নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ সাপ্তাহিক ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার ও আজ শনিবার জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে ছুটে আসছেন রাজধানীতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে।
দাবি আদায়ে বর্তমানে আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রধান চাওয়া ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৫ মিনিটের সাক্ষাৎ’। এ সাক্ষাতের মধ্য দিয়েই তাদের সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। তবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ সম্ভব নয়।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে শিক্ষকসহ পেশাজীবীরা দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামেন। এ সময় সরকারও কিছুটা নমনীয় থাকে। সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা বলছেন, শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবিটি যৌক্তিক। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে চাপ দেওয়া নীতিগতভাবে ঠিক হয়নি শিক্ষকদের। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বার্ষিক পরীক্ষা এগিয়ে নভেম্বরে আনা হয়েছে।
শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষ ফেলে আন্দোলনে, সিলেবাস শেষ করবেন কে? গড়পড়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পক্ষেও নন তারা। সারা দেশে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক শিক্ষকের শিক্ষাগত ডিগ্রি থাকলেও পাঠদানের যোগ্যতা নেই। তবে দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষা জাতীয়করণ জরুরি।
মাধ্যমিক স্তরে ২০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে ৬৮৪টি সরকারি স্কুল। অর্থাৎ দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রায় পুরোটা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিকে শিক্ষকদের সংখ্যা পৌনে ৩ লাখ। অভিযোগ আছে, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনেকের পাঠদানের যোগ্যতা নেই। শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি মূল বেতন এবং ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া, ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। ‘বৈষম্য’ নিরসনের দাবিতে এর আগে বেশ কয়েকবার আন্দোলন করেছেন শিক্ষকরা। এখন পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবি তুলেছেন তারা। শিক্ষকদের দাবি, একই কারিকুলামের অধীন একই সিলেবাস, একই অ্যাকাডেমিক সময়সূচি, একইভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত থেকেও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে পাহাড়সম বৈষম্য। এ ছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন-স্কেল সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন-স্কেলের একধাপ নিচে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির ব্যানারে গত ১১ জুলাই থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েক হাজার শিক্ষক। আন্দোলনের নবম দিন বুধবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। কিন্তু সেখানে কোনো সমাধান আসেনি। বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ সম্ভব নয়। তবে জাতীয়করণের যৌক্তিকতা ও আর্থিক সংশ্লেষ নিয়ে দুটি কমিটি গঠনের কথা জানান তিনি।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ বজলুর রহমান মিয়া বলেন, শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা তার এ বক্তব্যের ধিক্কার জানাই। তিনি আরও বলেন, আমাদের দাবি জাতীয়করণ। মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর তিনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাতে শিক্ষকরা সন্তুষ্ট নন। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ। তার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারলে তিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট বুঝে আমাদের একটি সঠিক সমাধানের পথ দেখাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। জাতীয়করণের সুস্পষ্ট ঘোষণা বা প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ না পেলে আমরা ক্লাসরুমে ফিরে যাব না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিটি যৌক্তিক। কিন্তু এ মুহূর্তে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা চলছে। সরকারের আর্থিক চাপ নেওয়া কঠিন। তিনি বলেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে জাতীয়করণ করা ঠিক হবে না। অপরিকল্পিতভাবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। তবে দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করে শিক্ষকদের এ ধরনের আন্দোলন করাটা নীতিগতভাবে ঠিক হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের কারণে পরীক্ষা এগিয়ে নভেম্বরে আনা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করতে হবে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষ ফেলে আন্দোলন করছে। তা হলে সিলেবাস শেষ করবে কে? তিনি বলেন, আমি শিক্ষা জাতীয়করণের পক্ষে। একসঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা সম্ভব নয়। একসঙ্গে করা ঠিকও নয়।
এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়মের কথা উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, এখন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে। আগে ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষক নিয়োগ দিত। অনেক শিক্ষকের ডিগ্রি আছে কিন্তু তাদের অষ্টম, নবম কিংবা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদানের যোগ্যতা নেই। তাই সবাইকে জাতীয়করণ করা ঠিক হবে না। নীতিমালা তৈরি করে যোগ্য ও উপযুক্তদের সরকারিকরণ করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের শতভাগ সরকার দেয়। ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধা স্কুল কর্তৃপক্ষ দেবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বেতন-ভাতা দিয়ে থাকে। সেখান থেকে শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেবে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি। স্কুলের তহবিল নিরীক্ষা করতে হবে। এগুলো জনগণের টাকা, তা যথাযথভাবে খরচ করতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যা অনেক জায়গায় প্রয়োজন নেই। আবার যেখানে প্রয়োজন আছে সেখানে স্কুল নেই। এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, শিক্ষক নেতৃত্ব আশ্বস্ত হতে চায় জাতীয়করণ প্রসঙ্গে। সরকার এ মুহূর্তে শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শিক্ষকদের দাবির প্রতি সরকার ইতিবাচক। কোনো পক্ষ অনড় অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি যৌক্তিক। পর্যায়ক্রমে সরকার পদক্ষেপ নিলে এত দিনে শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা সম্ভব হতো। তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা মৌলিক অধিকার। একই যোগ্যতা ও একই অভিজ্ঞতায় বেসরকারি শিক্ষকরা অবস্থানগত অনেক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাচ্ছেন না।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২২/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল

