এইমাত্র পাওয়া

সাধারণ মানুষের লেখাপড়ার পরিবেশ যারা নষ্ট করে

ড. কামরুল হাসান মামুন: ইফাতের বাবা বা অমুকের বাবা কিংবা তমুকের বাবাই এক মাত্র বাবা নয় যিনি সন্তানের সন্তানের শখ পূরণের জন্য ১২ লাখ টাকার ছাগলসহ মোট ৫২ লাখ টাকার গরু-ছাগল কোরবানি দিয়েছেন। বাংলাদেশের এমন অসংখ্য সোনার পুত্র-কন্যা আছে যাদের বাবারা তাদের সন্তানদের জন্য ফ্ল্যাট, প্লট, কানাডায় বেগমপাড়া তৈরির জন্য বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সন্তানদের ভাগ্য চুষে নেয়। এইতো মাত্র ক’দিন আগেই জানলাম, আমাদের সাবেক পুলিশ প্রধান তার মেয়ের লেখাপড়ার জন্য বসুন্ধরায় বিশাল বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনে রেখেছেন শুধু বিশ্রামের জন্য। আরেক সাবেক পুলিশ কমিশনার সন্তানের স্কুল ধানমন্ডি হওয়ায় সেখানেই একটি ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন সন্তানের কষ্টের কথা ভেবে। আর আমরা জানি না এ রকম বাবাদের সংখ্যাও কম না। কানাডার বেগম পাড়ায় কতো বাবা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন তার হিসেবের ছিটেফোঁটা মাঝে মাঝে পত্রিকায় আসে।

প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলেমেয়ে কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে পড়তে যায়। এর খুব ক্ষুদ্র অংশই ফুল-রাইড স্কলারশিপ নিয়ে যায় যাদের জন্য একটি পয়সাও বাবা মাকে দিতে হয় না। ফুল রাইড পেতে হলে ট্যাক্স ফাইল জমা দিয়ে আর্থিক অক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। নতুবা যতো মেধাবীই হোক ফুল রাইড পেতে এক্সট্রা অনেক যোগ্যতা দেখাতে হয়। তবে মেধা এবং এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজ থাকলে ৭০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পার্সেন্ট স্কলারশিপ বেশ অনেকেই পায়। এসবের বাহিরে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পড়তে যাচ্ছে যাদের পেছনে বাবা মাকে প্রতি বছর ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এর একটা অংশের বাবা মা বড় বড় ব্যবসায়ী বা কারখানার মালিক। তার চেয়ে বেশি অংশ হলো সরকারি কর্মকর্তা। এরা যে শুধু ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্যই কোটি কোটি টাকা দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে তা না। এরা স্বাস্থ্য খাতেও বিশাল টাকা দেশের বাহিরে নিয়ে যায়। তারপর আছে ছেলেমেয়েদের জন্য বিলাসিতার টাকা ও ফ্ল্যাট কিনে দেওয়া।

এতো টাকা আয় নিশ্চয়ই বৈধ পথে সম্ভব না। হাজার হাজার সন্তানদের বিদেশে আরাম আয়েশে ভালো মানের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে তাদের বাবা-মায়েরা লাখ লাখ ছেলেমেয়ের বাবা-মা তথা বাংলাদেশের আপামর অধিকাংশ মানুষের জীবন বিনষ্ট করে। এই হাজার হাজার বাবা-মায়েরাই বাংলাদেশের শিক্ষা ধ্বংসের কারণ। অথচ এরা যদি একটু বিবেকবান হতো নিজের দেশের লেখাপড়ার মানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতো তাহলে তাদেরকে শিক্ষার জন্য সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে হতো না। বিদেশে লেখাপড়ার ব্যবস্থার জন্য দুর্নীতি করতে হতো না। দেশের মেধা পাচার হতো না। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হলে দেশে সর্বক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন হতো।

দরকার ছিলো শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি। দরকার ছিলো মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনা। দরকার ছিলো শিক্ষকদের জীবন মানের উন্নয়ন যাতে শিক্ষকদের প্রাইভেট কিংবা কোচিং সেন্টারে অথবা পার্ট-টাইম কোথাও পড়াতে না হয়। দরকার ছিলো প্রাইমারি স্কুলগুলোর এমন মান যাতে সেখানে উন্নত মানের সুখী শিক্ষকরা আমাদের ছোট ছোট সোনামনিদের ভালোবাসা দিয়ে নিয়ম কানুন শেখায়, পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা শেখায়, সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি শেখায়, রাস্তায় কীভাবে চলাচল করতে হয় শেখায়। তারপর মাধ্যমিক থেকে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য, ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় ভালোভাবে শেখায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ম্যানেজমেন্ট নামক দৈত্য নির্মূল করতে হবে। আমাদের সাধারণ মানুষের লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট যারা করে তারা সাধারণ মানুষদের রক্ত চুষে তাদের সন্তানদের উন্নত শিক্ষার সিস্টেমকে ভাঙতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/২২/০৬/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.