এইমাত্র পাওয়া

১৩ লক্ষ আসন শূন্য: শিক্ষার্থী হাহাকারে ভুগছে কলেজগুলো

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

চলতি বছর বিভিন্ন কলেজ-মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন ছিল ২৬ লাখের বেশি। কিন্তু এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ১৬ লাখ ৭২ হাজার পরীক্ষার্থী। তাদের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন কলেজ-মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে উচ্চ মাধ্যমিক ও আলিম পর্যায়ের এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফাঁকা থাকছে ১৩ লাখ আসন। তবে জনপ্রিয় ও মানসম্মত কলেজগুলোতে আসন ফাঁকা নেই। মফস্বল অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থী পায়নি। প্রতিবছরই কলেজগুলোতে কয়েকলাখ আসন ফাঁকা থেকে যায়।

গত এক দশকে দেশে বেশ কিছু কলেজ পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি পেয়েছে। এমপিওভুক্ত হয়েছে বেশ কিছু কলেজ। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আসন অনুমোদন পাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বিবেচনায় এমপিওভুক্তি, পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও একাদশ শ্রেণির মোট আসন সংখ্যার পার্থক্য এতটা বেশি।

ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৬ লাখ ৭২ হাজার পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানে উত্তীর্ণ হলেও তাদের মধ্যে ১৩ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী চার ধাপে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছেন। অর্থাৎ তারা কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে চাচ্ছেন। বাকিদের অনেকেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় চলা বিভিন্ন ডিপ্লোমা ও এইচএসসি বিএম-ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হয়েছেন, ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাদশে ভর্তির জন্য আবেদন করা প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ৬ হাজার শিক্ষার্থী এখনও ভর্তির জন্য নির্বাচিত হননি।

 আসন শূন্য থাকার কারণগুলোর :

শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী আসনের চাহিদা মেলানো যায় না: অনেক সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হয়, ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে আসন শূন্য থাকে।

প্রতিযোগিতার বৃদ্ধি: অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় একই এলাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। সব প্রতিষ্ঠান সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারে না, ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানে আসন শূন্য থেকে যায়।

প্রতিষ্ঠানের মান ও সেবার মধ্যে বৈষম্য: সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান এবং অবকাঠামো একরকম নয়। উচ্চ মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়, কিন্তু নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানগুলো আসন পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়। অতিরিক্ত অনুমোদন দেওয়ার ফলে নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যায়, যা আসন শূন্যতার সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।

অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন: কোনো কোনো ক্ষেত্রে এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসল প্রয়োজন বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হয়, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কম হয় এবং আসন শূন্য থাকে।

প্রশাসনিক ও পরিকল্পনার অভাব: অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়ার আগে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, যার ফলে আসন শূন্য থাকার সমস্যা তৈরি হয়।

সরকারের গচ্চা:

অব্যবহৃত অবকাঠামো ও সম্পদের অপচয়: সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো, শিক্ষক, এবং অন্যান্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হয় না। ফলে এইসব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা খরচ অব্যাহত থাকলেও তার থেকে পর্যাপ্ত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না, যা সরকারের অর্থের অপচয় ঘটাচ্ছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের অপচয়: সরকার প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বিশাল বাজেট বরাদ্দ করে। ফাঁকা আসন থাকার কারণে এই বাজেটের একটি বড় অংশ অপচয় হচ্ছে, যা দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করা যেতে পারতো।

প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি: ফাঁকা আসন থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও সরকারি প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ফলাফল: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শিক্ষার্থীর চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান ফাঁকা থাকছে। এ ধরনের অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ফলেও সরকারের অর্থ অপচয় হচ্ছে, কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে সরকারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হয়।

শিক্ষার মান বজায় রাখার ব্যয়: ফাঁকা আসন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার মান বজায় রাখতে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হয় না। এটি সরকারের জন্য এক ধরণের অর্থনৈতিক ক্ষতি।

অবকাঠামোর অবনতি ও অব্যবহার: ফাঁকা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামোর অবনতি ঘটে, যা ভবিষ্যতে সেগুলো ব্যবহারযোগ্য রাখতে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

 সমস্যাগুলো  উত্তরনে যা করনীয়:

প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ ও সমন্বয়: ফাঁকা আসন থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করে সেগুলোর সম্পদ ও অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।

বিষয়বস্তুর পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য: প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম এবং কোর্সের মধ্যে বৈচিত্র্য এনে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করা।

সঠিক পরিকল্পনা ও নীতি: সরকারের উচিত ফাঁকা আসন সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও মান অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করা।

জনপ্রিয়করণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি: এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা এবং কোর্স সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যাতে আরও বেশি শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হতে আগ্রহী হয়।

এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফাঁকা আসন থাকার কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে ।

লেখা-শিক্ষক ও গবেষক।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এ/২৯/০৮/২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.