কেউ আসলে শিক্ষক হতে চান না, বাধ্য হয়ে হন

প্রভাষ আমিন: কবি কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি সবার পড়া। ছোট্ট করে গল্পটি একটু মনে করিয়ে দেই। দিল্লির বাদশাহ আলমগীরের ছেলেকে পড়াতেন এক মৌলবি। একদিন বাদশাহ দেখলেন তার ছেলে পানি ঢালছে, আর সেই মৌলবি নিজে পা পরিষ্কার করছেন। বাদশাহকে দেখে মৌলবি ভাবলেন বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে পানি ঢালিয়েছেন, এবার বুঝি কল্লা যায়। পরদিন সকালে বাদশাহর দরবারে ডাক পড়ল মৌলবির। ভয় পেলেও মৌলবি ভাবলেন, ভয় না করে তিনি বাদশাহকে শাস্ত্রের কথা বলবেন। বাদশাহকে বোঝাবেন, প্রাণের চেয়ে মান বড়। কিন্তু বাদশাহর দরবারে গিয়ে চমকে গেলেন মৌলবি। বাদশাহর অভিযোগ, তার ছেলে শিক্ষকের কাছে সৌজন্য কিছু শেখেনি; শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা। পুত্র কেন শুধু পানি ঢালল, কেন শিক্ষাগুরুর পা নিজ হাতে ধুয়ে দিল না, এই ছিল মৌলবির বিরুদ্ধে বাদশাহর অভিযোগ। অভিযোগ শুনে গর্বে মৌলবির বুক ফুলে উঠল। বললেন ‘উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে/ কুর্ণিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবে/ আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির/ সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’

এই যে শিক্ষা, শিক্ষকের মর্যাদা; তা বুঝি হারিয়ে গেছে। এনআই খান নামে পরিচিত নজরুল ইসলাম খান এক সময় শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। এক বয়স্ক ভদ্রলোক এসেছেন শিক্ষা সচিবের বাসায়। শিক্ষা সচিব সেই ভদ্রলোককে পা ছুঁয়ে সালাম করছেন। পরে জানা গেল, সেই ভদ্রলোক প্রাথমিক স্কুলের একজন শিক্ষক এবং শিক্ষা সচিব তার ছাত্র ছিলেন। শিক্ষা সচিব একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করছেন, এটা দেখে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে যে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সম্পর্ক, এটাই আমাদের আবহমান সংস্কৃতি। অর্থের মানদন্ডে না হলেও মর্যাদায় শিক্ষকরা সমাজের উঁচুতেই ছিলেন। কিন্তু জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। ছাত্র-শিক্ষকের সেই শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সম্পর্কটাও হারাতে বসেছে। সমাজের উঁচুস্তরে শিক্ষকের মর্যাদার আসনটিও টলটলায়মান।

প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের কথা বাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা ছিলেন মাথার তাজ। কিন্তু আজ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির যেসব অভিযোগ শুনি, লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। আন্দোলনের মুখে উপাচার্যদের রাতের আঁধারে পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, লেখা চুরির অভিযোগ শোনা যায় অহরহ। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমলের কথা সবার জানা। এটা ঠিক, সব শিক্ষক পরিমল নয়; সব শিক্ষক চুরি করেন না, যৌন হয়রানি করেন না। কিন্তু শিক্ষকদের মর্যাদার আসন এত উঁচুতে, তাদের অল্প বিচ্যুতিও আমরা নিতে পারি না। শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা নৈতিকতার সর্বোচ্চ মান আশা করি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে পাহাড় সমান প্রত্যাশা, বিনিময়ে তাদের আমরা কী দিই? আসলে কিছুই না। মর্যাদা যেমন তেমন, পকেট থাকে ফাঁকা। সম্মান আর মর্যাদা দিয়ে তো আর পেট ভরবে না। ছাত্ররা এখনো হয়তো সালাম-আদাব দেয়, তবে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মানেই সমাজের সবচেয়ে নিরীহ মানুষ। সাহেবের কুকুরের একটি পায়ের পেছনের খরচ আর একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন সমান। এখনো শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে কম। যার নাই কোনো রাস্তা, তিনি করেন শিক্ষকতা। তাই বলে ভাববেন না, চাইলেই শিক্ষক হওয়া যায়। কম টাকার শিক্ষকের চাকরি পেতে হলেও বেশি টাকার ঘুষ দিতে হয়।

