এইমাত্র পাওয়া

মূল্যায়নে শিক্ষক যখন বিচারকের ভূমিকায়!

জাকারিয়া স্বাধীনঃ  কতিপয় শিক্ষকের নিজের কাছে প্রাইভেট পড়া তথাকথিত ভালো ছাত্র, নিজের সন্তান, পরিবারের সদস্য ও অন্য কাউকে দিয়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দিন এখন অতীত হওয়ার পথে। নতুন কারিকুলামে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, ষাণ্মাসিক ও বাত্সরিক সামষ্টিক মূল্যায়নসহ মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণের পাশাপাশি তা নৈপুণ্য অ্যাপসে আপলোড স্ব স্ব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষককেই করতে হচ্ছে। বলতে গেলে বক্তব্য প্রধান পাঠদান ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা সংস্কৃতিতে বড় রূপান্তর ঘটতে চলেছে। এটা ঢাকঢাক গুড়গুড় কোনো বিষয় নয় যে, নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষকের শ্রেণি কার্যক্রমে সক্রিয়তা, মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সান্নিধ্যের গভীরতা এবং শিক্ষকের গুরুত্ব ও সম্মান যেমন বৃদ্ধি করবে; তেমনি শিক্ষকের হাতে মূল্যায়নের ক্ষমতায় অনৈতিকতার সুযোগ তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেহেতু একশ্রেণির শিক্ষকের প্রাইভেট-কোচিং ও অন্য আয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চর্চা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে নিজের কাছে প্রাইভেট পড়তে প্ররোচনা জোগানো। এটাও সত্য যে, প্রায় ৯৭ শতাংশ এমপিওভুক্ত/বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যে পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পান তা কতটা বাস্তবসম্মত বিবেচনাসাপেক্ষ। অবশ্য দেখা যায়, সরকারি স্কুলের একশ্রেণির শিক্ষকই তুলনামূলক বেশি প্রাইভেট কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত। সুতরাং শুধু অর্থনৈতিক বিষয়টিই শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং সমেত অনৈতিকতার পথে নিয়ে যায় বলা যাবে না।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলে শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষক। আর শিক্ষকের মেরুদণ্ড প্রতিষ্ঠান-প্রধান। বাস্তবতা হলো, যে প্রতিষ্ঠান সার্বিক ভালো করে তার পিছনে প্রতিষ্ঠান-প্রধানের ব্যাপক অবদান থাকে, এমনিভাবে বিপরীত চিত্রে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় প্রতিষ্ঠান-প্রধানের নেতিবাচক ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। যদিও প্রতিষ্ঠান-প্রধান নিয়োগ প্রক্রিয়া, তার নৈতিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্বের ঘাটতি, ব্যবস্থাপনা কমিটির ভূমিকা, ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষা প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্তা এমনকি কর্মচারীও প্রতিষ্ঠান-প্রধানের মেরুদণ্ড অকেজো করে দিতে পারে। এই মেরুদণ্ড ঠিক হওয়ার আগে জাতির মেরুদণ্ড ঠিক হবে আশা করাটা অলীক। সেই সঙ্গে এক শ্রেণির প্রতিষ্ঠান-প্রধান প্রতিষ্ঠানেই গ্রুপিং করেন আবার কখনো গ্রুপিংয়ের ফাঁদে পড়েন। সর্বোপরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষকের শ্রেণি কার্যক্রম ও মূল্যায়নে। কারো সাংসারিক টানাপড়েন, হীনম্মন্যতায় ভোগা ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব মূল্যায়নে রাখে নেতিবাচক ভূমিকা। প্রেক্ষিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি বছরই পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে খাতা পুনর্মূল্যায়নে জিপিএ-৫ পাওয়ার নজির হরহামেশাই ঘটে।

পুনশ্চঃ মূল্যায়নের সময় একজন শিক্ষক বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিচারকের সঠিক রায় যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত; তেমনি শিক্ষকের সঠিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর আলোকিত জীবন গঠনের সোপান। বিপরীত চিত্রে দুটোই দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ। মূল্যায়নের কাজটি নৈতিকতার উত্কর্ষে থেকে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সততা-স্বচ্ছতা ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে করাটা মহিমান্বিত কৃতিত্বের। এর জন্য যেমন প্রকৃত ব্রতচারী শিক্ষক প্রয়োজন তেমনি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পরিবেশের মাধ্যমে আদর্শ শিক্ষক তৈরি করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যায়ন বেলায় শিক্ষককে পিছুটানমুক্ত রাখতে সম্ভাব্য সব করার পাশাপাশি অন্তত আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষকদের স্কেলের ঊর্ধ্বে/ বিশেষ স্কেলে বেতন প্রদান; দ্বিতীয়ত, ষাণ্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়ন ও বাত্সরিক সামষ্টিক মূল্যায়নের সময় বছরে দুটি অতিরিক্ত মূল্যায়ন বোনাস চালু করা হবে উদ্দীপনাদায়ক।

গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে এ ব্যয় অবশ্যই কার্যকর হওয়া আবশ্যক। এসডিজি-৪ অর্জন ও বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শিক্ষায় অতিরিক্ত বরাদ্দ কার্পণ্যের কারণ থাকতে পারে না। মর্যাদা ও স্বাধীনতা শিক্ষকের আজন্ম অধিকার। প্রাপ্য এ মর্যাদা রক্ষা শিক্ষকের সারা জীবনের দায়। নিবিড় মনিটরিং ও মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে সব মূল্যায়ন যাত্রায় প্রতিটি শিক্ষকের ভূমিকা হয়ে উঠুক কিংবদন্তিতুল্য!

লেখক:গবেষণা কর্মকর্তা, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৬/০১/২০২৪


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.