।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
পরিবার মানুষের প্রথম আশ্রয়স্থল। বাবা-মায়ের মমতা, দয়া, স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েই গড়ে ওঠে একটি শিশুর জীবন। সেই ঘরই যদি নেশার আগুনে জ্বলে যায়, তবে তার চেয়ে মর্মান্তিক আর কিছু হতে পারে না। সম্প্রতি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের অন্তরকে নাড়া দেয়। নেশার টাকার জন্য মা-কে নির্যাতন করেছে এক তরুণ, শেষ পর্যন্ত অসহায় বাবা-ই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন ছেলেকে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়ে তার তিন মাসের কারাদণ্ড হয়েছে। ঘটনাটি নিছক একটি পরিবারকে ঘিরে নয়, বরং সমগ্র সমাজে মাদকের ভয়াবহ দংশনের নগ্ন চিত্র।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ মাদকের ফাঁদে আটকে পড়ছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইনসহ নানা নেশাজাতীয় দ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। অল্প বয়সেই যুবকরা কৌতূহল কিংবা হতাশা থেকে নেশা গ্রহণ শুরু করে। একসময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়। এরপর তারা শুধু নিজের জীবনই ধ্বংস করে না, পরিবারের ওপরও নেমে আসে দুর্ভোগের পাহাড়।
তোফাজ্জল ইসলামের ঘটনাটি একক কোনো দৃষ্টান্ত নয়। হাজারো পরিবার প্রতিদিন নেশাগ্রস্ত সন্তানদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। বাবার ঘামঝরা পরিশ্রমের টাকা কিংবা মায়ের গহনা বিক্রি করেও সন্তানকে বাঁচাতে চাইছে পরিবার। কিন্তু নেশার নেশায় অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষ সব সম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন করে দেয়।
মা এমন এক শব্দ, যার মধ্যে মমতা, স্নেহ আর ত্যাগ নিহিত। সন্তানকে আগলে রাখতে মা নিজের জীবন বাজি রাখেন। সেই মায়ের ওপর যখন সন্তান হাত তোলে, তখন তা শুধু পারিবারিক অপরাধ নয়, সমাজের জন্যও এক কলঙ্ক। তোফাজ্জল বারবার মায়ের গায়ে হাত তুলত, টাকা না পেলে করত শারীরিক নির্যাতন। একজন মা হয়তো সবকিছু সহ্য করতে পারেন, কিন্তু প্রতিদিনের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন যে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল, তা বোঝাই যায় বাবার পুলিশের কাছে ছেলেকে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত থেকে।
একজন বাবা ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন—এটি কল্পনা করাই কঠিন। ছেলের প্রতি ভালোবাসা সবসময়ই বাবার হৃদয়ে অটুট থাকে। কিন্তু যখন সন্তান সমাজ ও পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তখন কঠিন এই সিদ্ধান্তই নিতে হয়। প্রবাস থেকে ফিরে হাবিব মিয়া ছেলেকে সংশোধনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হন। এই সিদ্ধান্তে বাবার বেদনা স্পষ্ট হলেও একইসঙ্গে এর মধ্যে সমাজের জন্য বড় একটি শিক্ষা আছে—অপরাধকে প্রশ্রয় দিলে তা আরও বাড়বে।
মাদক কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না; এর প্রভাব গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্ত তরুণ যখন টাকা না পায়, তখন চুরি, ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ড ঘটাতেও দ্বিধা করে না। অনেক তরুণ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এতে সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। তাই মাদকবিরোধী লড়াই আসলে শুধু একটি পরিবারের স্বার্থে নয়, পুরো জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জরুরি।
মাদকের বিস্তার রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তবুও মাদকের প্রবাহ বন্ধ হচ্ছে না। কারণ, একদিকে পাচার চক্রের দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছে। মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হলেও প্রমাণের অভাবে অনেক আসামি ছাড়া পেয়ে যায়। এর ফলে সমাজে মাদকের ভয়াবহতা কমছে না।
মাদকাসক্তির একটি বড় কারণ হলো শিক্ষার অভাব ও সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি। অনেক তরুণ হতাশায় ভুগে নেশায় আসক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবারে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্বও একটি কারণ। আজকের ডিজিটাল প্রজন্ম মোবাইল, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থেকে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই শূন্যতা পূরণে মাদক প্রবেশ করছে।
ইসলামসহ সব ধর্মেই নেশা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। মাদক শুধু দেহ নয়, মন ও আত্মাকে কলুষিত করে। কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নেশাজাতীয় দ্রব্য মানুষকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক চেতনা যদি পরিবার থেকে শৈশবে সন্তানকে দেওয়া যায়, তবে অনেকটা মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস।
পরিবারকে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সচেতনতার দুর্গে পরিণত করতে হবে। নিয়মিত আলোচনা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের মাদকের ভয়াবহতা জানাতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, পাড়া-মহল্লা, ক্লাব—সব জায়গায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে হবে।
পুনর্বাসন কেন্দ্র বৃদ্ধি করতে হবে। যারা ইতিমধ্যেই আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সমাজে ফেরাতে কার্যকর পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু করতে হবে।
নেশার আগুনে প্রতিদিন অগণিত পরিবার পুড়ছে। সন্তান যখন মায়ের গায়ে হাত তোলে, তখন তা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কোম্পানীগঞ্জের ঘটনার মতো হাজারো পরিবার প্রতিনিয়ত অসহায়ভাবে নীরবে কষ্ট পাচ্ছে। এখন সময় এসেছে চোখ খুলে দেখার, কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। মাদককে প্রশ্রয় দিলে পরিবার ধ্বংস হবে, সমাজ ভেঙে পড়বে, রাষ্ট্র অচল হয়ে যাবে।
সুতরাং, আজকের প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। না হলে “নেশার আগুনে পুড়ছে ঘর”—এই শিরোনাম আগামী দিনে আরও ভয়াবহ আকারে আমাদের চোখের সামনে হাজির হবে।
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/২৬/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
