ষকরা নানা সুবিধা পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা এখনো অনিশ্চয়তা ও অবহেলার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বর্তমানে একজন শিক্ষক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান করেন মাত্র ১২,৫০০ টাকা বেতনে। বাড়িভাড়া ভাতা বাবদ প্রাপ্ত হন ১,০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থে একজন শিক্ষকের পরিবার কীভাবে চলবে? রাজধানীতে গড় বাসা ভাড়া যেখানে ১৫-২০ হাজার টাকা, সেখানে ১,০০০ টাকার বাড়িভাড়া ভাতা কেবল তামাশা মাত্র।

এ বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক কষ্টের নয়; এটি শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের অবমূল্যায়নের প্রতীক। এমন অবস্থায় শিক্ষকতা পেশা অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়ছে, মেধাবীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

দেশকে উন্নত করতে হলে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। জাতীয় বাজেটের মাত্র ১.৭৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে ৪-৬ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ করে থাকে।

অবাক করা তথ্য হলো—সম্প্রতি এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৭৩ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয় আছে। অথচ শিক্ষকরা বঞ্চিত? এ প্রশ্নের জবাব কারও কাছে নেই।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়ে বলেন, “সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে মাত্র ২১০ কোটি টাকা প্রয়োজন”।

এ বিষয়ে প্রফেসর বদরুল ইসলাম বলেন, ” শিক্ষা জাতীয়করণে সরকারের সদিচ্ছায় যথেষ্ট এবং শিক্ষার ও শিক্ষকদের গুণগত মানোন্নয়নে এটি অনিবার্য । এজন্য সরকারের উচিত দ্রুত শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা “।

বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক (সেক্রেটারি) প্রকৌশলী মো: আলমগীর হোসেন  বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও আমরা সমান মর্যাদা পাইনি। দেশের কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবিতে বারবার আন্দোলন করতে হচ্ছে—এটাই কি আমাদের প্রাপ্য? আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলি, অথচ নিজেরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাই। যতক্ষণ না জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, ততক্ষণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বাধ্য হব।”

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষক নেতা এনামুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষকরা আশা করে আসছেন যে একদিন আমরা আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য পাব। কিন্তু ৫৪ বছর কেটে গেলেও সেই দিনটি এলো না। প্রতিটি সরকারের কাছে আমরা বারবার প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। আজও শিক্ষকরা রাস্তায়—এটা দেশের জন্য লজ্জার। শিক্ষক সমাজকে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যতকে অবহেলা করা। আমরা চাই অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হোক।”

শিক্ষক সংগঠনের মহিলা নেতা নাজমা হোসেন লাকী বলেন,“অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে আমরা ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছি। নারী শিক্ষক হিসেবে আমাদের কষ্ট আরও বেশি—পারিবারিক দায়িত্ব সামলে রাস্তায় আন্দোলনে নামতে হয়। প্রতিটি সরকারের কাছে আমরা বারবার প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষক সমাজকে অবমূল্যায়ন করা মানে জাতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করা। আমরা চাই, অবিলম্বে জাতীয়করণের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক।”

প্রশ্ন হলো—এতো অল্প অর্থ ব্যয়ে যদি জাতীয়করণ সম্ভব হয়, তাহলে কেন সরকার তা করছে না? সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকে বলেন, “জাতীয়করণ করলে সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।” অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলন থেকে যায়। শিক্ষার গুণগত মানও কোন পরিবর্তন হয় না। কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে—

১. রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব: জাতীয়করণ একটি বড় সিদ্ধান্ত। এতে প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে।
২. বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মালিকদের স্বার্থ: অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে মুনাফা লাভের অন্যতম খাত তৈরি করেছে।

৩. ম্যানেজিং কমিটির দৌরাত্ম্য: ম্যানেজিং কমিটি বা পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদস্যরা নানাভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পান। জাতীয়করণ হলে তাদের সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যাবে।

৪. অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপের ভয়: জাতীয়করণের ফলে শিক্ষকদের সংখ্যা কয়েক লাখ বেড়ে যাবে, যা সরকারের জন্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

কিন্তু এ ধরনের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া  দেশ উন্নত হওয়া সম্ভব নয়—এ সত্য সবাই জানে।

ফিনল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি ভারত—এই দেশগুলোর নাম আমরা শিক্ষা মানের উদাহরণ হিসেবে শুনি। সেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। কেন? কারণ, রাষ্ট্র বুঝেছে—“শিক্ষক যত স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবেন, শিক্ষার্থীরা তত ভালো শিক্ষা পাবে।”

ফিনল্যান্ডে একজন শিক্ষক গড়ে ৪,০০০ ইউরো বেশি বেতন পান। দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে সরকারি সহায়তা অব্যাহত। বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। বেসরকারি শিক্ষকরা চাকরির নিরাপত্তা নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, পেনশন নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে শিক্ষকতার পেশা মেধাবীদের কাছে অনাকর্ষণীয়।

 যেকারণে জাতীয়করণ জরুরি :

* শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে।
* সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য কমবে।
*শিক্ষা খাতের মান উন্নত হবে।
* শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে এবং
* মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে উৎসাহিত হবে।

কী হতে পারে সমাধান?

১. ধাপে ধাপে জাতীয়করণ শুরু করা: একসাথে সব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
২. শিক্ষা বাজেট বাড়ানো: জিডিপির কমপক্ষে ৪-৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে হবে।
৩. বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন: বাজারদর অনুযায়ী বেতন ও ভাতা সমন্বয় করা জরুরি।
৪. শিক্ষাখাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো: ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা কমিয়ে শিক্ষকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৫. শিক্ষকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা: পেনশন, চিকিৎসা সুবিধা এবং আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলন কেবল বেতন বৃদ্ধির লড়াই নয়; এটি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সরকার যদি শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে এই দাবি অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—আর কতদিন? আর কত অনশন? আর কত শিক্ষক প্রাণ হারালে সরকার জাতীয়করণের পথে হাঁটবে? উত্তর খুঁজছে শিক্ষকমণ্ডলী, উত্তর খুঁজছে পুরো জাতি।

লেখক: সম্পাদক,  শিক্ষাবার্তা।

শিক্ষাবার্তা /এ/ ০৪/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.