এইমাত্র পাওয়া

মানহীন কারিগরি শিক্ষায় ব্যাহত হবে উন্নয়ন

মোঃ মোখলেছুর রহমানঃ কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ৮ম পর্ব ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজির কিছু ছাত্র প্রতি বছর কুমিল্লা পিডিবিতে ইন্টার্নশীপ করতে আসে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাস আমাকে নিতে হয়। এ’বছর পঁচিশ জন ছাত্রের দলটিকে নিয়ে আমার প্রথম ক্লাসে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং জ্বালানীর ভিন্নতা ও টারবাইনের শ্রেণিভেদে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন কেন্দ্র, পীকলোড এবং বেসলোডে তাদের ব্যবহার নিয়ে কথা বলা শুরু করি। ছেলেগুলো সবাই বোকার মতো ফেলফেল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। রিলেটেড বিষয়ে দু’তিনটা প্রশ্ন করি কিন্তু একটাও উত্তর কেউ দিতে পারেনি। আমি বললাম- তোমাদের এই অবস্থা কেন? সবাই সমস্বরে উত্তর দেয়, এগুলো তারা এর আগে কখনো শোনেনি। অথচ এগুলোই ইলেকিট্রক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রথম পাঠ। তার আগের ব্যাচের সাথে মিটারিং বিষয়ে থিউরি এবং সার্কিট ডায়াগ্রাম নিয়ে আলোচনা করার সময় আমার পাশে বসা পাপিয়া সরকার নামের একজন ছাত্রী বারবার বিরক্তি সহকারে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি মনে করেছি অধিক সময় ক্লাসে ধরে রাখার কারণে সে আমার উপর ক্ষিপ্ত এবং সেটা আমি তাকে জিজ্ঞাসাও করি। ক্লাসে জবাব না দিয়ে বাসায় ফিরে সে আমাকে ফোন করে জানায়, সে বুঝতে পারছিল আমি যেগুলো বলছিলাম সেগুলো ওদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু দুর্ভাগ্য এগুলোর কিছুই প্রতিষ্ঠানে তাদের পড়াশোনা হয়নি, তাই বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। গতমাসে কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং-এ অধ্যক্ষ মোঃ ইয়াসিন জানান তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের ১৮৫টি পদের বিপরীতে মাত্র ২৫ জন কর্মরত আছে, এর মধ্যেও পাঁচ জনের অন্যত্র বদলির আদেশ হয়ে আছে। তিনি অসহায় ভাবে প্রশ্ন করেন- কিভাবে ক্লাশ সমুহ চালিয়ে যাবেন? অধ্যক্ষের কক্ষে আসার আগে ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টে অতিথি শিক্ষক আফসানা মিমি নামে আমার একজন প্রাক্তন ছাত্রী আমাকে দেখে অনেকটা চিৎকার করে উঠে- ‘স্যার আমাকে সাহায্য করেন, আমি বিপদে আছি’। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই সে বলে- তাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে ক্লাস দেয়া হয়েছে, অথচ সে এ’বিষয়ে কিছুই জানে না।–এই হচ্ছে বাংলাদেশের সমস্ত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট তথা মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহের বর্তমান অবস্থা, যেখানে ৮৩% শিক্ষকের পদ শুন্য। ক্লাস নিচ্ছে দিনমজুরের চেয়ে কম বেতনে (মাসে ৫/৬ হাজার মাত্র) চাকুরী করা কিছু খন্ডকালীন শিক্ষক। ব্যবহারিক ক্লাস মোটেই হয় না। অথচ যে কোন দেশের উন্নয়ন, সে দেশের মান সম্মত মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষার ব্যাপ্তির সাথে সমানুপাতিক।

