সাইদুর রহমান।।
বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির আজ ১০৬ তম দিন এবং দেশের সকল ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ৯৮ তম দিন। এক একটা দিন যেন শেষ হয় না। মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচার জন্য মরিয়া কিন্তু করোনা পিছু ছাড়ে না। দেশের বেসরকারি শিক্ষা খাতে বড় ধরনের অবদান রাখে এদেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহ। নিজেদের টাকায় প্রতিষ্ঠান করে, ভবন ভাড়া নিয়ে, দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ প্রদান করে, বিজ্ঞাপন ও প্রচারনা চালিয়ে সংগ্রহ করতে হয় ছাত্র-ছাত্রী।
যেখানে সরকার কোনো রকম সহযোগিতা করে না। সরকার থেকে যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা পাই তা হলো বিনামূল্যে বই পাওয়া। কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিক কিংবা উদ্দোক্তারা দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে। দেশের বেকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে তারা শিক্ষকতার সুযোগ প্রদান করার মাধ্যমে বেকারত্ব ঘুচিয়ে থাকে। যা সরকারের বোঝা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। সারা দেশে অবস্থিত ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রায় ৬ লক্ষ শিক্ষক শিক্ষিকা বা কর্মচারী রয়েছে । যাদের পরিবার অনেকাংশে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়ের উপর নির্ভরশীল। প্রতিটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল যেন কয়েকটি পরিবারের আয়ের উৎস ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রস্থল।
বাংলাদেশে অবস্থিত প্রায় ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অধিকাংশ শহরঞ্চলে অবস্থিত। যাদের ভবন ভাড়ার জন্য গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। যার পুরোটাই আসে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে। জেলা, উপজেলা পর্যায়ের কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহের পরিচালনা ব্যয় কম নয়। এরপর দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য প্রদান করতে হয় তাদের সংসার চালানোর মত অর্থ। তার উপর রয়েছে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ ও পানি খরচ।
সব মিলিয়ে আয় ও ব্যয়ের পাথর্ক্য করলে দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের মালিকের খুবই সীমিত আয় থাকে। মাঝে মাঝে থাকেনা বললেও চলে। তাদের শিক্ষকদের আয়ের অন্যতম একটি উৎস হলো প্রাইভেট টিউশন। যেটি বর্তমানের করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ রয়েছে। এইভাবে চলতে থাকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
কিন্তু তারা সরকারের কাছ থেকে পাই না নূন্যতম আর্থিক সহযোগিতাও। বরং তারা কিন্ডারগার্টেন স্কুল নিবন্ধনের জন্য ২০০০ টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে প্রদান করে থাকে তারপর আবার দীর্ঘসুত্রতার ফলে টেবিল থেকে যায় বেসরকারি স্কুল নিবন্ধনের ফাইল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল বা বেসরকারি স্কুল নিবন্ধনের জন্য শহর পর্য়ায়ে ব্যাংকে জমা রাখতে হয় ৫০,০০০ টাকা যা গ্রাম পর্যায়ে ১৫,০০০ টাকা।
নিবন্ধনের কাগজ পত্র জমা দেওয়ার জন্য সেখানে ১০০ টাকার ৩টি স্ট্যাম্পে স্কুলের মালিক কিংবা উদ্দোক্তা যে অজ্ঞিকারপত্র জমা প্রদান করে সেখানে লিখতে হয় “আমি স্কুলটি পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য কামনা করব না।” এই মর্মে স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। এদিক থেকে দেখলে দেখা যায় যে, কিন্ডারগার্টেন স্কুল সমূহ সরকারের রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন দিক থেকে অর্থ প্রদান করে থাকে, যেখানে তারা সরকারের কাছে থেকে শুধুমাত্র বিনামূল্যের বই ছাড়া আর কিছুই পাই না
মার্চ এর ১৭ তারিখ থেকে আজ অবধি বন্ধ রয়েছে দেশের ৪০,০০০ কিন্ডারগার্টেন স্কুল। বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি গ্রহণের। নেই অন্য কোনো আয়ের উৎস। দেখতে দেখেতে চলে গেল স্কুল বন্ধের ৩টি মাস। সরকার কয়েকদফা ছুটি বাড়িয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি ৬ আগস্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি করছে যেটা আরো বাড়তে পারে বলে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে জানা যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, “করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলো খোলা হবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ”।
এদিক থেকে খেয়াল করলে বোঝা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ কবে খুলবে তার কোনো নির্দিষ্ট টাইমলাইন আমাদের জানা নেই। তার পরেও ধরে নিচ্ছি সেপ্টেম্বরে খুলতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ! যদি তাই হয়, তাহলে আরো অপেক্ষা করতে হবে ৩ মাস। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকবে প্রায় ৬ মাস বা ততোধিক যদি না করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক কিংবা নিয়ন্ত্রন না হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে করোনা পরিস্থিতি একেবারে নিমূল হবে না। বাংলাদেশে আসা চীনা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিনিধিরা জানিয়েছে, “ বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত করোনা মহামারীর সর্বোচ্চ বা পিক পর্যায়ে পৌছায় নি”।
