শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

প্রফেসর মুজিব রাহমানঃ শিক্ষকতা কোনো লুপ্ত শিল্প নয়, কিন্তু শিক্ষকতার জন্য শ্রদ্ধাবোধ এক লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের অন্তর্গত। কেউ কেউ অবশ্য ভাবতে শুরু করেছেন তাহলে কি শিক্ষক সমাজ আবেগিকভাবে প্রতারিত। চূড়ান্ত বিচারে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীর আকস্মিক সালাম আর কদমবুসির বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত নজির টেনে কোনো এক শিক্ষকের তুষ্টির পারদ বেড়ে যাওয়াটাকে গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদার মাপকাঠি বলে দেওয়া অযৌক্তিক ও অবাস্তব। আমাদের সমাজে ক্ষমতাকাঠামো শিক্ষককে আদৌ ক্ষমতায়িত দেখতে চায় কি না সেটি একটি বড় জিজ্ঞাসা। আজকের পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় শিক্ষকের দায় ও দায়িত্বের সীমাও নতুন করে নির্ধারণের সময় এসে গেছে। পরীক্ষা ও সাফল্যনির্ভর ছায়াশিক্ষার হাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রায় পরাহত, নাজেহাল ও প্রতিনিয়ত সংকটাপন্ন।

মানুষ তার অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার চত্বরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শিখে নিয়েছে একগাল চপেটাঘাতগ্রস্ত হলে আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিটি অসভ্যতা ও দাস্য মনোবৃত্তির পরিচয় বহন করে। নির্যাতকের শক্তি ঘৃণ্য। প্রতিরোধ ও প্রতিবাদই একমাত্র সুরক্ষা।

পরীক্ষা উতরে যাওয়ার মোক্ষম দাওয়াই ও ধন্বন্তরি হিসেবে ছায়াশিক্ষার প্রভাব অপরাহত ও তুমুলভাবে কার্যকর। আর প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্যের কারণে ছায়াশিক্ষার এ-বাজারটি আজ বাছ-বিচারহীনভাবে ব্যাপক, বিস্তৃত ও তীব্রভাবে জায়মান। যে আচরণগত সৌজন্যের নাম শিক্ষা তা শ্রেণিকক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যায় চর্চিত হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল পরিবারে, সংসারে ও সমাজে ছড়িয়ে পড়বে এমন সৌজন্যের সৌন্দর্য। পুরো দেশটাই এক সৌজন্যভরা শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরিত হবে- এমনই ছিল একজন স্বপ্নবাদী শিক্ষকের দুর্মর প্রত্যাশা। জানি না, ইতিমধ্যে সমস্ত আশার গুড়ে আশঙ্কার বালি ছড়িয়ে পড়েছে কি না!

পুরো দেশটা সমৃদ্ধ হলে দেশের নাগরিক হিসেবে, ভূমিপুত্র হিসেবে প্রত্যেকেই সেই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হবে, সুযোগ-সুবিধাভোগী হবে এই-ই তো স্বাধীন দেশের গোড়ার কথা ছিল, শুরুর কথা ছিল। কিন্তু যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে সেটি ভয়াবহ। তস্কর তন্ত্র, চোরছ্যাঁচড়তন্ত্র তার বিজয় পতাকা উড়িয়ে চলেছে। যেকোনো শাসনের নেপথ্য মন্ত্রটিই প্রত্যক্ষ প্রদর্শিত হয়, প্রতীয়মান ও দৃশ্যমান হয়ে উঠে তার নানা কর্মকৌশল ও কর্মকাণ্ডে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পরতে পরতে ফাইল আগলে বসে থাকা মানুষ, বিরল ব্যতিক্রমী কিছু জনসেবক বাদ দিলে, পয়সা ছাড়া আর কাউকে কুর্নিশ করতে নারাজ। ক্ষমতায়িত মানুষদের ক্ষমতার জাল চারদিক থেকে সমাজের সভ্য মানুষের, সুনাগরিকের পায়ে বেড়ি পরাতে ভীষণভাবে উদ্যত হলে বুঝতে হবে- ‘Something is rotten in the state of…।’