বাংলাদেশে তিন স্তরে কারিগরি শিক্ষার পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ’গোলে হলো- সার্টিফিকেট স্তর: এইসএসসি ভোকেশনাল, এসএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ভোকেশনাল ও বেসিক ট্রেড কোর্স; ডিপ্লোম স্তর: বিভিন্ন বিষয়ে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিগ্রি স্তর: বিভিন্ন বিষয়ে বিএসসি-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং, বিএসসি-ইন-টেকনিক্যাল এডুকেশন। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ১০ হাজার ৭০০টির মতো কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। এ’সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর আসন সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ২৫০জন। ২০৪১ সালে উন্নত, সমৃদ্ধ, স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য সামনে রেখে কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে জোড়াতালি দিয়ে চললে কারিগরি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কোনভাবেই সফল হবে না। নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের কারিগরি শিক্ষা অনেকটাই জোড়াতালি দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

দেশের সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহে শিক্ষক সংকট চরমে। প্রতিষ্ঠান সমুহে ৮৩% শিক্ষকের পদ শূন্য। শিক্ষক ও প্রশিক্ষক (ঈৎধভঃ ওহংঃঁপঃড়ৎ) না থাকায় তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহে শিক্ষকের ১৫ হাজার ৫৯৭টি পদের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ২ হাজার ৮৯৩ জন। বাকি ১২ হাজার ৭০৪টি পদই শূন্য। তাছাড়া ৬ হাজার ৭১টি কর্মচারির পদও শূন্য। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সমূহে স্টেপ (ঝঞঊচ) প্রকল্পের ৭৭৭ জন শিক্ষক থাকায় কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে প্রতিষ্ঠান সমুহের ক্লাস আংশিক চালু রাখা যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট লিখিত নির্দেশনা সত্ত্বেও এই ৭৭৭ জন শিক্ষকের চাকুরী রাজস্বখাতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রায় পাঁচ বছর ঝুলে আছে। এই শিক্ষকগণ ৪২ মাস যাবত বেতনভাতা পায় না। পেটে ক্ষুদা, ঘরে অভুক্ত সন্তান রেখে আর যাই হোক, শ্রেণী কক্ষে পাঠদান কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। ২০০৭ সালে ৫০% ভাতা প্রদান করে বিদ্যমান শিক্ষক দ্বারা ২য় শিফটের ক্লাস চালু করা হয়। এতে করে মোটামুটি ভাবে হলেও ক্লাস সমুহ চালু রাখা গেছে। ২০১৮ সালে ভাতা বন্ধ করে বিদ্যমান শিক্ষকদের দুই শিফটে ভাগ করে দেয়া হয়। ফলে একমাত্র ননটেক ব্যতিত অন্যসব টেকনোলজির কোনটিতে ২জন এবং বেশিরভাগ টেকনলোজিতে প্রতি শিফটে মাত্র একজন করে রেগুলার শিক্ষক ভাগে পড়ে। ফলে সিংহভাগ ক্লাসই সদ্য পাশ করা অনভিজ্ঞ খন্ডকালীন শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রায় ক্ষেত্রেই ক্লাস হয় না এবং ক্লাস না হওয়ায় ছাত্ররাও নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসে না।