দেশের প্রধান বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টের উল্টো দিকে শিক্ষা ভবন। কাছেই জাতীয় প্রেসক্লাব। কানাকানি শুনি, শিক্ষা ভবনের ইটও নাকি ঘুষ খায়। চাকরি পেতে ঘুষ, বেতন পেতে ঘুষ, এমপিওভুক্ত হতে ঘুষ, বদলির জন্য ঘুষ। ঘুষ ছাড়া নাকি গাছের পাতাও নড়ে না। একবার ভাবুন, ঢাকায় যিনি নিজের কাজ উদ্ধারে টেবিলে টেবিলে ঘুরবেন, ঘুষ দেবেন; তিনি এলাকায় ফিরে তার শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার কোন শিক্ষা দেবেন? তার কাছ থেকে আমরা নৈতিকতার কোনো মান আশা করব? শুধু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নন, বিসিএসেও পছন্দের তালিকায় সবার নিচে থাকে শিক্ষা ক্যাডার। কেউ আসলে শিক্ষক হতে চান না, বাধ্য হয়ে হন। এরপর সৎ ও মেধাবীরা কেন শিক্ষকতায় আসবে? আর সৎ ও মেধাবীরা যদি শিক্ষকতায় না আসেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কার কাছ থেকে শিখবে? শিক্ষা জাতির মেরুদ-, শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ। শুরুতেই তো মেরুদ- ভেঙে দিচ্ছি, অন্ধকার করে দিচ্ছি ভবিষ্যৎ।

শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় সংসদ সদস্যরা বলেছেন, শিক্ষায় দুর্নীতি এতটাই ব্যাপক, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সংসদ সদস্যদের কেউ বলেছেন, শিক্ষা খাতে টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না, টেবিলে টেবিলে টাকা দিতে হয়। কেউ বলেছেন, শিক্ষায় কেবল ভবন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মানে বদল হয়নি। গবেষণায় বিনিয়োগ নেই। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবুল কালাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার শ্যালক শিক্ষক ছিলেন, মারা গেছেন। আমি নিজে ৩ বছর তদবির করলেও অবসর ভাতা পাননি। টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। এটা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। এ দুর্নীতির কারণে গোটা জাতি গ্রাস হয়ে যাচ্ছে।’ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ভবন হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মানের পরিবর্তন হয়নি। আমার নির্বাচনী এলাকায় একটি সরকারি বিদ্যালয়ে ৪৩টি শ্রেণিকক্ষ আছে। পাঠদান হয়নি পাঁচটিতেও। আমার পাকা বাড়ি, পাকা পায়খানা, কিন্তু খাবার নেই। এটা হচ্ছে আজকের শিক্ষার অবস্থা।’

শিক্ষার দুর্নীতির ধরন আসলে বহুমুখী। আমাদের দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার চেয়ে রাজনীতি বেশি হয়। শিক্ষকরা ক্লাসের চেয়ে কোচিংয়ে বেশি মনোযোগী। নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে কোচিং করলে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া যায়। আবার অনেক জায়গায় শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেন। আবার কোথাও পরীক্ষাও দিতে হয় না, এমনিতেই সার্টিফিকেট মেলে। প্রশ্নপত্র ফাঁস আর জাল সার্টিফিকেটের সঙ্গে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাই জড়িত। শিক্ষামন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২১ হাজার ৭৩২টি ভবন বানানো হয়েছে বিদ্যালয়ের জন্য। কিন্তু শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ভবন বানানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্নীতিমুক্ত, নৈতিকতার উচ্চ মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। চাকরির চেয়ে প্রজ্ঞায়, সার্টিফিকেটের চেয়ে গবেষণায় বেশি মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষায় কোয়ানটিটির চেয়ে কোয়ালিটি বেশি জরুরি। শুরুতেই যদি আমরা শিশুদের নৈতিকতার শিক্ষাটা দিতে না পারি, ভবিষ্যতে বেনজীর-মতিউরের মতো শিক্ষিত দুর্বৃত্তই পাবো শুধু।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৪/০৭/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.