সায়র আলমগীর আহমেদ (শান্তনু)।।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিটি সরকারই রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করে। বিশাল এ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন দেশের সব সরকারই কল্যাণমূলক হয়ে উঠতে পারে না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বিবেচনায় একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন সত্যি দুরূহ।
বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামোয় যুক্ত হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিন্তা করেছিলেন শিক্ষার উন্নতি ছড়া জাতির মেধা, মনন আর উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাটাকে প্রান্তিকশ্রেণির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তাঁর সাহসী সিদ্ধান্তে ১৯৭৩ সালে ৩৬,১৬৫ প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ হয়, একইসাথে সে সময় ১,৫৭,৭২৪ শিক্ষক রাজস্বখাতে আত্তিকৃত হয়। ১৯৭৩ থেকে ২০১৬, বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আর ধলেশ^রীতে বহু জল গড়িয়েছে, কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।
অবশেষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে আসে আরেক কালজয়ী সিদ্ধান্ত। তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটি বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে যেসব উপজেলায় সরকারি স্কুল-কলেজ নেই- সেসব উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেন। তার অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা দেয়া হয় দেশের ৬৪টি জেলার ৬৪ উপজেলায় একটি করে কলেজ (তালিকাসহ) সরকারিকরণের। তারই ধারাবাহিকতায় এপর্যন্ত তিনশতাধিক কলেজ সরকারিকরণের আওতায় আসে।
সরকারিকরণের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ হস্তান্তর ও অর্থব্যয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারপর ২০১৮ সালে ০৮ আগস্ট কলেজগুলো সরকারিকরণের জিও বা প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
২০১৬ থেকে ২০১৯ এই তিন বছরে কলেজ সরকারিকরণের তালিকা ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হলেও কোন একটি কলেজের একজন শিক্ষকও আজ পর্যন্ত আত্তিকরণ (ধনংড়ৎঢ়ঃরড়হ) এর আওতায় আসেনি। সময়ের এই দীর্ঘসূত্রিতা সরকারের একটি ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে এবং সরকার সরকারিকরণের মাধ্যমে সারাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্যের যে নীতি সরকার গ্রহণ করেছে সেটা কোথায় যেন হোঁচট খাচ্ছে। কেননা সরকারিকরণ যে প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছে তা এতটা ধীরলয়ের।
গত তিন বছরে শিক্ষক আত্তিকরণ প্রক্রিয়ায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে কালক্ষেপণ হয়েছে। আত্তিকরণ প্রক্রিয়াটি এত ধীর যে, নানা অভিযোগ দানা বাঁধছে শিক্ষকদের মনে। ইতোমধ্যে প্রতিটি কলেজে ডিজি অফিস থেকে একটি করে তদন্ত দল গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের সকল কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, তারপর আবার নতুন করে আবার একই কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠান (ডিজি) থেকে একইভাবে বারবার কাগজ-পত্র যাচাইয়ের যে কালক্ষেপণ হচ্ছে এটা হয়তো একবারে একটু বেশি সময় ধরে পরীক্ষা করা যেতো।
কাগজ-পত্র পরীক্ষার প্রয়োজন অবশ্যই আছে- তবে তা যেন অহেতুক কালক্ষেপণের কারণ না হয়। যতদূর জানা গেছে এ-পর্যন্ত মাত্র দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের কাগজ-পত্র যাচাই করা হয়েছে।
আত্তিকরণ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাজের ধীরগতি সরকারিকৃত কলেজগুলোতে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। সমালোচনা হচ্ছে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে সিনিয়র শিক্ষকদের একটি বড় অংশ অবসরে চলে যাওয়ার পর মূল আত্তিকরণের কাজ শুরু হবে, যাতে কলেজগুলোতে পুরনো এবং সিনিয়র শিক্ষকের সংখ্যা কমে যায় এবং ক্যাডার শিক্ষকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। এভাবে কলেজগুলোতে একধরণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া খোঁজা হচ্ছে বলেও কানাঘুষা রয়েছে শিক্ষকমহলে।
এদিকে কলেজগুলোতে চাকরিরত শিক্ষকরা কলেজ থেকে যে ভাতাদি পেতেন জিও হওয়ার পর তা অনেক কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে শিক্ষকরা এক অমানবিক জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে নন এমপিও এবং অনার্স-মাস্টার্সের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও শোচনীয়। কেননা বেসরকারি আমলে কলেজ থেকে তাঁরা যে টাকাটা পেতেন কলেজের জিও হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে চরম অর্থকষ্ট।
