অনলাইন ডেস্ক।।
আবারও শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির কার্যক্রম। এবার দীর্ঘ সময় নয়, মাত্র তিন বছর পর শুরু হচ্ছে এ কার্যক্রম। এজন্য চলতি অর্থ বছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের জন্য মোট ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে বিগত বছরের চেয়ে এবারের বাজেটে এমপিও খাতের বরাদ্দ একবারেই অপ্রতুল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালের মতো এবারও অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আবেদন নেয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এরই মধ্যে নতুন সফটওয়্যার তৈরি করে পরীক্ষামূলক তথ্য আপলোড করছে, কোনো ভুলত্রুটি থাকলে সেটিও সংশোধন করা হচ্ছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিভাগের সফটওয়্যার প্রস্তুত হলেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আবেদন নেয়া শুরু হবে। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই দেশের নন এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের আবেদন নেয়ার কাজ শুরু করতে চায় মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন রোববার নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আমরা ২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। আর কারিগরি বিভাগ পেয়েছে ৫০ কোটি টাকা। যদিও আমরা আরও বেশি বরাদ্দ প্রত্যাশা করেছিলাম। নতুন বরাদ্দকৃত এই বাজেট দিয়েই দ্রুত এমপিওভুক্তির কার্যক্রম শুরু করতে চাই। কবে নাগাদ আবেদন কার্যক্রম শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা এমপিওভুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন করেছি। সংশোধিত নীতিমালায় বেশ কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো আমরা আমাদের সফটওয়্যারে যুক্ত করেছি এবং সেটার ট্রায়াল কার্যক্রম চলছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে কিছুদিনের মধ্যেই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন চাওয়া হবে। যেহেতু আমরা বরাদ্দ পেয়ে গেছি, সেহেতু এবার এমপিওভুক্তির ঘোষণা কোনোভাবেই অর্থ বছরের শেষে গিয়ে ঠেকবে না। তার আগেই এ কাজ শেষ করতে চাই বলে যোগ করেন সচিব। এর আগে গত শনিবার শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, নানা অসঙ্গতি থাকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এমপিওভুক্তি নীতিমালা যুগোপযোগী করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালার আলোকে চলতি বছর নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন চাওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করতে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে। এজন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ করা হয়েছে। নতুন তথ্য আপলোড করে সেটির এখন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। এ প্রস্তাবের অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই সারাদেশ থেকে আবেদন কার্যক্রম শুরু করার ব্যাপারে চিন্তা রয়েছে। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ হলেই প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে আবেদন নেয়া হবে। তারা আরও বলেন, গতবার এমপিওখাতে বরাদ্দ থাকলেও যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অভাবে টাকা ফেরত গেছে। এবার এমপিও নীতিমালায় শর্ত শিথিল করায় অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে। নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। কেউ তথ্য গোপন করে এমপিওভুক্তি নিলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ২শ’ কোটি ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে আপাতত এই বারাদ্দ নিয়েই আবেদনের কাজ শুরু করতে চায় মন্ত্রণালয়। জানা যায়, প্রায় ১০ বছর ২০১৮ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে অনলাইনে আবেদন নেয়া হয়। তখন এমপিওভুক্তির জন্য নয় হাজার ৪৯৫টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে আবেদন করে। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর ২ হাজার ৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রের হার্ডকপি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে দুই হাজার ৬১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। নিয়োগে ত্রুটি থাকায় এরমধ্যে বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার একজন শিক্ষক-কর্মচারীও এখন পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হতে পারেননি।
সূত্র বলছে, ২০১৯ সালের শেষ দিকে বিশেষ ক্ষমতাবলে আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছিল সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত এমপিওভুক্তির তালিকা থেকে এমপিও নীতিমালার শর্তপূরণ না করা, যুদ্ধাপরাধীসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর মামলার আসামিদের নাম থাকাসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান বাদ দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ওইবার নীতিমালার কঠোর শর্তের কারণে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এমপিও খাতে বরাদ্দকৃত চার শত কোটি টাকার বেশি ফেরত যায়। তখন নন-এমপিও শিক্ষকরা শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে নীতিমালা সংশোধনের দাবি জানান। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে গত মার্চে পরিপত্র জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত ছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ সংশোধিত নীতিমালা জারি করে তোপের মুখে তা প্রত্যাহার করে নেয়। এখন পর্যন্ত সংশোধিত নীতিমালা জারি করতে পারেনি।
সূত্র জানায়, গত তিন বছরে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সংশোধিত নীতিমালায় একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য মার্কিং তুলে দেয়া হয়েছে। ফলে একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। সব মিলিয়ে বর্তমানে সারা দেশে সাত হাজারের বেশি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পোনে দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
সংশোধিত এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে পাসের হার ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা শিথিল করা হয়েছে। ১০০ নম্বরের গ্রেডিং এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে একাডেমিক স্বীকৃতিতে ২৫ নম্বর তুলে দেয়া হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ২৫ নম্বরের স্থলে ৪০ করা হয়েছে। অন্য ক্যাটাগরির ২৫ নম্বরের স্থলে ৩০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের নামে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে না। ফৌজদারী অপরাধে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামের প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত করা হবে না। নেতিবাচক নামের কারনে সমাজে প্রভাব পড়তে পারে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আওতায় আসবে না।
সূত্র জানায়, এমপিওভুক্তির জন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকার নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৫ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও পাসের হার ৭০ শতাংশ, জেলা শহরে ৩৫ জন পরীক্ষার্থী ও পাসের হার ৬৫ শতাংশ, মফস্বলে ২৫ জন পরীক্ষার্থী ও পাসের হার ৬০ শতাংশ। সিটি কর্পোরেশন ও জেলা শহরের মাধ্যমিক স্কুলে পরীক্ষার্থী ও পাসের হার একই। তবে মফস্বল এলাকায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ঠিক থাকলেও পাসের হার কমিয়ে ৫৫ শতাংশ করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষার্থী ৬০ জন পাসের হার ৬৫ শতাংশ, জেলা শহরে পরীক্ষার্থী ৬০ ও পাসের হার ৫৫ শতাংশ ও মফস্বলে ৪৫ জন পরীক্ষার্থী ও পাসের হার ৫০ শতাংশ। সিটিতে স্নাতক (পাস) স্তরে পরীক্ষার্থী ৬০ ও পাসের হার ৬০ শতাংশ, জেলা শহরে পরীক্ষার্থী ৬০জন ও পাসের হার ৫০ শতাংশ ও মফস্বল এলাকায় ৫০ জন পরীক্ষার্থী ও পাসের হার ৪৫ শতাংশ। তবে সিটি ও জেলা শহরের মহিলা কলেজের ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ জন নির্ধারণ করা হয়েছে। নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, স্কুল-কলেজের এমপিও নীতিমালা আগের চেয়ে অনেক কঠিন করা হয়েছে। শর্তপূরণ করে এমপিওভুক্তিতে ২০০ কোটি টাকা দরকার হবে না। বহু বছর ধরে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। মুজিব বর্ষে আমাদের দাবি, বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করে শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ করে দিন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
