বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার কাঁটা কমিটি

কাজী মাসুদুর রহমান: শিক্ষা মানুষের স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এটা জাতির মেরুদন্ডও বটে।এ দুটি সংবদেনশীল গুরুত্বের বিচারে রাস্ট্র ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে।বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ কার্যত: তিন ক্যাটাগরির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে থাকে।যেমন- স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি ও বেসরকারি।প্রত্যেক ক্যাটাগরি ভিন্ন-ভিন্ন কিছু সংবিধি ও বিধি-প্রবিধি’র আওতায় পরিচালিত হয়।দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত স্বায়ত্তশাসিত অনুশাসনে পরিচালিত হয়।অপরদিকে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো সরকারি অনুশাসনে পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নির্বাচিত সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্যবর্গের সমন্বয়ে গঠিত সিনেট বা সিন্ডিকেট বডি দ্বারা পরিচালিত হয়।সাধারণত রাস্ট্রের সুবিজ্ঞ সুধীজনদের নিয়েই এই বডি গঠনের নির্দেশনা বা পরামর্শ থাকে।গঠিত এই বডি নির্বাহী ভূমিকায় থাকে।অপরদিকে, স্কুল ও কলেজ যথাক্রমে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির দ্বারা পরিচালিত হয়।সরকারি স্কুল-কলেজ এর ম্যানেজিং/গভর্নিং বডির কর্তৃত্ব ডিসি, ইউএনও ও অন্যান্য সরকারি কর্তাদের আওতায় থাকলেও বেসরকারি ক্ষেত্রে এই চিত্রটি ভিন্ন।২০০৯ সালের প্রবিধানমালা অনুযায়ী বেসরকারি স্কুল-কলেজের পরিচালনা পরিষদ গঠিত হয়ে আসছিল যেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য অথবা তার মনোনীত কোনো বেসরকারি প্রতিনিধিবর্গ সংশ্লিষ্ট থাকতো।বিষ্ময়কর বিষয় হলো, তখন নিম্নমাধ্যমিক,মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উক্ত মনোনীত প্রতিনিধিবর্গ বাছাইকরণে কোনোরুপ শিক্ষাগত বা অন্যকোনো যোগ্যতার শর্ত ছিলনা।অথচ, শিক্ষক- কর্মচারী নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট নানাবিধ সরকারি নির্দেশনা, বিধি-প্রবিধি বাস্তবায়ন সহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় নীতিনির্ধারণী নির্বাহী কার্যাদি সম্পাদনের একচ্ছত্র ক্ষমতা কার্যত এই কমিটির ওপরই ন্যাস্ত থাকে। ২০১৬ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের বাদ রেখে শুধুমাত্র তাদের মনোনীত প্রতিনিধিবর্গের দ্বারা কমিটি গঠিত হয়ে আসছে।প্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহ সহ শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের মহতী দায়দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যাস্ত থাকে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এমন স্পর্শকাতর স্থল পরিচালনায় কোনোরুপ যোগ্যতার মানদন্ড ছাড়াই কমিটি নির্ধারণ দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাপক সমালোচিত হয়ে আসছিল। ২০১৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক ও বেসরকারি স্নাতক-স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নুন্যতম ডিগ্রি পাশ করা হয়েছে।অবশেষে, অতিসম্প্রতি গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধান মালা-২০২৪ এর আলোকে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির যোগ্যতা এইচএসসি পাশ করা হয়েছে যদিও প্রাথমিক স্কুলের চেয়ে যোগ্যতাটি কম হওয়ার কারণে সিদ্ধান্তটি বেশ সমালোচিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ৩৫ হাজারের বেশী বেসরকারি স্কুল ও কলেজ(কারিগরি ও মাদ্রাসা সমেত) আছে।এগুলোর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশী এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাস্তরের প্রায় ৯৭ ভাগই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। মুলতঃ বিভিন্ন স্তরে রাস্ট্র সেবায় নিয়োজিত শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনবলের অধিকাংশই এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসে। এসকল বাস্তবতার নিরিখে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশের তাবৎ শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর উইং বললে অত্যুক্তি হবে না।তাই এটার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অধিকতর যত্নশীল বা সতর্ক হওয়া অপরিহার্য বলে মনে করি।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ ক্ষেত্রে রাস্ট্র ও সরকার যথেষ্ট উদাসীন।