এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক হোক মেধার বিনিময়, রাজনৈতিক আনুগত্যে নয়

মোহাম্মদ শাহজামানঃ বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ষাটের দশক থেকে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে রাজনীতির বিস্তৃতি ঘটে। প্রথিতযশা শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিলো স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। তাঁরা রাজনীতিকদের গাইড ও ফিলোসফারের ভূমিকা পালন করতেন।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে শিক্ষক রাজনীতি আর সেই উদার অবস্থানে নেই; বরং, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের দলীয়করণ এবং দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। ছাত্রবিপ্লব আমাদের এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবসময়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সরকারি দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ, এবং কমিউনিস্ট দলের মতাদর্শের প্রতি শিক্ষকরা আকৃষ্ট হতেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল সীমিত এবং ব্যক্তিগত। তাঁরা কখনোই রাজনৈতিক নেতাদের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতেন না; বরং, তাঁদের আদর্শিক অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের পরামর্শ নিতে আসতেন।

১৯৯০-এর দশকের পরে, বিশেষ করে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক রাজনীতিতে রঙের অনুপ্রবেশ আরও গাঢ় হয়। দলের প্রতি আনুগত্য, শিক্ষক নিয়োগ, এবং প্রশাসনিক পদে নিয়োগে দলীয়করণের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষকদের আদর্শিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে এবং শিক্ষাঙ্গন ক্রমশ দলীয় বলয়ে আবদ্ধ হতে থাকে।

শিক্ষকদের দলীয়করণের ফলে শিক্ষাঙ্গনে একটি বিষাক্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলীয় বিভাজন, সংঘাত, এবং অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের শাখা হিসেবে কাজ করতে থাকে, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষক নিয়োগেও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন হওয়ার ফলে প্রকৃত মেধাবীদের সুযোগ সংকুচিত হয়, যার ফলে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি ঘটে।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষার পরিবেশ, মূল্যবোধ, এবং নৈতিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকেরা রাজনীতির রঙে রঞ্জিত হয়ে গেলে তাঁদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা কমে যায় এবং তাঁদের শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ছাত্রবিপ্লব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করা ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। এই বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল রাজনীতি নয়, শিক্ষা। ছাত্ররা বুঝতে পেরেছে যে রাজনীতির কারণে তাঁদের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আন্দোলনের ফলে শিক্ষাঙ্গন রাজনীতিমুক্ত করার দাবি নতুন করে জেগে উঠেছে।

শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার দাবি কোনো নতুন দাবি নয়, এটি একটি সময়ের দাবি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সুস্থ, নিরপেক্ষ, এবং গুণগত করার জন্য শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা জরুরি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত জ্ঞান ও মেধার বিনিময়, রাজনৈতিক আনুগত্য নয়।

তাই, এখন সময় এসেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন ও ন্যায়নিষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার। শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব হল জ্ঞান বিতরণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, যা রাজনীতির রঙের আড়ালে থেকে সম্ভব নয়।

লেখকঃ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক 

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১০/০৯/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading