এইমাত্র পাওয়া

স্কুলের শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দাবি

নিউজ ডেস্ক।।

পরীক্ষার হলে যেকোন ধরনের ডিভাইস (ক্যালকুলেটর) ব্যবহারে স্পষ্ট করে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শ্রেণীকক্ষের ব্যাপারে এ ধরনের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব এলাকার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা মোবাইল নিয়েই ক্লাস করছেন। যা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র ম-লের শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের অডিও রেকর্ড এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের (বিলুপ্ত কমিটি) সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেনের পরীক্ষার হল থেকে ফেসবুকে লাইভ দেয়ার ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে না হোক অন্ততঃ স্কুল পর্যায়ে শ্রেণীকক্ষে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে একটি নীর্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করারও তাগিদ তাদের।

জানা যায়, ২০১৭ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকে শ্রেণীকক্ষে কোন শিক্ষার্থী বা শিক্ষক মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না বলে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। তৎকালীন মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন নিয়ে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করছেন বা শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন, এতে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও পাঠ্যগ্রহণ ব্যহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণীর কার্যক্রমে মনোযোগী হতে পারছে না। এটা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। এ অবস্থায় শ্রেণীকক্ষে কার্যকরী পাঠদান কার্যক্রম শিক্ষার্থী বান্ধব ও গতিশীল করার লক্ষ্যে শ্রেণী কক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ না করার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই আদেশ বাস্তবে কার্যকর ছিল না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তা স্পষ্ট। আর তাই এটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে জানান মাউশির বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ। তিনি বলেন, সত্যি বলতে গেলে শ্রেণীকক্ষে মোবাইল নিয়ে যাওয়া যাবে কি না এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন নীতিমালা নেই। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু তা ওই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই কার্যকর। এতে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ নেই। সম্প্রতি বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটল তাতে করে বিষয়টি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) তপন কুমার সরকার  বলেন, পরীক্ষার হলে মোবাইল তো দূরে থাক সম্প্রতি ক্যালকুলেটর নিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রেও আমাদের বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে কেউ মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে কি না এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। শ্রেণীকক্ষে মোবাইল নিয়ে গেলে এমনিতেই পড়ালেখায় বিঘœ ঘটে। এ বিষয়ে ২০১১ সালে মন্ত্রণালয় থেকেও একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ওই নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন কোন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে ও পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে এখন থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এটি বর্তমানে কার্যকর নেই। যেহেতু করোনাকালে আমাদের পড়ালেখাটা অনেকটা ডিভাইস নির্ভরই ছিল সেক্ষেত্রে খুব দ্রুত এ থেকে সমাধানেরও কোন পথ আছে বলে মনে হয় না।

করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। করেনার সংক্রমণ কমায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয় সশরীরে পাঠদান। এরই ধারাবাহিকতায় মার্চ থেকে শুরু হয় প্রাথমিক এবং কিন্ডারগার্টেনে ক্লাসে স্বশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম।

কিন্তু মহামারীর কারণে মানুষের জনজীবন অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গেজেটের ওপর। এর মধ্যে মোবাইল অন্যতম। বিশেষ করে টানা দুই বছর ঘরে থাকার কারণে শিশুদের মোবাইল আসক্তি চরমে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে করোনার সংক্রমণ সংখ্যা কমে জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও শিশুদের মোবাইল আসক্তি কোনভাবেই কমানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। বাড়িতে তো সারাক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকছেই, বায়না ধরছে স্কুলেও মোবাইল নিয়ে যাওয়ার। অনেক স্কুলে মোবাইল বহনে শিক্ষার্থীদের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকটা গোপনেই শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করছে কোমলমতি শিশুরা। এতে করে সাম্প্রতিক সময়ে যে দুটি ঘটনা ঘটল তা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু না উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মোবাইল আমাদের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অভিভাবকরা শিশুদের মোবাইল কিনে দিচ্ছি। কিন্তু দেয়ার আগে সেটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, কতটুকু ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে কোন আলোচনা করছি না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষার হলে মোবাইল নিতে দেই না। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগে তারা মোবাইল বন্ধ রেখে গেটে বা টেবিলে জমা রেখে দেয়। শ্রেণীকক্ষে মোবাইল নিয়ে আসে কিন্তু তাও বন্ধ করে রাখার কথা বলা হয়। এখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও শ্রেণীকক্ষে মোবাইল নিতে দেখা যায়। যেহেতু এ সংক্রান্ত কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই তাই নিশ্চয়ই এটি অন্যায় নয়। কিন্তু এটি যদি কেউ অসৎ উদ্দেশে ব্যবহার করে তাহলে নিশ্চয়ই অন্যায়। শিক্ষক হৃদয় ম-লের ঘটনায় যেটি আমরা দেখেছি তা হয়তো শিক্ষার্থী ছাড়াও বাইরের স্বার্থান্বেষী কোন মহলের ইন্ধন ছিল। কারণ ইন্ধন ছাড়া এরকম ঘটনা আমাদের শিশুরা করতে পারে না বলেই আমরা বিশ্বাস করি। বিজ্ঞানের শিক্ষক বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এটিকে যদি কেউ স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করে রেকর্ড করে তাহলে তা অন্যায়। এমনিতেই কারও কথা রেকর্ড করতে হলে অনুমতির প্রয়োজন হয়। অনুমতি ছাড়া কথা রেকর্ড করল আবার তা ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলাও হলো এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে কি না এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। না হলে এরকম অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

একই কথা বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীও।  তিনি বলেন, শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহার করলে পড়ালেখায় যেমন বিঘ্ন ঘটে তেমনি মানসিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পরে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা যে জীবন-যাপন করছি তাতে মোবাইলের ব্যবহারটা নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিকে বাদ দেয়া আসলে সম্ভব নয়। তাই এটির ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা না দিলেও নির্দিষ্ট একটি নীতিমালা অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল নিয়ে যাবে কি না, গেলে কিভাবে ব্যবহারের অনুমতি পাবে এসব বিষয়গুলো নিয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। না হলে শিক্ষক হৃদয় ম-লের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে ভবিষ্যতে এরকম আরও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে। স্কুল-কলেজের শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এসব শিশুদের হাতে গ্যাজেট বা মোবাইল তুলে দেয়ার কারণে এসব অঘটন ঘটার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত হানি ঘটারও আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে  বলেন, শিশু সন্তানকে স্মার্টফোন দেয়ার অর্থ হলো, তাদের হাতে এক বোতল মদ কিংবা এক গ্রাম কোকেন তুলে দেয়া। কারণ, স্মার্টফোনের আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই বিপজ্জনক। দুই মিনিট স্থায়ী একটি মোবাইল কল শিশুদের মস্তিষ্কের হাইপার এ্যাক্টিভিটি সৃষ্টি করে, যা কিনা পরবর্তী এক ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের মস্তিষ্কে বিরাজ করে। এতে করে হার্ট এ্যাটাকের আশঙ্কা বেড়ে যায় দ্বিগুণ, ব্যবহারকারীর স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, রক্তের চাপ বেড়ে যায়, দেহ ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে এমনকি নিয়মিত ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটায়। স্ক্রিনের রেডিয়েশন প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর, শিশুদের জন্য তা আরও বেশি মারাত্মক ক্ষতিকর, যা কিনা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করে। যদি শ্রেণীকক্ষে মোবাইলের ব্যবহার নীতিমালা করে বন্ধ করে দেয়া যায় তাহলে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তত: শিশুরা এই আসক্তি থেকে দূরে থাকবে। এতে করে সামাজিক অবক্ষয়জনিত কোন ঘটনা যেমন ঘটার সম্ভাবনা নেই তেমনি শিশুদেরও স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে বলে আমি মনে করি।

এ বিষয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ সাঈদা আনোয়ার বলেন, মোবাইলের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে। ফলে তৈরি হয় শিশুদের নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। তা ছাড়া প্রযুক্তির এ আসক্তির ফলে শিশুদের আবার দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে শিশুর স্থূলতাও বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখার ফলে শিশুর চোখের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। শিশুদের পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। তাই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীর এ থেকে দূরে রাখাই মঙ্গল।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.