বলাবাহুল্য,দেশে বেসরকারি শিক্ষকদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সন্দেহাতীত হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক, সামাজিক ও পেশাভিত্তিক ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট অবমুল্যায়িত যা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বৈকি। শিক্ষকদের মতো সর্বোচ্চ একাডেমিক ডিগ্রিধারী পেশাজীবিদের পরিচালনায় অপেক্ষাকৃত এমন কম শিক্ষাগত যোগ্যতার সভাপতি নিয়োগ দান কখনোই ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারেনা মর্মে সচেতন মহলে শুরু থেকেই সমালোচনার ঝড় বইছে।এছাড়া, শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরে সামাজিক যোগ্যতার মানদন্ড কেন রাখা হয়নি- এটাও একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন।উল্লেখ্য- শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এমন পরম সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি পরিচালনায় সাধারণত রাজনৈতিক বিবেচনায় কমিটি নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের অধিকাংশেরও বেশী সমাজে ধিকৃত, বিতর্কিত এবং আইনের দৃষ্টিতে কালো তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী, খুনি, মোষ্টওয়ান্টেড আসামী, মাদক কারবারি, মাদকাসক্ত, নারী কেলেংকারি সহ অন্যান্য জঘন্য অপরাধে জড়িতদেরকেও পরিচালনা কমিটিতে রাখা হয় যা সত্যিই এক ঘৃণিত বিষ্ময় বটে!তারা যখন প্রাতিষ্ঠানিক সভায় উপস্থিত হন তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক কে সোজা দন্ডায়মান হয়ে সামরিক ভঙ্গিমায় সম্ভাষণ জানাতে হয়।এই সম্ভাষণ জানাতে উনিশ-বিশ হলে শিক্ষককে কমিটির রোষানলে পরার এমনকি অপমানিত হওয়ারও ঘৃণ্য উদাহরণ আছে।প্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহ সহ সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত থাকলেও তারা সেগুলো যথাযথ পালন তো করেইনা বরং উল্টো প্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত তহবিল আত্মসাতেই জড়িত থাকে যা অসংখ্য ঘৃণ্য উদাহরণে জর্জরিত।শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা তাদের ওপরেই ন্যাস্ত ; এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগই তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়।সরকারী নিরীক্ষায় দীর্ঘকাল ধরে তাদের বহুমাত্রিক দুর্নীতি প্রমাণিত হয়ে আসছে।এদের দুর্নীতির বিষয়ে দীর্ঘকাল ব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা চললেও কমিটির গঠননীতি সংস্কারের ব্যাপারে কখনোই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমতাবস্থায় অবশেষে ২০১৬ সাল থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করা হয়। বর্তমানে এন্ট্রি লেভেল শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি কমিটির করাল গ্রাস থেকে উদ্ধার করে মন্ত্রণালয়ের এনটিআরসি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে।সেই নিয়োগেও কর্তৃপক্ষের সরাসরি সুপারিশ থাকলেও কমিটি দুর্নীতি চরিতার্থে যথেষ্ট গড়িমসি করতো। হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে সুপারিশ প্রাপ্ত অনেক প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে গোপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদানের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন।কোনো প্রার্থী কমিটিকে ঘুষ প্রদানে ব্যর্থ হলে তার নিয়োগ বন্ধ রাখা হতো- এমন অনেক অভিযোগও মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেই সুপারিশ পাওয়ার পরেও ঘুষের অর্থ যোগার করতে না পেরে যোগদানে বিরত থেকেছেন। আবার এমপিও ভুক্তির অনুমোদনও স্থগিত রাখা হতো। খোদ সরকারের এনটিআরসিএ থেকে এহেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও তা থেমে থাকেনি।এমনকি নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ঘুষের অর্থ প্রদানে অপারগ শিক্ষকের নাম মাসিক বেতন-ভাতা বিলের (এমপিও শীট) তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারও হুমকি প্রদান করা হতো।অবশেষে এনটিআরসি কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে নির্বাচিত প্রার্থীদের পিএসসির আদলে চুড়ান্ত সুপারিশ করছেন।পাশাপাশি, তাদেরকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে(মাউশি) এমপিও সুপারিশ করে নিয়োগ সম্পন্নের বিধি চালু করেছেন। এতে করে এ পর্যায়ে কমিটির দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু অধ্যক্ষ,প্রধান/সহ-প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা আগের মতোই তাদের হাতে রয়ে গেছে।