রোমান উদ্দিন।।
অত্যাচারী শাসক বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত অভিযোগে ইতিহাসে বহুবার আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন শিক্ষকরা। ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯-১৭৯৯) পর গির্জা বা রাজতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের পুরোনো শাসনের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯০-এর দশক) পর কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগে উপেক্ষিত হয়েছেন শিক্ষকেরা।
ইতিহাসের অন্যতম মহান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার হিটলারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর পদ গ্রহণ করেছিলেন এবং হিটলারের ফ্যাসিবাদকে সরাসরি সমর্থন না করলেও বিরোধিতা করেননি। এদিকে তার অনেক অনুসারী ও ছাত্র ফ্যাসিবাদবিরোধী তাত্ত্বিক হিসেবে আজও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তারা তাদের চিন্তার বিকাশে হাইডেগারের অবদান স্বীকারও করেন, কিন্তু হিটলারের পতনের পর মহান এই জার্মান দার্শনিককেও বিচারের কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হয়। তার বিরুদ্ধেও ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। যদিও বিচারে তার কোনো অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে পুনরায় স্বপদে ফিরতে বলা হয়। অবশ্য তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি। আরব বসন্তের (২০১০-২০১২) সময় মিশর ও তিউনিসিয়ায় পুরোনো শাসকের সমর্থক হিসেবে শিক্ষকদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করার ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ আফ্রিকার পোস্ট-অ্যাপার্টহাইড (১৯৯৪-এর পর) সময়ে বর্ণবৈষম্যনীতিতে যুক্ত শিক্ষকদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের (১৯৬৬-১৯৭৬) সময় সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয় শিক্ষকদের ওপর; ?
ছাত্ররা শিক্ষকদের বিপ্লববিরোধী বলে অভিযুক্ত করে অপমান, অত্যাচার এমনকি হত্যাও করেছে। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। প্রতিটি ঘটনারই আলাদা প্রেক্ষাপট থাকলেও শিক্ষকদের ওপর আক্রমণের একটি সাধারণ কারণ ছিল ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কিংবা বিপ্লবের পর তাদের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা। আবার কখনো কখনো তাদের বিপ্লবের বিরোধী পক্ষ হিসেবেও দেখা হয়েছে।
যা হোক, যে কোনো দেশে আমূল পরিবর্তন ঘটানো আন্দোলনে শিক্ষকদের ওপর যে খড়গ নেমে আসে, তা নতুন কিছু নয়। কারণ, শিক্ষকরাও দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তারা একই দেশের ভেতর থাকা আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নন। তাই যে কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে তাদের যেমন সম্পৃক্ততা থাকে, তেমনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভুক্তভোগীও হতে হয়। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও একই রকম চিত্র দেখা যায়।
বাংলাদেশে বহুবার সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে এবং সফল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পরিবর্তনও ঘটেছে। তবে গত ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল একটি উদাহরণ বটে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে নানা রকম সংঘাতমূলক ঘটনা ঘটেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অপদস্থ, অপমানিত, হেয় ও পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটে।
গত ১৬ বছর বাংলাদেশের প্রত্যেকটি খাতের মতো শিক্ষা খাতেও চরম দলীয়করণ হয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ সামনে আসছে। ফলে আন্দোলন- পরবর্তী সময়ে ঐসব সুবিধাভোগী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠেন এবং শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন হচ্ছে, এমনটা কি কাম্য ছিল?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। বিগত বছরগুলোতে বহু শিক্ষকের আচরণ ও বৈশিষ্ট্য অনুচিত ও অশিক্ষকসুলভ ছিল। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বাদ দিলেও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তো এমন চিত্র হওয়ার কথা ছিল না। উপরন্তু, ১৯৭৩ সালের আইনের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষার সুযোগ ছিল।
মূলত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও দলীয় রাজনীতির প্রতি তাদের অতি আগ্রহ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণের ফলে ধীরে ধীরে ছাত্রসমাজের মনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সাধারণ জনগণের সঙ্গেও তাদের দূরত্ব বেড়েছে। এক্ষেত্রে বিরল বা ব্যতিক্রম দৃষ্টান্তও আছে বইকি। তবে বলাই বাহুল্য, সেই সব শিক্ষক ছিলেন অত্যাচারিত, অবহেলিত।
এখন যখন দেশের প্রতিটি পর্যায়ে সংস্কারের ডাক এসেছে, তখন শিক্ষকদেরও নিজেদের জায়গা থেকে নিজেদের সংস্কার করা উচিত। মতাদর্শের উর্ধ্বে থেকে শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে আলিঙ্গন করাই তাদের প্রধান কাজ হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে শিক্ষকদের সঙ্গে হওয়া আচরণ আদৌ অসৌজন্যমূলক হওয়া উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যেভাবে ‘অন্যায় আচরণ’ করতে দেখা গেছে বা যাচ্ছে, তা আমাদের ব্যথিত করে। সংস্কারের তীব্র ডাক আমাদের জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিক, কিন্তু সতর্ক থাকি, তা যেন আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না ঘটায়।
• লেখক: গবেষণা সহযোগী, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
শিক্ষাবার্তা ডট কম /এ/২২/১০/২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
