মনজু আরা বেগম।।
মূল্যস্ফীতির কঠিন চাপে চিড়েচ্যাপটা সাধারণ মানুষ। এই যুদ্ধ কবে কখন কোথায় গিয়ে থামবে আমাদের জানা নেই। এপ্রিল মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.২২ শতাংশে। যা মার্চ মাসে ছিল ৯.৮৭ শতাংশ। বিবিএসের কনজুমার প্রাইস ইনডেক্স থেকে জানা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়েছে। অন্যদিকে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের ৭০ শতাংশ পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করেছে। ৩৫ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় হ্রাস করেছে, ২৮ শতাংশ ঋণ গ্রহণ করেছে এবং ১৭ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় হ্রাস করেছে।
খাদ্যাভ্যাসের এমন পরিবর্তন পরিবারগুলোকে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ফেলেছে। জরিপে জানা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর সময়কালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যস্তর গ্রামীণ এবং শহুরে পরিবারগুলোর জন্য একটি প্রধান ধাক্কা ছিল।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জানা যায়, দেশি-বিদেশি ঋণ ও সুদ পরিশোধে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে আমাদের অর্থনীতি। এই চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি হতে যাচ্ছে ২০২৪-২৫ এর বাজেট।
এই ১০টি খাতের প্রথমটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সবার জন্য খাদ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি, প্রতিটি গ্রামকে আধুনিকায়নকরণ, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, ফাস্টট্রাক অবকাঠামো প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ গ্রহণ। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এবারে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে।
বাজেট যা করা হয় তা যথাযথ বাস্তবায়ন কখনোই হয় না। কাজেই বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেই লক্ষ্যে বাজেট ঘোষণা করা সমীচীন বলে অর্থনীতিবিদসহ বিজ্ঞজনরা মনে করেন। তাছাড়া এবারে আইএমএফ আগামী বাজেট ছোট করার পরামর্শ দিয়েছে। বাজেট বড় করে প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করতে হয়।
এতে করে ঋণের বোঝা বাড়ে। ফলে জনগণের করের টাকায় এ ঋণ সুদসহ পরিশোধ করতে হয়। এবারে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। বড় ধরনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত অর্জন কখনোই হয় না। ঘাটতি বাজেট করতে হয়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য করজালের আওতা বৃদ্ধির দিকে সরকারকে কড়া নজর দিতে হবে।
এনবিআরের চেয়ারম্যানের মতে, দেশে ১ কোটি ৩৬ হাজার মানুষ কর দেওয়ার যোগ্য। কিন্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা কর দেন না। সাম্প্রতিক সময়ে সিপিডির এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ই-ফাইলিং কার্যকর করা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
২০২০ সালে আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ছিল ২১ লাখ সেখানে চলতি বছরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখে। এ বছরের জুন পর্যন্ত ৪০ লাখ হবে বলে ধারণা করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, ১ কোটি টিআইএন রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলেও সবাই আয়কর দিচ্ছেন না। সে কারণে করজালের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাছাড়া আমাদের দেশে যেসব দেশি-বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশিরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তারা নিয়মানুযায়ী কর, ভ্যাট দিচ্ছেন কি না, সেটিও ক্ষতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এছাড়া আয়কর ফাঁকি দেওয়ায় রাজস্ব আয় যথাযথ আদায় হয় না। এদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। সেজন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
বছর বছর বাজেট আসে বাজেট যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। আমাদের সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক বিষয়গুলো বরাবরই উপেক্ষিত হয়।
বাজেটে বরাদ্দকৃত সুযোগ-সুবিধাগুলো সর্বস্তরের মানুষ সমানভাবে ভোগ করতে পারে না। বাজেটে বরাদ্দকৃত বিষয়গুলো বা সুবিধাসমূহ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকারকে মূল সমস্যার গভীরে গিয়ে তা সমাধানের জন্য শক্ত হাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আসছে বাজেটে মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে, যার নির্দেশনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে দিয়েছেন।
বাজার পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি কীভাবে রোধ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়—সে বিষয়টি সম্পর্কে বাজেটে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশে কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ হার বেড়েই চলেছে।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় টাকার মূল্যমান অনেক কমেছে। ফলে আমদানি খরচ বেড়েছে। ২০২২ সালে ডলারের মূল্য ছিল মাত্র ৮৫ টাকা।
দীর্ঘদিন ধরেই এই মূল্য অব্যাহত ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৮ টাকায়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যসহ সবখানে। পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে বিদ্যুত্, গ্যাস, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনাই মূলত দায়ী।
সরকার দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে তা অকার্যকর। এর কারণ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, মনিটরিংয়ের অভাব, চাঁদাবাজি এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা। দেশে প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। যার কারণে মূল্যস্ফীতিসহ দেশের উন্নয়নমূলক অনেক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে সময়ক্ষেপণ করে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়।
অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত এনে উত্পাদন খাতে বিশেষ করে শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে পারলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতো। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়টি বাজেটে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
এখানে উল্লেখ্য, ২০২৩-এর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে চারটি ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের স্লোগান ছিল ‘স্মার্ট বাংলাদেশ :উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান বাড়বে এবার কর্মসংস্থান।’ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ১১টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে যে দুটি বিষয় সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো ছিল তা হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবক-যুবতিদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। তাই আসছে বাজেটে এই দুটি বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট বরাদ্দসহ সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
দেশ থেকে অর্থ পাচার ও দুর্নীতি যতটা সম্ভব রোধ করতে হবে। এ ছাড়াও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একশ্রেণির ক্ষমতাধর ব্যক্তি জনগণের টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংক খালি করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করবে, আর সাধারণ মানুষ এর খেসারত দিবে এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।
এ থেকে উত্তরণের জন্য জনগণেরও উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। উভয়ের প্রচেষ্টা ছাড়া দেশকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। উল্লিখিত বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হলে তা গণমানুষের জন্য উপযোগী বাজেট হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে, বিশেষ করে দরিদ্র নিম্ন ও সাধারণ ভোক্তাশ্রেণি দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় কষ্ট থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাবে। দেশের উন্নয়নের সুফল সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোগ করতে পারবে এটা নিসন্দেহে বলা যেতে পারে।
লেখক: অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক, মহাব্যবস্থাপক (অব.), বিসিক (BSCIC)
শিক্ষাবার্তা ডট কম/জামান/৩১/০৫/২৪
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