এসকল পদ গুলোতে আগের মতোই মোটা অংকের আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থী সর্বসাকুল্যে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সবিশেষ ঘুষ চুক্তিতে যোগ্য না হলে তার সকল যোগ্যতা অযোগ্যতায় পরিণত হয়।নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও অনেক সময় এই দুর্নীতিতে জড়িত থাকেন । শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই নয়, সকল শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ পরবর্তী প্রতি মাসের বেতন ভাতায় অনুমোদন সহ চাকুরীর সার্বিক নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার সার্বিক ক্ষমতা এই কমিটির ওপর ন্যাস্ত আছে।ফলে শিকারগ্রস্ত শিক্ষক- কর্মচারীগণ ভয়ে কখনোই কমিটির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেন না। অনেক সময়ই কমিটির সদস্যরা শিক্ষকদের সাথে ব্যক্তিমালিকানার শ্রমিকদের মতো আচরণ করে থাকে।এমনকি চরম ঘৃণ্য অশালীন আচরণেরও অসংখ্য রেকর্ড( শিক্ষক গোষ্ঠীর জন্য মর্যাদা হানিকর বলে উল্লেখ না করা সমীচীন) আছে।কার্যত প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ সকলেই এদের কাছে এক প্রকার জিম্মি থাকেন।কিন্তু কোনো শিক্ষক কর্মচারীই তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাননা।কেননা, আইনগত ভাবে কমিটিকে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে যা জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকেও এতটা প্রদান করা হয়নি। অডিটে কমিটির দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনার উদাহরণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবেনা।কেননা, তারা দ্বিবার্ষিক মেয়াদে ক্ষমতায়িত হন এবং পরিশেষে সকল ঝুঁকি-ঝামেলা কমিটির সদস্যসচিব হিসাবে প্রতিষ্ঠান প্রধানকেই বহন করতে হয়।শুধু তা-ই নয়, তাদের ব্যক্তিগত ও হীনরাজনৈতিক দুরভিসন্ধি চরিতার্থে অনেক সময় কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকেও তারা অপব্যবহার করে থাকেন।

অবস্থাদৃষ্টে এটা প্রমাণিত যে, যে হিতার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি নিয়োগ দেওয়া হয় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার নুন্যতম লক্ষ্যটুকুও পরিপূরণ হয়না।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তারা সেবার পরিবর্তে বহুমাত্রিক আর্থিক দুর্নীতি চরিতার্থের নিরাপদ স্থল বলে মনে করেন।মুলতঃ এই ঘৃণ্য মনোবৃত্তি থেকেই তারা কমিটিতে সংশ্লিষ্ট থাকার জন্য জোর প্রতিযোগিতা ও লবিং-গ্রুপিং চালায়। এমনকি এমন মধুলেহ কমিটিতে আসার জন্য খুনো-খুনি পর্যন্ত ঘটে থাকে। কমিটি বা পর্ষদে সদস্যসচিব ও শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথাক্রমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও একজন শিক্ষক থাকলেও সভাপতিসহ বহিরাগত অন্যান্য সদস্যদের রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক প্রভাবে তারা সাধারণত অসহায় থাকেন।রেজুলেশনে কোনো অনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুমোদনে বিরোধিতা করলে তাদেরকে বেশ অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয় যার নজিরও কম নয়। বাস্তবতা হলো, যদি তাদেরকে এসকল ব্যাপক ভিত্তিক নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তবে হয়তো এদের কাউকে এখানে খুঁজে পাওয়া যাবেনা।বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের মতো এমন অনিয়ম অন্যকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়না।কেননা, অন্যদের বেসরকারি পর্ষদের মতো এতোটা ক্ষমতায়ন করা হয়নি; উপরন্তু, অন্যদের সার্বিক যোগ্যতার মানও এসকল পর্ষদের চেয়ে সাধারণত উন্নততর থাকে। সম্প্রতি মাউশির ডিজি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, আজকাল আলুর ব্যাপারিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়। ইতোমধ্যে, বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধান মালা -২০২৪ গেজেটেড হয়েছে। সে অনুযায়ী কমিটির বিরুদ্ধে কোনো প্রমানিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিটি বাতিলের ক্ষমতা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যাস্ত করা হয়েছে।শিক্ষা বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী প্রণিত প্রবিধানের আলোকে কমিটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে এবং এতে তাদের স্বেচ্ছাচারীতা ও অনিয়ম কমবে।কিন্তু নিরেট বাস্তবতায়, তাদেরকে প্রদেয় ক্ষমতার এতটুকুও কমানো হয়নি।