রাজশাহীঃ জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলীম রেজা তাঁর কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে মাসে মাসে জোর করে তাঁদের বেতনের ৩ শতাংশ হারে চাঁদা নেন। সেলীম রেজার বিরুদ্ধে এক শিক্ষকের করা মামলার অভিযোগপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। এই অভিযোগপত্র পাওয়ার পর আদালত সেলীম রেজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। গত বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকে অধ্যক্ষের খোঁজ মিলছে না।
আরও পড়ুনঃ অন্যের ইনডেক্স ব্যবহার করে ১৭ বছর ধরে বেতন তুলছেন শিক্ষক
গত বছরের জুলাইয়ে এই কলেজের অধ্যক্ষ রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওমর ফারুক চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে এই অধ্যক্ষকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। এ নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে ওই বিষয়টি উঠে এসেছে।
কলেজের প্রভাষক মো. আহাদুজ্জামানকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে আটকে রেখে মারধর এবং তিনটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলাটি হয়েছিল। প্রভাষক আহাদুজ্জামান গত বছরের ৮ নভেম্বর আদালতে মামলাটি করেন।
মামলায় কলেজের আরেক সহকারী অধ্যাপক ওমর কোরাইশিকে আসামি করা হয়। আদালত তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলাটি তদন্ত করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) রাজশাহী মেট্রোর পরিদর্শক আনিছুর রহমান।
গত ৩০ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী যে অডিও রেকর্ড শুনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, সেটি মামলার বাদী আহাদুজ্জামান ফাঁস করেছেন বলে অধ্যক্ষ মনে করেন। প্রভাষক আহাদুজ্জামান নিজে এলাকায় একটি মামলায় ফেঁসে গেলে অধ্যক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। মামলাটি আদালতে খারিজ হয়ে গেলেও অধ্যক্ষ সাময়িক বরখাস্তের ওই আদেশ প্রত্যাহার করেননি। উল্টো আহাদুজ্জামানকে মারধর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে তাঁকে জিম্মি করেন।
অভিযোগপত্রে উঠে আসে, অধ্যক্ষ সেলীম রেজার মেয়ে রাজাবাড়ী ডিগ্রি কলেজেই পড়াশোনা করতেন। অধ্যক্ষের মেয়েকে প্রভাষক আহাদুজ্জামান শ্রেণিকক্ষে এক ছাত্রের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখেন। বিষয়টি আহাদুজ্জামান অধ্যক্ষকে বলে দিতে পারেন ভেবে মেয়েটি উল্টো আহাদুজ্জামানের বিরুদ্ধেই শ্লীলতাহানির মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। এ কারণে অধ্যক্ষ এই শিক্ষককে শায়েস্তা করতে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে জিম্মি করেছিলেন।
মামলার তদন্তের সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা স্ট্যাম্প তিনটি উদ্ধার করেছেন। তবে স্ট্যাম্পগুলো অ্যাফিডেভিট হিসেবে পাওয়া গেছে। এতে লেখা ছিল, প্রভাষক আহাদুজ্জামানকে বরখাস্ত করলে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, অ্যাফিডেভিট সম্পাদনের তারিখে আহাদুজ্জামান আদালতপাড়াতেই যাননি।
মোবাইল ফোন বহনকারী হিসেবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, ওই তারিখে আহাদুজ্জামান ছিলেন কলেজে। আর অধ্যক্ষ গিয়েছিলেন আদালতপাড়ায়। যে আইনজীবীর মাধ্যমে অ্যাফিডেভিট করা হয়, তিনি এই কলেজের আইনগত সব কাজই দেখেন। অথচ অ্যাফিডেভিটে সই থাকা আহাদুজ্জামানকে তিনি চিনতে পারেননি।
এই মামলার তদন্তের সময় কলেজের শিক্ষক সেরাজুল ইসলাম, হাসিনা পারভীন, শামিম হোসেন, মো. কামরুজ্জামান, অফিস সহায়ক শাহনাজ খাতুন, পিয়ন কাম মালি আবদুল ওয়াকিল, শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান সনি, মাসরুর বিন শরীফ ও ইসমাইল হোসেন অধ্যক্ষ সেলীম রেজার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
সাক্ষীদের সবাই জানিয়েছেন, প্রভাষক আহাদুজ্জামানের চরিত্র ভালো। অধ্যক্ষের মেয়েকে শ্লীলতাহানি করার মতো ব্যক্তি তিনি নন। বরং অধ্যক্ষের মেয়েকে এক ছাত্রের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। তারপরও শুধু অধ্যক্ষের মেয়ের কথায় আহাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে রেজল্যুশন রেজল্যুশন করা হয়। কলেজের সভাপতি শাহাদুল হকও এ কথা জানিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে, কলেজের শিক্ষকেরা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, শুধু ছাত্রছাত্রীদের বেতন দিয়ে কলেজ চলে না অজুহাত দেখিয়ে অধ্যক্ষ প্রতি মাসে শিক্ষকেরা বেতন পেলে জোর করে ৩ শতাংশ হারে টাকা আদায় করতেন। এভাবে ৩৬ জনের টাকা তিনি আত্মসাৎ করছেন। অধ্যক্ষ ২০২০ সালে পিকনিকের নামে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা করে মাথাপিছু তুলেছিলেন। পিকনিক না করে সে টাকাও আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
আর শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ২০২০ সালে করোনার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা না হলেও ১৮০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফরম পূরণের জন্য আদায় করেছেন অধ্যক্ষ। এ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা দেননি। অভিযোগপত্রে এই অধ্যক্ষের আরও অনেক অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।
সাক্ষীরা বলেছেন, প্রভাষক আহাদুজ্জামানকে অধ্যক্ষ তাঁর কার্যালয়ে আটকে রেখে মারধর করেন এবং তিনটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। এরপর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ তুলতে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এই টাকা না দিলে সই করা ফাঁকা স্ট্যাম্প দিয়ে আহাদুজ্জামানকে বড় বিপদে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এসব কাজে অধ্যক্ষের প্রধান সহযোগী আরেক শিক্ষক ওমর কোরাইশি। তাঁর বাড়ি রাজাবাড়ীহাট এলাকায়। আর অধ্যক্ষের বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর পূর্ব রায়পাড়া মহল্লায়। আদালত দুজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল রোববার কলেজে গেলে অধ্যক্ষ সেলীম রেজাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। গতকাল কলেজেই ছিলেন অপর আসামি ওমর কোরাইশি। তবে এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চাননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আনিসুর রহমান বলেন, ‘অধ্যক্ষ সেলীম রেজাসহ দুই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে জেনেছি। এখন পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করবে।’ তিনি বলেন, অধ্যক্ষ শিক্ষকদের কাছ থেকে জোর করে প্রতি মাসে ৩ শতাংশ চাঁদা আদায় করতেন। মামলার তদন্তের সময় কলেজের শিক্ষকেরা এ তথ্য জানিয়েছেন। মামলার অভিযোগপত্রে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১০/০৭/২০২৩
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