পড়াশোনার চর্চা মোবাইল আগ্রাসনের বলি হয়ে আছে বহুদিন ধরে। চিন্তনের ‘নিজস্ব ধরন’ জন্ম দিচ্ছে আত্মমগ্ন, বৃহৎ জগৎ থেকে প্রত্যাহৃত এক প্রজন্ম। যে প্রজন্মের জন্মের আগেই সবকিছুর সুবন্দোবস্ত করার জন্য উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে উঠছে মা-বাবা। একা বড় হওয়ার মন্ত্র দেওয়া হচ্ছে তার ভবিষ্যতের জন্য গৃহীত প্রতিটি বন্দোবস্তে। এতে করে স্বার্থকেন্দ্রিকতার নির্মম মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে সর্বত্র।

অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের কোনো না কোনো জায়গায় কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করছেন। কাজেই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে মনোযোগী হতে হবে শ্রেণিকক্ষকে বাঞ্ছিত আগামী নির্মাণের সূতিকাগার হিসেবে তৈরি করার, গড়ে তোলার জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদনের মহান কাজে। যার গুরুত্ব অমূল্য ও অপরিমেয়।

শ্রেণিকক্ষগুলো আগের চেয়ে সুপরিসর না অপরিসর, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসমন্বিত না সুবিধাবঞ্চিত সেসবের চেয়ে বড় বিষয় সেসব শ্রেণিকক্ষে কী হয়, কী নিয়ে কথা হয়। শিক্ষার্থীরা শুধুই কী পরীক্ষা পাসের জন্য পড়াশোনা করে, শিক্ষকও কি ওই একই কাজে তাকে সাহায্য করাতেই নিজেকে সীমাবন্ধ রাখেন, কী হয় আসলে! জানার জন্য কেউ কি আছেন, কোনো কর্তৃপক্ষ! যারা শিক্ষা প্রশাসনের পাশাপাশি গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের অলিখিত দায় নিজেদের কাঁধে নিয়ে ক্ষমতার ছায়ায় থেকে শিক্ষা ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণের কাজে নিরত আছেন, যাদের কোনো শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে হয় না, পড়াশোনা লাগে না। শক্তিই যাদের বিদ্যার বিকল্প তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রকে বেশি করে ভাবার ও ব্যবস্থা গ্রহণ করার সময় এসে গেছে। বিদ্যা থাকলে কিছুটা বিনয় সহগামী হয়। আর শক্তির প্রকাশ ঘটে আস্ফালনে, সীমাহীন ঔদ্ধত্যে আর আদবশূন্য অভব্য আচরণে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সামরিক শাসন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করেছে নানাভাবে। এ দেশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত। সময়ের প্রয়োজনে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্রছাত্রীরাই ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে গুরুত্ববহ ঐতিহাসিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কাজেই, শিক্ষার্থীদের দেশাত্মবোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতা অটুট রাখার জন্য, দেশ, জাতীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ও ওয়াকিবহাল থাকার কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীন দেশে শিক্ষাঙ্গনের নেতৃত্ব এজন্য শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মাঝে সবচেয়ে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন, মনোযোগী ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন শিক্ষার্থীকেই দিতে হবে। তাদের মধ্যে সমাজসেবা ও দেশসেবার মনোভঙ্গি তৈরি করতে হবে। এসব কাজে বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। দেশাত্মবোধ যে আত্মত্যাগ ও আত্মসমীক্ষা দাবি করে সে বিষয়টি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর মনে সঞ্চারিত করার কাজটি আদৌ চলছে কি না তা পর্যবেক্ষণ ও পরিবীক্ষণের আওতায় আনতে হবে। লক্ষ করতে হবে সমাজের মহৎ মানুষদের উদাহরণ তাদের প্রাণিত করছে কি না, নাকি অপ্রত্যাশিতভাবে উল্টোটাই সত্যের জায়গা দখল করে বসে আছে। এসব বিষয়দ সমাজচিন্তক ও রাজনীতিবিদদের ভাবিত না করলে তিমিরবিলাসী এ সমাজ তিমিরেই সমাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকবে, থাকতে বাধ্য হবে।

