এইমাত্র পাওয়া
ফাইল ছবি

শিক্ষা নিয়ে আর কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা?

বিমল সরকারঃ শুধু ‘বাগাড়ম্বর’ নয়; এমন অনেক কালজয়ী কবিতা লিখে অমর হয়ে আছেন মহাজন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৭-১৯০৭)। প্রসিদ্ধ এই কবিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাঁর ‘বাগাড়ম্বর’ শিরোনামীয় কবিতাটি দিয়ে নিবন্ধটি শুরু করতে চাই:

যেরূপ করিবে কাজ কার্যেতে দেখাও,/ বৃথা গর্বে কেন তাহা করিয়া বেড়াও?/ না পার করিতে যদি কর যাহা গান,/ কোথায় পাইবে লজ্জা রাখিবার স্থান?

স্বাধীনতা লাভের পর শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের শুরুটা কিন্তু মোটামুটি ভালোই ছিল। ১৯৭১ সালে বিজয়ের অব্যবহিত পর প্রবাসী সরকার দেশে ফিরে এসে মন্ত্রীদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করে। ২৯ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর ওপর। তিনি স্বাধীন দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী (১৯৭১-১৯৭৫)। তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা বলতে গেলে প্রশ্নাতীত। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি প্রবাসী সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গণপরিষদের স্পিকার হিসেবে মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান তিনি।

দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে একনাগাড়ে সাড়ে তিন বছর কম কথা নয়। স্বাধীনতার পর প্রথম ২০ বছরে (১৯৭১-১৯৯১) মোট ২২ বার পদটিতে রদবদল হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিনের শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী। তার মানে, অধ্যাপক ইউসুফ আলীই স্বাধীনতার প্রথম ২০ বছরে দীর্ঘদিনের শিক্ষামন্ত্রী।

দীর্ঘমেয়াদি, আবার স্বল্পমেয়াদি শিক্ষামন্ত্রী। এ নিয়ে রয়েছে নানা কথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তথা পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর এবং সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতায় আরোহণ পর্যন্ত একে একে মোট সাতজন ব্যক্তি শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মানে, সাত বছরে (১৯৭৫-১৯৮২) সাতজন শিক্ষামন্ত্রী। এই সাতজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টার মধ্যে একজনের মেয়াদ ছিল মাত্র ৪০ দিন, আরেকজনের ১০০ দিন। স্বল্পমেয়াদি উল্লিখিত দু’জন ছাড়াও একজন সাত মাস এবং আরও একজন এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। কথা হলো, সাত বছরে সাতজন শিক্ষামন্ত্রী দিয়ে স্বাভাবিক প্রাত্যহিক কাজের (রুটিন ওয়ার্ক) বাইরে প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ কী হয়েছে কিংবা কতটুকু কাজই বা করা সম্ভব? সদ্যস্বাধীন একটি দেশে শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বের এমন ঘন ঘন হাতবদলে জাতি আসলে কী পেয়েছে? অথচ মত আর পথ যা-ই হোক, মেধা ও পাণ্ডিত্য এবং দক্ষতা-বিচক্ষণতা বিবেচনায় অধ্যাপক আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, কাজী জাফর আহমদ ও শাহ আজিজুর রহমান কিন্তু কোনো অংশে কম ছিলেন না।

এ তো গেল পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়কার কথা। পরবর্তী সময়ে কী হলো? এরশাদের সময় তথা আশির দশকে? এমন খামখেয়ালিপনার জবাব কী? একটি দৃষ্টান্ত:

১৯৮৬ সাল। মানে একটি মাত্র বছর। এই এক বছরে মোট পাঁচজন ব্যক্তি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শামসুল হুদা চৌধুরী থেকে শুরু করে মোমিনউদ্দিন আহমেদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী পাঁচ শিক্ষামন্ত্রীর মধ্যে কেউ পাঁচ মাস, কেউ আড়াই মাস, এমনকি কেউ দুই মাসের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে বছরের পর বছর কী যে অরাজকতা, নৈরাজ্য আর খামখেয়ালিপনা সংঘটিত হয়েছে, তা অল্প কথায় বলে শেষ করা যাবে না। সাত বছরে (১৯৭৫-১৯৮২) ৭ জন কিংবা মাত্র এক বছরের মধ্যে (১৯৮৬) একের পর এক এভাবে পাঁচজন শিক্ষামন্ত্রী। দুনিয়ার ইতিহাসে কোথাও এমন নজির আছে কিনা, জানা নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো দেশে এমন অপরিণামদর্শিতা সচরাচর লক্ষ্য করা যায় না। আহা, কী তামাশাই না করা হয়েছে সময় সময় শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে! জানি না, এমন খামখেয়ালিপনার জন্য জাতি আমাদের ক্ষমা করেছে বা ভবিষ্যতে ক্ষমা করবে কিনা।

মানুষ তার কাজের মাঝেই বেঁচে থাকে। কম দিন আর বেশি দিন বলে কথা নয়; দায়িত্ব দায়িত্বই। বেশি দিন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে প্রত্যাশা থাকে বেশি। ব্যক্তির নাম, ঘটনা কিংবা বিষয়ের শিরোনাম উল্লেখ করতে চাই না। শিক্ষা নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। প্রকৃত অর্থে বাগাড়ম্বর আর অতিশয়োক্তিই সার। এ ক্ষেত্রে বারবার আমাদের হতাশ হতে হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী সুন্দর সুন্দর আশাজাগানিয়া কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের অতীত বা নিকট-অতীত খুব সুখকর নয়। তবু আমরা তাঁর কথায় আশ্বস্ত হতে চাই। জানি না, আবার কী এবং কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। মন্ত্রীর জন্য অনেক শুভকামনা।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

মতামত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে মতামত ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক ও আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের;- শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৯/০১/২০২৪ 

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.