অথচ জ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিটি শাখা-প্রশাখা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। যেমন মার্কেটিংয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ‘কনজিউমার বিহেভিয়র’। ক্রেতার আচরণ, মনোভাব বুঝে কীভাবে পণ্য বা সেবার প্রচারণা করতে হয়, পণ্য তৈরি করতে হয়, সেসব বিষয়ই এখানে পড়ানো হয়। ক্রেতার ‘মন’বিষয়ক কোর্সটির এক বড় অংশ আদতে মনোবিজ্ঞানের নানা তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে কনজিউমার বিহেভিয়র নিয়ে যিনি ভবিষ্যতে গবেষণার কথা ভাবছেন, স্নাতক পর্যায়ে তাঁর জন্য মনোবিজ্ঞানের এক-দুটি কোর্স হতে পারে দারুণ উপকারী। শুধু জ্ঞান নয়, বাস্তব পৃথিবীর কোনো সমস্যাও মানবসৃষ্ট ছক মেনে চলে না।
যে বিজ্ঞানী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে কাজ করেন, তাঁকে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি অবশ্যই জানতে হবে। তবে সেই সঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে প্রান্তিক মানুষের জীবনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কী প্রভাব পড়ছে। বিজ্ঞানের ক্লাসরুম থেকে তাই তাঁকে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকাতে হয়, বুঝতে হয় ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’দের জীবনব্যবস্থা, তাঁদের সমাজ, তাঁদের প্রেক্ষাপট, তাঁদের টিকে থাকার লড়াই। তাই বিশ্বখ্যাত পরিবেশবিজ্ঞানী জেমস হানসেনও বলেন, ‘আমি শিক্ষকদের অনুরোধ করছি, শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কী ও কেন হয়—তা বলেই ক্লাস শেষ করবেন না। কারা এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটিও তাদের জানান। সমাজের ওপর, আমাদের জীবনের ওপর এর প্রভাব কী, তা নিয়েও কথা বলুন। শুধু বিজ্ঞান নয়, মানবিকতার লেন্স দিয়ে যেন তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে দেখতে পায়, সেটি নিশ্চিত করুন।’
হানসেনের কথার সূত্র ধরেই কথা হচ্ছিল ইরাসমাস স্কুল অব সোশ্যাল অ্যান্ড বিহেভিয়র সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক জানা ভিৎজের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, শিক্ষাকে যখন ছকে বেঁধে দেওয়া হয়, তখন তা শিক্ষার্থীদের চিন্তার বিস্তারকে রোধ করে। বিজ্ঞান শিক্ষায় সমাজ ও ইতিহাসবিষয়ক কোর্স যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন দীর্ঘ ছয় বছর। সে অভিজ্ঞতার আলোকেই জানালেন, তুমি একজন ভিনদেশি বিজ্ঞানীর তত্ত্ব থেকে সেতু বানানোর খুঁটিনাটি জানলে, শিখলে। তারপর যখন তুমি এই তত্ত্বের অন্ধ অনুকরণ করে নিজের দেশে, নিজের পরিবেশে সেতু বানাতে যাবে, দেখবে সেই তত্ত্ব আর কাজ করছে না। কারণ, তোমার দেশে নদীর স্রোত, গতিপথ, আবহাওয়া—সবই ভিন্ন। এই ভিন্নতাটুকু সম্পর্কে তোমাকে প্রস্তুত করবে, সম্যক ধারণা দিতে পারে সমাজ ও ইতিহাসবিষয়ক লেখাপড়া।
পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রচলিত আছে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি এডুকেশন’-এর প্রথা। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তো বটেই, স্কুল-কলেজ পর্যায়েও বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের বিষয়গুলোর প্রাথমিক জ্ঞানটুকু শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। তবে সব বিষয়ের দু-একটি কোর্স রেখেই যদি শুধু পড়ার বোঝা বাড়িয়ে যান, তবে কিন্তু একে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি এডুকেশন’ বলা যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে এমনভাবে তৈরি, যেন শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক কোথায়, কোথায় গিয়ে মনোবিজ্ঞানের ক্লাসে পড়া তত্ত্ব শেক্সপিয়ারের নাটকে মিশে যায়।
‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি এডুকেশন’, ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি এডুকেশন’, ‘লিবারেল আর্টস এডুকেশন’—সবই আদতে এমন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলে, যেখানে জ্ঞানই শেষ কথা নয়। জ্ঞান সেখানে আপনার জন্য একটি ভিত্তি মাত্র, যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি প্রশ্ন করবেন, ভাবতে পারবেন ও ভাবনাগুলো পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে প্রয়োগ করবেন। আমাদের বর্তমানের পুঁজিবাদী পৃথিবী শিক্ষা ও জ্ঞানকে দেখছে সম্পূর্ণ আলাদা চোখে। শিক্ষা আর জ্ঞান অর্জনের পথ নয়, বরং চাকরি পাওয়ার সনদ। তাই শিক্ষাঙ্গনে মুক্ত জ্ঞানচর্চার সুযোগ বা কাঠামো কোনোটাই আর সেভাবে টিকে নেই। বাস্তব পৃথিবীতে এই ‘সনদমুখী’ শিক্ষার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাই আজকাল আমরা হোঁচট খাই। আমাদের নীতিমালাপ্রণেতাদের নীতিতে মানবিকতার অভাব দেখা যায়, বিজ্ঞানীরা মেশিন বোঝেন, তবে মানুষের ওপর তার প্রভাব বোঝেন না। এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে তাই আবার সক্রেটিসের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মনে করিয়ে দিতে হয়, শিক্ষার মূল কথা ছিল আপনাকে মুক্ত করা। আপনার মন, মনন ও চিন্তাকে স্বাধীনভাবে প্রবাহিত করে যে স্রোত, তার নামই শিক্ষা।
লেখক: প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১২/১১/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
