এইমাত্র পাওয়া

সংবিধান সম্পর্কে জানেন না ৫৬% শিক্ষার্থী

ঢাকাঃ আধুনিক মানব সভ্যতার অন্যতম অবদান সাংবিধানিকতা। সমসাময়িক বিশ্বে প্রায় সব দেশেই সংবিধান রয়েছে। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। একটি জাতির আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অধিকারগুলো এই দলিলে লিপিবদ্ধ করা হয়। যা ওই দেশের আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করে। অধিকাংশ সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ সন্নিবেশিত থাকে। এ কারণে সংবিধানকে বলা হয় একটি দেশের আয়না।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান । মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। সংবিধান প্রণয়ের উদ্দেশ্য গঠিত গণপরিষদের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি ৭৪টি বৈঠকে মিলিত হয়ে ৩০০ ঘন্টা সময় ব্যয় করে সংবিধান রচনা করেছিল, যা সময় হিসেবে লেগেছিল নয় মাস।

সংসদ তথা সরকার যে আইন করবে, তা জনগণের জানা থাকতে হবে এবং সে অনুযায়ী চলার দায়িত্ব জনতার। সে আইনটা যদি হয় সংবিধান, তাহলে তো নাগরিক হিসেবে সবারই জানার কথা। কিন্তু পরিতাপের বিষয়- সাধারণ জনগণ তো দূরের কথা, আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ তথা ছাত্ররাও সংবিধান সম্পর্কে তেমন জানে না।

বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে তারা কতটুকু জানে, আদৌ সংবিধান চোখে দেখেছে কিনা বা সংবিধান দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইব্রেরিতে অন্যান্য রেফারেন্স বইয়ের সঙ্গে সংগ্রহে আছে কিনা প্রভৃতি বিষয়ে জানার জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পের অধীন এ সম্পর্কে গবেষণাটি করা হয়। গবেষণাটি করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষক মো. মনির আলম।

গবেষণায় ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১৭২টি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ১০ হাজার ২৭৯জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায় নিম্ন মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানে না, সংবিধান কি? তার মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ৭৩%, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৭%, দাখিল পর্যায়ে ৮৮% এবং আলিম পর্যায়ে ৬২%। তবে স্নাতক পর্যায়ে না জানার সংখ্যা কিছুটা কম, যা শতকরা হিসেবে ১৯ ভাগ।

ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশে যে একটি সংবিধান আছে তা আপনারা জানেন কিনা? উত্তরে মোট ছাত্র ছাত্রীর ২৭ শতাংশই না-বোধক উত্তর দিয়েছেন। এদের মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক যথাক্রমে ৪৮% এবং ৩৩%, দাখিল এবং আলিম যথাক্রমে ৬১% এবং ৩৮%। স্নাতকে মাত্র ৩ শতাংশ না বোধক উত্তর দিয়েছেন।

প্রশ্নমালায় একটি প্রশ্ন ছিল, আপনারা কি সংবিধান দেখেছেন? মাত্র ১৬ শতাংশের বেশি কিছু ছাত্র ছাত্রী বলেছেন তারা সংবিধান দেখেছেন। কিন্তু যখনই তাদের সংবিধানের কভার পেজের রং লিখতে বলা হলো, তখন তা ১১ শতাংশে নেমে আসে। অনেক ছাত্র ছাত্রী বিসিএস বা চাকরির পরীক্ষায় সংবিধান বিষয়ক প্রশ্ন আসায় সংবিধান সম্পর্কে কিছুটা ওয়াকিবহাল। এদের আবার অধিকাংশই পকেট সংবিধান ব্যবহার করেন। সে হিসেবে সংবিধান দেখেছেন এমন নিম্ন মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক ছাত্র ছাত্রীদের হার যথাক্রমে ১.২০% ও ১.৮৮%, দাখিল এবং আলিম পর্যায়ে হার যথাক্রমে ০.৬% ও ০.৯৭%। স্নাতক পর্যায়ে মাত্র ৩৪% শিক্ষার্থী সংবিধান দেখেছেন।

কৌতুহলবশত গবেষক জানতে চেয়েছিলেন, কারো বাসায় কোনো সংবিধানের কপি আছে কিনা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংবিধান দিবস পালন বা এই বিষয়ে কোন ওয়ার্কশপ সেমিনার হয় কিনা। উত্তরে ১০০% ছাত্র ছাত্রীই না বোধক উত্তর দিয়েছেন। এর পাশাপাশি স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র ছাত্রীদের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকারসহ সংবিধান থেকে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করা হয়, যার ৩৬% ই তারা জানেন না।

জেলার ১৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি তাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো সংবিধানের কপি আছে কিনা। নিম্ন মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ১০৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানে সংবিধানের কপি পাওয়া গেছে, যা শতকরা হিসেবে মাত্র ৩.৭৪%। দাখিল, আলিম মাদ্রাসা পর্যায়ের ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান সংবিধান আছে মর্মে আশ্বস্ত করেছেন, যা শতকরা হিসেবে মাত্র ৩.৩৩%। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে সংবিধানের কপি দেখা গেছে।

গত বছর সংবিধানের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়েছে। অথচ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সংবিধানকে ছাত্রদের মাঝেও সেভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো ময়মনসিংহ জেলার প্রায় ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী সংবিধানই দেখেনি! স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ৯২ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংবিধানই নেই। আমরা যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য সংগ্রহে যায়, তখন শিক্ষক- শিক্ষিকারা বলেছেন, তারা নিজেরাই সংবিধান দেখেননি। বরং কৌতূহলবশত তারা গবেষকের কাছ থেকে সংবিধান দেখতে চেয়েছেন।

লেখকঃ তৈয়ব শাহনূর

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৪/১১/২০২৩ 

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.