কিন্তু থেমে নেই ভাড়ায় চালিত কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহের ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন প্রদান। যার কারণে নিঃস হয়ে যাচ্ছে কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিক বা উদ্দোক্তারা। গত তিন মাসের ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন দিতে গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের অর্থ। সরকার বিভিন্ন খাতে ১০০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিলেও সেখানে স্থান হয়নি কিন্ডারগার্টেন স্কুল সমূহের। এর ফলে সরকারের কাছে থেকে তারা পাইনি নূণ্যতম আর্থিক সহযোগিতা।
বিভিন্ন জেলা ভিত্তিক শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে নামে মাত্র ত্রান চাল-ডাল-তেল। যা শিক্ষকদের দেওয়ার মাধ্যমে গোটা শিক্ষক জাতীকে অসম্মান করা হয়েছে। দেশের কিছু কিছু স্থানে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের প্রদান করা হয়েছে ১০০০-১৫০০ করে টাকা যা বর্তমান সময়ে খুবই কম। চাল-ডাল-তেল ও ১০০০-১৫০০ টাকা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা-গুরুর মর্যাদাহানী করা হয়েছে। খুন্ন হয়েছে সরকারের ভাবমূর্তি।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম দিয়ে আমরা প্রতিদিন দেখি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিকরা তাদের স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে তাদের স্থায়ী ঠিকানায় চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিকদের মাঝে স্কুল বন্ধের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন খবরের পাতায় পাতায় দেখা যাচ্ছে, উমুক স্কুল বন্ধ। কারণ, স্কুল ভবন ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে স্কুল ছাড়ছে তারা।
আয় নেই কিভাবে তারা পরিশোধ করবে ভাড়া ও বেতন। এই সম্পর্কে কথা হয় বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মহাসচিব মোঃ মিজানুর রহমান সরকারের কাছে তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমরা বারবার বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে, পত্র-পত্রিকায় লেখনির মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই সাথে সারা বাংলাদেশ থেকে প্রণোদনা চেয়ে পোস্ট দিয়ে, সর্বশেষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও দেশের সমস্ত জেলা প্রশাসক বরাবর আমার সংগঠন কিন্ডারগার্টেন স্কুল সমূহের জন্য প্রণোদনা চেয়ে স্বারকলিপি প্রদান করে থাকি।
আমরা আশানুরূপ বা মোটেও ফল পাইনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশ্বাস পেয়েছি কিন্তু কোনো রকম আর্থিক সহযোগিতা কিংবা প্রণোদনা পাইনি। সংগঠনের মহাসচিব আরো জানান, ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশ থেকে আমাদের কাছে প্রতিদিন এই ধরণের সংবাদ আসে যে, আমরা স্কুল পরিচালনা খরচ না মেটাতে পেরে স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছি। রাজধানীতে স্কুল বন্ধ করার সংখ্যাটা অনেক বেশি। এই সংখ্যা এখন রাজধানীতেই প্রায় ১০০।
এইভাবে চলতে থাকলে ধংস হয়ে যাবে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা। হারিয়ে যাবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহ। সরকারের কাছে আমার ও আমার সংগঠন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের আকুল আবেদন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলসমূহের জন্য জরুরী ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া হোক তা না হলে এভাবে প্রতিদিন শুনতে হবে স্কুল বন্ধের খবর।
আমার সাথে কথা হয় ঢাকায় অবস্থিত একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিকের সাথে। তার স্কুলটি অবস্থিত রাজধানী ঢাকার রামপুরায় হলি ফ্রেন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার সাথে। তিনি জানান, আমার স্কুলটি দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সহিৎ অত্র এলাকায় চালিয়ে আসছিলাম। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় আমি স্কুলটি বন্ধ কওে দিতে বাধ্য হচ্ছি। এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।
করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া আরো কয়েকটি কিন্ডারগাটেন স্কুলের নাম আমাদে হাতে এসেছে। ঢাকা ক্যাডেট স্কুল, মালিবাগ-ঢাকা। হলি ফ্রেন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, রামপুরা-ঢাকা। লিটল ফ্রেন্ডস কিন্ডারগার্টেন, যাত্রাবাড়ী-ঢাকা। ইকরা স্কুল, রামপুরা-ঢাকা। ঢাকা কিন্ডারগার্টেন, ধোলাইপাড়, ঢাকা। ব্রিটেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কেরানীগঞ্জ।
কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিকদের প্রাণের দাবি- প্রণোদনা দিন তা না হলে শেষ হয়ে যাবে কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্টানদের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিকদের স্বপ্ন গড়া এমন হাজারো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়ে যাবে কয়েক লক্ষ পরিবারের আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল। ভেঙে যাবে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহ অভিভাবকদের আকাঙ্খিত শিক্ষা প্রদানে ব্যথ, সেখানে সেই সমস্ত অভিভাবকদের আকাঙ্খার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয় কিন্ডারগার্টেন।
কারণ সেখান থেকে পাওয়া যায় ভালো পড়া-লেখা, সতিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার নৈতিক শিক্ষা।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
