এইমাত্র পাওয়া

স্কুলের কাজ হোক, শিশু মন থেকে হীনমন্যতা দূর করে সাহসী করে তোলা

মুজতবা হাকিম প্লেটো: শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা পুরোনোটা ছেড়ে নতুনটা নিয়ে মেতেছে। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অর্ধশতাব্দীব্যাপী যতো মতামত শুনেছি সবই যে যার শ্রেণি ও কমিউনিটির ভিত্তিতে করেছে। নিজের পরিবারের শিশুদের জন্য যে শিক্ষা কামনা করেন সেটাই সবাই বলে থাকেন। ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, রক্ষণশীল নিম্নবিত্ত এমন অনেক দৃষ্টিকোন মিলে যাবে। কেউই দেশের সব শিশুর কথা চিন্তা করেন না। একবার বামপন্থি ছাত্রদের এক সভায় বক্তব্যে বলেছিলামÑসবাই যদি জজ ব্যারিস্টারই হবে তবে শ্রমিক হবে কে? খুব অপছন্দ হয়েছিল আমার কথাটা তাদের। বরং কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে আমি কী ভাবি সেটাই বলি।

সবচেয়ে মেধাবী শিশুটির পূর্ণবিকাশের ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়া সবচেয়ে খারাপ ব্যবস্থা। স্কুল তখন শুধু সুবিধাপ্রাপ্ত এবং একাগ্র শিশুদের কারখানা হয়ে দাঁড়ায়। অথবা শুধু জজ, পণ্ডিত, কেরানী গড়াই উদ্দেশ্য হয়ে যাবে। সবাই এসব হবে না ফলে সবার এ শিক্ষা দরকারও নেই। ফলে শতভাগ শিশুর বিকাশে তা কখনোই কাজে দেবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশুটির বিকাশের সহায়ক হওয়া দরকার। ফলে গড় মান বলেও কিছু স্থির করা অনুচিত। তখন কোনো শিশুই আর ড্রপ আউট হবে না, শিক্ষা তার নাগালের বাইরে চলে যাবে না। এই প্রান্তিক শিশু শুধু আর্থিকভাবে নয় অনেক রকম স্কেলেই এই প্রান্তিক স্কেলটি স্থির করা যেতে পারে।

বেশির ভাগ শিশুর কাছে প্রমিত বাঙলা শেখা আর ইংরেজি অসমীয় শেখা সমান কথা। ৯৯ ভাগ শিশু বাপ-মায়ের মুখে এ ভাষা শোনেই না। প্রাথমিক স্কুলে কমিউনিটির ভিত্তিতেই ভাষা ব্যবহার করা উচিৎ। একটা চুটকি আছে নোয়াখালীর শিশুরা বানান করে পড়ে— স ক ল হগোল। আদতে হগল ওই শিশুর মাতৃভাষা। তাকে শিক্ষা দেওয়ার সময় তার এই ভাষার মর্যাদা দান খুবই জরুরি। স্কুলের প্রধান কাজ শিশুর সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান মানসিক বিকাশ। যে কারণে পেটানো নিষিদ্ধ হয়েছে একই কারণে মাতৃভাষাসহ যা যা শিশুটির নিজস্ব তাকে স্থান দিতে হবে। হীনমন্যতা যেন কোনো ভাবে তার মনে স্থান না পায়। বরং পরিবার থেকে যে হীনমন্যতা অর্জন করে তা যেন কাটিয়ে উঠতে পারে। কারণ খুব কম পরিবারই শিশুর পূর্ণবিকাশের ব্যাপারে সচেতন। শিশুর সঠিক বিকাশ আমাদের সংস্কৃতিতে এখনও গড়েই ওঠেনি। স্কুল সেই কাজটাই করবে প্রথম।

বামপন্থিরা বলবেন দ্যাখছেননি। পচা বামটা ক্যামনে শ্রেণিবিভাজনটা আগল্য়া রাখলো। -হ ভাই রেখেছি। ওখান থেকেই শুরু যে। প্রমিত বাংলা, ইংরেজি এসব বড় হতে হতে পাশাপাশি শেখাবে ভাষার বিভিন্ন রূপ হিসাবে। বাংলাদেশে সবকিছু একরূপ করার দারুণ প্রবনতা কাজ করে। দরকার কী? জাতীয় পতাকা জাতীয় সংগীত এসব ছাড়া সবই তো বৈচিত্রময়। শিক্ষার বিষয়েও সেই বৈচিত্র রাখাই কর্তব্য। নতুন শিক্ষা পাঠ্যসূচি সম্পর্কে এখনও কিছুই জানি না। ‘ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের’ মাধ্যমে জানতে পেরেছি শুধু যে এখন থেকে হাতে-কলমে শিক্ষা দেবে আর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় মাত্র ৫টা বিষয়। আর কী আছে জানি না। আমার কাছে মনে হয়েছে আরেকটু সংযোজন দরকার।

নিয়মিত স্বল্প সাবজেক্ট এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ ও কাজ ভিত্তিক নানা কর্মসূচি। ক্লাস, স্কুল, এলাকা, জেলা এবং জাতীয় ভিত্তিক নানা প্রতিযোগিতা এবং কর্মসূচি। তা সেটা বই পড়াই হোক আর খেলা, কৃষি, সেলাই, বেচাকেনা, উদ্ভাবন আর সমাজসেবা যাই হোক। সব কর্মসূচি যে পূর্বনির্ধারিত হতেই হবে নয়, কোনো শিশু নতুন কোনো কর্মসূচিও ‘আবিষ্কার’ করতেই পারে। শিক্ষকের কাজ শিশুটি আদতে কী করতে চায় তা দিয়ে কী অর্জন করতে চায় সেটা দেখা। ইংরেজি স্কুলে যেসব প্রজেক্টওয়ার্ক দেয় তা মোটেও শিশুবান্ধব না। ওগুলো বাপেরা মায়েরা বানিয়ে দেয়। অকার্যকর ব্যাপার। বরং সে যেটা করতে পারে ততটুকুই করতে দেওয়া।

স্কুলের কাজ হোক, শিশুটির মন থেকে হীনমন্যতা দূর করে সাহসী করে তোলা। সে নিজেকে নিয়ে কী করবে ভবিষ্যতে তা ভাবতে শেখানো। নৈব্যক্তিকভাবে সমাজসজ সব জ্ঞানকে অবলোকন করতে শেখানো। ‘আমি’ ‘আমিত্ব’ ‘শুধুই আমার মত’ নয় বিশ্বটা বৈচিত্রময় এই বৈচিত্রতা স্বাভাবিকভাবে সহ্য করতে শেখানো। —আমাদের দেশের এটাও এক সমস্যা যে আমরা অপরকে কিছুতেই মানতে পারি না। অথচ সারা বিশ্বে কামলা দিতে যেতে চাই।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৫/১২/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়

“মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার কলামে প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের নিজস্ব। শিক্ষাবার্তা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, শিক্ষাবার্তা কর্তৃপক্ষের নয়।”


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.