এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষায় নীতি-আদর্শের আকাল

বিমল সরকার: দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম-অব্যবস্থা, নীতিনৈতিকতা ও আদর্শবর্জিত কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু এসবের সঙ্গে উপাচার্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিধারীরা আজকাল একাকার হয়ে পড়ছেন। দায়িত্ব পালনে তাদের অবহেলা এবং জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। নেতিবাচক কারণে প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে শিরোনাম হয় একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়; সেই সঙ্গে আলোচনায় থাকেন একেক উপাচার্য।

শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ফটক, প্যাড বা সিলমোহরে নীতিকথা ও স্লোগানের কোনো কমতি নেই। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন কতটুকু? আজকের শিক্ষার্থীই তো আগামীকালের শিক্ষক, যাদের কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ পান। তারা কি বোঝেন, তাদের এ নেতিবাচক প্রবণতা শিক্ষার্থীদেরও প্রভাবিত করে, যা কালক্রমে এবং সামাজিক প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে গোটা সমাজব্যাপী?

কলকাতা থেকে বাংলা ‘সাগরিকা’ ছায়াছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালে। ছবিটি যারা দেখেছেন তাদের মনে থাকার কথা কমল মিত্র তথা কলেজ অধ্যক্ষের উপদেশমূলক কথাগুলো। একজন প্রকৃত ও দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো তিনি মেধাবী ও প্রিয় ছাত্র অরুণকে উদ্দেশ করে বলে চলেন–

‘লোকে আমাকে ঠাট্টা করে বলে, আমি নাকি নীতিবান। তাতে আমি একটুও লজ্জাবোধ করি না। আজকাল এই অতি-আধুনিকতার নামে যে অভদ্রতা চলেছে, আমি এর ঘোর বিরোধী। স্বৈরাচারকে আমি সমর্থন করি না। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়বে বলে তারা প্রেমিক-প্রেমিকা বা এক দল অন্য দলের শিকার– এ মনোবৃত্তি আমি জঘন্য মনে করি। মেয়েদের সম্মান সর্বাবস্থায় যদি পুরুষরা না রাখে তাহলে জাতির অমর্যাদা হয়। দেশের মেয়েরা যত বেশি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে, তত বেশি বেড়ে যাবে তাদের দায়িত্ব। তা ছাড়া যারা বিদেশ যাবে লেখাপড়া শিখতে, তাদের নৈতিক চরিত্র হবে একেবারে নিষ্কলঙ্ক। যে মুহূর্তে তুমি স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ গেলে সে মুহূর্ত থেকে তুমি ভারতীয় ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাক্ষেত্রে তোমরাই ভারতের রাষ্ট্রদূত। তোমাদের আচরণ, স্বভাব-চরিত্র এমন হবে, যাতে সে দেশের ও অন্য দেশের ছাত্ররা বুঝতে পারে– বিদ্যা-বুদ্ধি ও নৈতিক চরিত্রে তোমরা কোনো দেশের ছাত্রদের চেয়ে কম নও। তোমাদের গৌরব দেশের গৌরব; তোমাদের কলঙ্ক দেশের কলঙ্ক। সেই দিক বিবেচনা করে তোমার নাম রিকমেন্ড করব আমি। তোমার আচরণ, স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে কোনো ত্রুটি কোনোদিন দেখিনি, বিশেষ করে মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশায়। আমি যখন প্রিন্সিপাল, তখন আমার স্ট্রং রিকমেন্ডেশনের জোরে তোমার স্টেট স্কলারশিপ সম্পর্কে এক রকম নিশ্চিত হতে পার। আর তোমার বিলেত যাওয়ার ওই পাসপোর্ট প্রভৃতি আনুষঙ্গিক ব্যাপারে তদবির কর গে, যাও।’

অকপটে স্বীকার করি, সিনেমা বা চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনো ধারণা নেই। দীর্ঘদিন পর সেদিন নতুন করে ছবিটি দেখে বড়ই স্মৃতিকাতর হয়ে প্রিয় অভিনেতার (কমল মিত্র) মুখনিঃসৃত ভালো লাগা কথাগুলো এখানে উদ্ধৃত করলাম মাত্র।

জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও আগে রয়েছে পরিবার। রয়েছে পরিবেশ, সর্বোপরি সময়। কোনো না কোনো স্থান থেকে প্রকৃত শিক্ষাটা পাওয়ার সুযোগ কিংবা বন্দোবস্ত থাকতে হবে। তবে একই সঙ্গে এটা ভুলে গেলে চলবে না– প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে কেবল পরীক্ষা পাসের সনদপত্র নয়, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্তকলেজ শিক্ষক

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম/০৩/০৬/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.