শিক্ষায় করোনার প্রভাব
তারেক ও তুহিন চাচাতো জেঠাতো ভাই। দু’জনই এবার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণি থেকে অটোপ্রমোশন পেয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুবাদে তুহিন গ্রামের বাজারে তার বাবার দোকানে টুকটাক সময় দিচ্ছে। স্কুল বন্ধ থাকায় তুহিনের বাবাও তার থেকে ব্যবসায় সহযোগিতা পেয়ে সাদরে গ্রহণ করছেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি শুরু হলে তারেক ভর্তি হলেও তুহিন ভর্তি হতে অনীহা প্রকাশ করে। যদিও তার বাবা অনেকটা জোর করেই তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করেছেন। পড়াশোনা থেকে এখন ব্যবসায় বেশি মনযোগ তুহিনের। কিন্তু এই পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ব্যবসার কীই-বা বুঝবে সে? প্রশ্ন তুহিনের বাবার।
এদিকে এক অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রীকে তার বাবা স্কুল বাদ দিয়ে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন। বাবার অভিযোগ, স্কুল বন্ধ থাকায় তাঁর মেয়ের পড়াশোনায় অনীহা দেখা দিচ্ছে। কওমি মাদ্রাসা খোলা থাকার সুবাদে সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে হয়তো তাঁর মেয়ের পড়াশোনার প্রতি অনীহা দূর হতে পারে এবং সময়ও নষ্ট হবে না। এ সিদ্ধান্তকে খারাপ বলছি না। কিন্তু বিপত্তির জায়গা হলো অন্যখানে। ওই শিক্ষার্থীতো সরাসরি অষ্টম শ্রেণির সমমান ক্লাসে ভর্তি হলে সিলেবাসের ভিন্নতার কারণে ভালোভাবে চালাতে পারবে না। আবার নিচের ক্লাসে ভর্তি হলে তার জীবন থেকে কিছু সময় হারিয়ে যাবে। এ সময়টা তাকে কে দেবে?
শিউলি বেগম গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে সে একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। দরিদ্র বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে এখন নতুন করে ভাবছেন ভালো একটা পাত্র পেলে মেয়েকে পাত্রস্থ করতে।
এ ঘটনাগুলো নিছক তিনটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি সারা দেশের বাস্তব চিত্র। করোনা সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুবাদে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি অংশ এখন পরিবারের বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার ভিন্ন চিন্তাও করছে। তাদের বিরাট একটি অংশ পড়াশোনায় আর ফিরতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম
কোভিড-১৯ এর আক্রমণে সারা পৃথিবী এখন জর্জরিত। বৈশ্বিক এ সংকট আঘাত হেনেছে প্রায় সব জায়গায়। আমাদের দেশে খাদ্য এবং চিকিৎসা সংকট কোনোভাবে কাটিয়ে উঠা গেলেও শিক্ষায় কাটিয়ে উঠা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গতবছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সরকার এ সংকট উত্তরণের জন্য অনলাইন ক্লাস গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার কর্তৃক গৃহীত অনলাইন ক্লাস গ্রহণের উদ্যোগ দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই ইতিবাচক দিক। এ কার্যক্রম বেগবান করার জন্য খুবই আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় সফলতা লাভ অনেকটা সময় সাপেক্ষ।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন কার্যক্রমের আওতায় এসেছে। ধীরে ধীরে আরও বাড়বে আশা রাখছি। কিন্তু আমাদের মফস্বল এলাকায় এ সংখ্যা নিতান্তই কম। অনলাইন ক্লাসে মফস্বল এলাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৫ শতাংশের খুব একটা বেশি হবে বলে মনে হয়না। গত ৬ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত “অনলাইন ক্লাসে আগ্রহ কমেছে শিক্ষার্থীদের” শীর্ষক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থীরা বলছেন অনলাইন ক্লাস ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তাছাড়া উপস্থিতির হার প্রথম দিকে একটু ভালো থাকলেও কিছুদিন পরেই তা কমে যাচ্ছে।
এক্ষেত্রে বেশকিছু কারণ জড়িত বলে মনে করি। প্রথমত, আমাদের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইস নেই। মুঠোফোন অপারেটরদের সংগঠন জিএসএমএ এর তথ্যমতে ২০২০ সাল নাগাদ দেশে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন প্রতি চারজন ফোন ব্যবহাররীর মধ্যে একজন অর্থাৎ ২৫ শতাংশ। বাকী ৭৫ শতাংশ স্মার্টফোন না থাকার কারণে এমনিতেই বাদ পরে যাচ্ছে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী প্রতি ইউজিসি কর্তৃক ডিভাইস ক্রয় বাবদ ৮ হাজার টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়ার যে নীতিমালা হয়েছে তা এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে আশা করছি। তবে তা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, স্কুল-কলেজকেও সরকারিভাবে এ নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনেকের ডিভাইস থাকলেও প্রয়োজনীয় ডাটা থাকেনা। প্রতিদিন দুই-তিন ঘন্টা অনলাইন ক্লাসে থাকতে বাড়তি টাকার দরকার হয় যা অনেক অভিভাবক দিতে চান না। তৃতীয়ত, দেশের অনেক জায়গায় নেটওয়ার্ক ভালো নেই। বিশেষ করে গ্রামের বেশিরভাগ জায়গায় নেটওয়ার্ক খুবই দূর্বল। দীর্ঘক্ষণ লোডশেডিং থাকাও গ্রামে একটি বিরাট সমস্যা। তাই বলে আমাদের হাল ছাড়লে চলবে না। অনলাইন পাঠদান কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালু রাখা অত্যাবশ্যক বলে মনে করি।
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণের সূচনীয় অবস্থা
এদিকে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে বেতন ও ফি আদায় করা যাচ্ছে না বিধায় শিক্ষা পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন ও নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীগণের দূর্ভোগ খুবই চরমে। জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেকেই শিক্ষকতার এ মহান পেশাকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। এ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত আরেকটি পেশার কিছু মানুষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁরা হলেন, বিভিন্ন বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। এমন দুয়েকটি কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বেশিরভাগ কোম্পানির মালিক তাঁদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার কিছু কোম্পানি বেতন-ভাতার ৭০ শতাংশ, কেউ ৫০ শতাংশ আবার কেউ-বা ৪০ শতাংশ চলমান রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। বলতে গেলে এ পেশায়ও অনেকটা করুণ অবস্থা বিরাজমান।
সংকট উত্তরণের উপায়
শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট চলছে তা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। অবশ্য এটা সরকারের জন্য অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। কিন্তু এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থার এ করুণ দশা থেকে উত্তরণে আর বোধহয় পেছনে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিভাবে আগানো যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমার মতে, যেসব জেলায় করোনার প্রকোপ কম সেসব জেলার গ্রামীণ পর্যায়ের কিছু কিছু জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। গ্রামে সাধারণত করোনার প্রকোপ তেমন একটা নেই বললেই চলে। আবার পরীক্ষামূলকভাবে কম আক্রান্ত এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় খুলেও দেখা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ক্লাসে যেতে সক্ষম হবে আশা রাখি। আবার সরকারের পূর্বনির্ধারিত এসএসসি ও এইচএসসি’র ক্লাস স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেও দেখা যেতে পারে। এগুলোতে ফলপ্রসূ হলে পর্যায়ক্রমে সব প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সহজ হবে। সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হোক প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন সে প্রত্যাশা রাখছি।
লেখক- মো. শরীফ উদ্দিন
সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
