এইমাত্র পাওয়া
ফাইল ছবি

সম্মিলিত ঐক্যমত ছাড়া শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা কঠিন

শরিফুল হাসান: নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে যেখানে অনেক বেশি বেশি আলোচনা জরুরি সেখানে কি না এই শিক্ষাক্রম নিয়ে উন্মুক্ত একটি আলোচনা সভার অনুমতি বাতিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই আলোচনার আয়োজন করেছিল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনের আর সি মজুমদার মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি (বরাদ্দ) নিয়েছিলেন আয়োজকেরা। বেলা আড়াইটায় এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য ওই মিলনায়তনের কাছেও যান আয়োজকেরা। কিন্তু বেলা দুইটার আগ মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন আয়োজকদের মুঠোফোনে জানান, ওই মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। আর সি মজুমদার মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে বাতিলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন আবদুল বাছির প্রথম আলোকে বলেছেন, শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনার অনুমতি দেওয়া হলেও এখানে সরকার ও রাষ্ট্রকে হেয় করা হতে পারে এমনটা অবহিত হয়ে আয়োজকদের বিনয়ের সঙ্গে না করা হয়েছে।

ভীষণ অবাক হলাম এমন কথা শুনে। আগে থেকে কী করে তারা বুঝতে পারেন যে সরকার ও রাষ্ট্রকে হেয় করা হবে? আর ক্ষমতাসীনরা যদি সবসময় ভাবে যে রাষ্ট্র ও সরকারকে হেয় করা হবে এবং সবকিছু বন্ধ করতে চায় তাহলে তো ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা কোনোটারই নেতৃত্ব দিতে পারতো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবাদ সভায় আয়োজকেরা অভিযোগ করেন, এই আলোচনা অনুষ্ঠানের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও এই অনুষ্ঠান করতে না দিয়ে মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। এটি কলঙ্কময় অধ্যায় ঘটল। আসলেই কী তাই নয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা করা না যায়, তাও আবার শিক্ষকরাই যদি আলোচনা করতে না পারেন, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? একটা কথা মনে রাখতে হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হোক সেটা ভিন্নমত কিংবা সমালোচনা, এই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে সব উন্নয়ন অর্থহীন।

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আমি কিছুদিন আগে বিস্তারিত লিখেছি। তাতে বলেছি, পরীক্ষা নেই বলে ছেলেমেয়েরা আনন্দিত। তারা মজা করে শিখছে। আনন্দ নিয়ে ক্লাস করছে। তবে শিক্ষক ও অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। আর এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জটা শিক্ষকদের নিয়ে। কারণ, নতুন শিক্ষাক্রমে গতানুগতিক পরীক্ষা পদ্ধতির বদলে শিখনকালীন মূল্যায়নের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। আর এই কাজটা ধারাবাহিকভাবে করতে হবে শিক্ষকদের। মুশকিলটা এখানেই। কী করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে নজর দেবেন শিক্ষকরা? কী করে সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করবেন? কারণ, বাংলাদেশে এখনো শ্রেণিভেদে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত অনেক বেশি। শিক্ষকতায় যারা গিয়েছেন তাদের অনেকেই মোটিভেডেট নয়। শিক্ষক নিয়োগে অনেক ত্রুটি এই দেশে। শিক্ষকদের বেতন ভাতা অনেক কম। পরীক্ষা না থাকলে তাদের প্রাইভেট আর কোচিং বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রম, নতুন পাঠ্যপুস্তক, শিখন-শিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতিসহ নানা বিষয় নিয়ে অধিকাংশ শিক্ষকের ধারণা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁরা শিক্ষাক্রম ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না। অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। অনেকে প্রশিক্ষণ পেলেও বুঝতে পারছেন না। এসব নিয়ে কথা বলতে হবে।

আমি লিখেছিলাম, আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন শিক্ষাক্রম শুরু করলে ভালো হতো। তবে শুরু যখন হয়েছে কোথাও কোনো ভুল থাকলে সেটি ঠিক করতে হবে। এ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা মতামত ভিন্নমত জরুরি। সবার এখানে একটা উদার মন দরকার। সরকারেকে সবার কথা শুনতে হবে। কান নিয়েছে চিলে এমন ভাবনা থেকে অভিভাবকদের বের হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড আর আমাদের সেই মেরুদণ্ডটা একদম ভালো নয়। কাজেই অতীত নিয়ে গর্ব না করে সবাই মিলে কীভাবে মেরুদণ্ডটা ভালো করা যায় তা নিয়ে কথা বলতে হবে। সেই কথা বলার সুযোগটা বন্ধ করে দিলে কিন্তু সমস্যা। আশা করছি আমাদের নীতিনির্ধারকেরা বুঝবেন। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আরও অনেক বেশি আলোচনা করবেন। কারণ, সম্মিলিত ঐক্যমত ছাড়া এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা কঠিন।

লেখক: কলামিস্ট

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.