সাংস্কৃতিক আলোকায়নের কর্মসূচি থাকতে হবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু তাহলেই শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষকতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আনুগত্য ও শ্রদ্ধা জন্মাবে। শিক্ষকের প্রতি তার সকৃতজ্ঞ মনোভঙ্গি থাকবে। সে দানবিক আচরণ প্রদর্শনের কোনো মনোগত প্রশ্রয় পাবে না। ছাত্র রাজনীতির যে সংস্করণ থাকবে সেটি হবে ভীষণভাবে পাঠনিমগ্ন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে, পড়াশোনার সুবিধা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে অত্যন্ত দায়িত্বপরায়ণ ও সদা তৎপর। শিক্ষা যে নিঃশব্দ বিপ্লবটি ঘটানোর কথা ছিল নানা আনুষ্ঠানিকতার ডামাডোলে তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে বললে ভুল হবে না এবং যা যা ঘটছে এসব সামগ্রিক অধোগামিতার ধারাবাহিক প্রকাশ এ-কথা বলার জন্য বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই বলেই মনে হয়।

এ দেশের আগামী নিয়ে এ দেশের নেতৃত্বকেই ভাবতে হবে। শিক্ষায় নির্দেশনা ও সময়োপযোগী নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মশক্তিকেই এ ক্ষেত্রে যথাযোগ্য ও গতিশীল নেতৃত্ব দিতে হবে। কাজ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বড় প্রতিবন্ধক। কৃত্য পেশাভিত্তিক জনপ্রশাসন চালু না হলে এ দেশে ‘শিক্ষা’ Cinderella-এর মতো অবহেলিত ও উপেক্ষিত থেকে যাবে এবং শিক্ষা যেখানে নিপীড়িত ও নিগৃহীত সেখানে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো দুর্লক্ষ্য হতে বাধ্য। শাসক-প্রশাসকদের অযাচিত ভিড়ে শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হলে কোন উন্নয়ন নিশ্চিত হবে তা ভবিতব্যই জানে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে অব্যবস্থা অন্তহীন। এসব কারণেই শিক্ষকতা কোনো মেধাবী তরুণের প্রথম পছন্দ নয়। এ প্রসঙ্গে ড. মনজুর আহমদের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য : ‘মেধাবী ও আদর্শবান তরুণরা শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে দেখে না। চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে বিদ্যালয় শিক্ষকতা অধিকাংশ সময় শেষ বিকল্প। বর্তমানে শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যা কিছু করা হচ্ছে, তা প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে। এর থেকে যথেষ্ট ফল পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, পেশাগত মানোন্নয়ন, কৃতিত্বের মাপকাঠি, প্রণোদনা, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে নতুন চিন্তাভাবনা দরকার, যাতে সবচেয়ে মেধাবী, সৃজনশীল ও আদর্শবান তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করে ধরে রাখা যায়। এজন্য অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে একটি হবে উচ্চমাধ্যমিকের পর চার বছরের কলেজ ডিগ্রি কোর্সে সাধারণ কলেজ ডিগ্রির সঙ্গে শিক্ষা-সংক্রান্ত সনদ প্রদানের ব্যবস্থা। দক্ষিণ এশিয়া ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে এই পদ্ধতি প্রচলিত। কাজটি সহজসাধ্য নয়। সঠিক ফল পেতে হলে এজন্য দশশালা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’

প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষা যেহেতু একটি জটিল ও বহুমাত্রিক জনসেবা সেজন্য এই নাগরিক অধিকারকে সর্বার্থে আমলে নিয়ে রাষ্ট্রকেই যথাযোগ্য ভূমিকা পালনে তৎপর হতে হবে। বৈষম্যনিবিড় সমাজে শিক্ষার সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা সংরক্ষণে সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ আজ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাচিন্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমোঘ উচ্চারণটি উদ্ধৃত করে এ-লেখা আপাত শেষ করা যেতে পারে। ‘ঘুরিয়া-ফিরিয়া যেমন করিয়াই চলি-না কেন, শেষকালে এই অলঙ্ঘ্য সত্যে আসিয়া ঠেকিতেই হয় যে, শিক্ষকের দ্বারাই শিক্ষা বিধান হয়, প্রণালির দ্বারা হয় না।’ (পথের সঞ্চয় : শিক্ষাবিধি)

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০৯/১০/২০২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.