উল্লেখ্য, প্রণিত প্রবিধান ও উপ-প্রবিধানঃ ৭১,৭১(১),৭২(৫),৭৩ এবং ৭৩(৫) এর মধ্যে বা অন্যকোনো বিধি-উপবিধিতে তাদের কৃত অপকর্মের জন্য কোনো ফৌজদারী শাস্তির কথা বলা হয়নি। উল্টো ৭৩(৫) এর উপ-প্রবিধানে অভিযুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দন্ড হিসাবে চাকুরীচ্যুতির কথা বলা হয়েছে।এটা একপেশে ও পক্ষপাতমূলক বৈকি। দন্ড স্বরুপ শুধু কমিটি বাতিলের মাধ্যমে কার্যত তাদের কৃত অপকর্মের সেফগার্ড তথা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।এতে করে তারা আরো বোপরোয়া হয়ে উঠবে বলে সচেতন মহল মনে করেন।অর্থাৎ, বস্তুত পরিবর্তিত প্রবিধানমালায় কিছুটা আঙ্গিক সংস্কার হলেও কোনো গুণগত সংস্কার হয়নি যা রুপক অর্থে- নতুন বোতলে পুরনো মদ রাখার সামিল।বলাবাহুল্য,বিগত দিনে (এনটিআরসিএ এর পূর্বে) কমিটি কর্তৃক শিক্ষক- কর্মচারী নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের ধারাবাহিক ফিরিস্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা বিভাগ কর্তৃক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। নিয়োগ বোর্ডে কমিটির সাথে শিক্ষা বিভাগের অন্যান্য কর্তারাও সংশ্লিষ্ট থাকতেন।কিন্তু সে সকল কর্তাদের কখনোই দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি।এমনকি সদ্য প্রণিত প্রবিধানেও এজাতীয় ভবিষ্যৎ কর্তাদের জবাবদিহিতার বিষয়ে বলা হয়নি।এ নিয়ে অতীতের মতো সমালোচনা বইছে।

আমাদের মনে রাখা উচিৎ , শিক্ষকদের বিষন্নে ও অপ্রসন্নে রেখে আর যাই হোক শিক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে এগিয়ে নেওয়া যায়না।সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রচলিত রীতি-বিধি যুগোপযোগী নয়।এতে করে শিক্ষকদের যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক (intellectual) বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে তেমনি শিক্ষায় মেধাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিও ব্যাহত হচ্ছে।সর্বশেষ, এনটিআরসিএ ( বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) এর ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতে ৯৬ হাজার শুন্যপদের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২৩ হাজার প্রার্থীর আবেদন জমা পরেছে যা নজিরবিহীন।অর্থাৎ, বেসরকারি শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে যা শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে রীতিমতো হতাশার। বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি আর্থিক ও সামাজিক চরম অবহেলার পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অনাদর্শিক পরিচালনা পর্ষদের সংস্কৃতিও এ পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী।এ জরাজীর্ণতার উত্তরণ ঘটাতে হলে সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। উল্লেখ্য, ২০০৪ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষকদেরকে সরকার শতভাগ বেতন ও কিছু অংশ ভাতাদি দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদেরও নানাবিধ শিক্ষা সহায়তা সরকারই প্রদান করছেন।এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভৌতঅবকাঠামোগত উন্নয়নও সরকার দেখছেন। অর্থাৎ- শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংশ্লেষের নুন্যতমও এখন কমিটির ওপর নির্ভরশীল নয়।তবে কমিটিকে কেন এত ক্ষমতায়ন করা হয়েছে?কেন শিক্ষকদেরকে পরিচালনা পর্ষদের নামে অযোগ্য ও অপ্রশিক্ষিত সিন্ডিকেটের কাছে সমর্পণ করা হয়েছে?এগুলো এখন সচেতন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। সমস্যা নিরসনে হয় সরকারই সরাসরি নিয়ন্ত্রণভার গ্রহন করুক অথবা পরিচালনা পর্ষদ গঠনে সরকার আরো স্বচ্ছ ও যত্নশীল হোক।পর্ষদ গঠনে সমাজের সুধীজন তথা সর্বজন স্বীকৃত সৎ ও সন্মানিত ব্যক্তিদের উৎসাহিত ও নির্বাচিত করা হোক। ধিকৃত রাজনীতিক, অসৎ ও অসামাজিক বক্তিদের সর্বাগ্রে পরিহার করা হোক; এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ইনটেলিজেন্স বিভাগের নির্মোহ অনুসন্ধানী ও পর্যবেক্ষণী সহায়তা নেয়া হোক।তা নাহলে, আগামী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শিক্ষিত- প্রশিক্ষিত প্রজন্ম ও জাতিগঠনে যে যুগোপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। ভুলুন্ঠিত হতে পারে সোনার বাংলা গড়নের চিরায়ত স্বপ্ন।

লেখক: কলামিস্ট

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/১০/০৬/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.