প্রায় সবকটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার টেকনোলজি ব্যতিত অন্য ওয়ার্কশপ এবং ল্যাবগুলো তেলাপোকা, মাকড়শা, ইঁদুর এবং টিকটিকির দখলে। এ’সকল ওয়ার্কশপ এবং ল্যাবে যে সকল যন্ত্রপাতি আছে তার প্রায় সবগুলোই মান্ধাতার আমলের। যন্ত্রপাতি পরিচালনা করার মতো দক্ষ শিক্ষক বা প্রশিক্ষক (ঈৎধভঃ ওহংঃঁপঃড়ৎ) কোনটাই প্রতিষ্ঠান গুলোতে নাই। অথচ কারিগরি শিক্ষার ডিগ্রি স্তরে ২৫%, ডিপ্লোমা স্তরে ৪৫-৫০% এবং সার্টিফিকেট স্তরে ৬০-৭৫% ভাগই ব্যবহারিক শিক্ষা। ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ার কারনে এই সকল প্রতিষ্ঠান থেকে বেশিরভাগই অর্ধশিক্ষিত, অদক্ষ জনগোষ্টি বেরিয়ে আসছে। এসকল অদক্ষ ছেলেরা যেমন দেশে কাজ পায় না, তেমনি বিদেশে গিয়েও অন্যদেশ বিশেষত: ভারত এবং শ্রীলংকার ছেলেদের চেয়ে অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়। দুই বছর আগে টিএমইডি’র তখনকার সচিব আমিনুল ইসলাম অনেকটা জিদ করে রাতারাতি নিয়োগবিধি পরিবর্তন করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সমুহের প্রশিক্ষক (ঈৎধভঃ ওহংঃঁপঃড়ৎ) পদে ১ হাজার ২ শত জন অকারিগরি জনবল নিয়োগ করেন, যারা এখন ব্যবহারিক ক্লাসের পরিবর্তে না না দলাদলি/ গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে কারিগিরি শিক্ষার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে।

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সমুহে দুর্বল ভর্তি প্রক্রিয়ার কারনে ভর্তি ইচ্ছুক অনেক মেধাবী ছাত্ররা সুযোগ পায় না। বর্তমান নিয়মে শুধুমাত্র জিপিএ-এর উপর ভিত্তি করে ছাত্র ভর্তি করা হয়। ফলে গ্রামের স্কুল এবং মাদ্রাসা হতে নকল করে ভালো ফল করা কম মেধাবী ছেলে-মেয়েরা শহরের নকলমুক্ত পরিবেশে তুলনামুলক খারাপ রেজাল্ট করা বেশি মেধাবী ছেলেদের পিছনে ফেলে ভর্তির সুযোগ পায়। এই সকল ছাত্র-ছাত্রীরা শেষ পর্যন্ত গনিত সমৃদ্ধ জটিল কারিগরি বিষয় সমুহ আয়ত্ত্বে আনতে না পেরে মাঝ পথে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যায় অথবা খারাপ ফল করে বের হয়। মেধাবী ছাত্র ভর্তির জন্য কারিগরি বিশেষজ্ঞগন এবং পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতি ভর্তি পক্রিয়া পরিবর্তন করে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ জিপিএ এবং ৫০ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরামর্শ প্রদান করেন। মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় কারিগরি শিক্ষার প্রতি অভিবাবকদের আগ্রহ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে প্রতিটি শিক্ষাবর্ষেই সরকারি প্রতিষ্ঠান সমুহে অনেক আসন ফাঁকা থেকে যায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমুহের অবস্থা আরো নাজুক এবং ভয়াবহ। পাঁচশ’র অধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতোমধ্যেই চারশ’র মতো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

মানহীন কারিগরি শিক্ষা টেকসই উন্নয়কে চরমভাবে ব্যাহত করবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কোন বিকল্প চিন্তা না করে আমাদের কারিগরি শিক্ষার হার এবং গুনগত মান বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে এর হার এবং গুনগত মান বৃদ্ধির জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ সমুহ বন্ধ করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিকে এনরোলমেন্ট কমাতে হবে এবং আজেবাজে বিষয়ে অনার্স কোর্স এবং বেকার তৈরির ডিগ্রি পাস কোর্স বন্ধ করে ভর্তি পরীক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে মেধাবী ছেলেদের কারিগরি শিক্ষামুখী করতে হবে। সবার আগে প্রতিষ্ঠান সমুহের শিক্ষক সংকট দুর, ল্যাব-ওয়ার্কশপ সমুহের আধুনিকায়ন এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষক (ঈৎধভঃ ওহংঃঁপঃড়ৎ) নিয়োগ করে লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে দুর্বল করার দেশি-বিদেশি সকল ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে।

লেখক: সহ-সভাপতি, কেনিক, আইডিইবি

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৫/১২/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.