দূরের কলেজগুলোতে যেসব শিক্ষক (অধিকাংশই) কাজ করছেন, তাঁরা মাস শেষে বাড়িভাড়া, হাতখরচ, খাবারখরচ যোগাতে পারছেন না। এ-বয়সে (চাকরিরত অবস্থায়) বাড়িতে মা-বাবা কিংবা বড় ভাইবোনের কাছে হাত পেতে টাকা নিচ্ছেন তাঁরা। কর্মরত অবস্থায় মাইনে না হলে এবং অন্যের কাছে হাতবাড়ানো যে কতটা লজ্জার তা কে, কাকে বোঝাবে? একজন মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তার বাঁচার পথটুকু যে, কঠিন হয়ে যায় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝে না।
অর্থকষ্টের পাশাপাশি এসব এমপিওবিহীন শিক্ষকদের আছে আরো নানা অনিশ্চয়তা। তাঁদের হতাশা বেড়ে যায় যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায় তাঁদের আত্তিকরণ এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের সাথে একইসময়ে না হয়ে পরে আলাদা করে হবে। শঙ্কার এখানেই শেষ নেই, ভয় আছে আত্তিকরণে কেউ কি বাদ পড়বেন? হতাশার এমন নানা প্রশ্ন, দ্বিধা আর সংশয় তাঁদের পিছু ছাড়ছে না। অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একচিলতে আলোর সন্ধানে এসব শিক্ষক প্রতিদিন স্বপ্নের বীজ বোনেন আর ভাগ্যের উপর নির্ভর করেন। অসময়ের সময়ে দাঁড়িয়ে এসব শিক্ষক চাকরিটা ছেড়েও দিতে পারছেন না কারণ চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর যদি সহসাই নিয়োগটা হয়ে যায় তবে আফসোস হবে সারাজীবন।
এ তো গেল এমপিও বিহীন শিক্ষকদের কথা, অন্যদিকে ভিন্ন এক জীবন-যন্ত্রণার মুখোমুখি হচ্ছেন এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরাও। কেননা, বেসরকারি আমলে শিক্ষকরা কলেজ থেকে যে ভাতাদি পেতেন সরকারিকরণের জিও হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ আয়ের একটা অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন তাঁরা, ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ, সংসার খরচ- আর যেন পেরে ওঠা যায় না। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এতদিন জানতেন যখন আত্তিকৃত হবেন তখন এমবার্গো বা জিও থেকে বকেয়া পড়ে যাওয়া টাকাগুলো তাঁরা একসাথে ফেরত পাবেন (প্রজ্ঞাপনে তা-ই বলা আছে) কিন্তু সময়ের বাতাসে নানা কথা ভেসে বেড়ায়Ñ যেদিন থেকে শিক্ষক আত্তিকৃত হবেন সেদিন থেকেই শুধু বেতন-ভাতাদি পাবেন।
ফলে জিও হওয়ার পর গত দুই তিন বছর ধরে কলেজ প্রাপ্য টাকাটা (যেটা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে) সে বকেয়া টাকাটা কীভাবে পাবেনÑ সে আরেক অনিশ্চয়তা। শিক্ষকরা তো এমনিতেই অর্থকষ্টে আছেন, তার উপর যদি পাওনা টাকার অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তাহলে দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় বৈকি?
সমস্যা আরো আছে, জিও’র পর গত তিন বছরে বেতন বন্ধ অবস্থায় অনেক শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে এসব বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা একটু অর্থনৈতিক সুবিধার যে স্বপ্ন দেখছিলেন তা সময়ের তলানিতে আটকা পড়ে হারিয়ে গেছে। বেতন বন্ধের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়েছে। জিও হওয়ার পর গত এক বছরে প্রায় সব সরকারিকৃত কলেজেই টাকা বাকি রেখে শিক্ষক অবসরে গেছেন। কলেজ সরকারি হওয়ার পর কলেজ থেকে প্রাপ্ত টাকা বন্ধ অবস্থায় যেসব শিক্ষক অবসরে গেছেন তাদের বাকি পড়ে যাওয়া টাকা কীভাবে পাবেন তার কোন তথ্য নেই, কারো কাছে। সরকার হয়তো বিষয়টি ভেবে একটা বিহিত করবেন।
তবে এটা সত্য, দিন যত যাচ্ছে শিক্ষকদের দীর্ঘশ^াসের পাল্লা তত ভারি হচ্ছে। এ যন্ত্রণা কমানোর দায়িত্ব নিশ্চয়ই কারো ওপর বর্তায়। সরকারিকরণ প্রক্রিয়াটি আরেকটু দ্রুত করা গেলে হতাশার এমন চিত্রটিগুলো যেমন কমিয়ে আনা যেতো তেমনি শিক্ষায়ও এর ভালো প্রভাব পড়তো। এক্ষেত্রে সরকার বিশেষ বিবেচনায়, প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে সব শিক্ষকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগের একটা ব্যবস্থা করতে পারে। অস্থায়ী নিয়োগের পর সবকিছুই (যেভাবে প্রয়োজন) যাচাই বাছাই করা যেতে পারে। যদি কারো সমস্যা থাকে স্থায়ী নিয়োগের আগেই তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া যাবে।
লেখক- শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, মুড়াপাড়া সরকারি কলেজ রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
