করোনাকালীন লেখাপড়া

ড. এম. জি. নিয়োগী  ।।

সারা বিশ্বে করোনার যে সর্বগ্রাসী তাণ্ডব আমরা লক্ষ্য করছি, তাতে করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে আমরা সত্যিই চিন্তিত। বিশেষ করে তাদের লেখাপড়া, তাদের ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। জনাব জাফর ইকবাল করোনাকালে লেখাপড়া নিয়ে আলোকপাত করেছেন, যা ১৫ মে বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি খুব সুন্দরভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা করোনাকালে কিভাবে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারে, তার কিছুটা রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন। তবে বিষয়টি যতটা তিনি সহজভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন, আসলেই কি ততটা সহজ!

ব্যক্তিগতভাবে আমি জাফর ইকবাল সাহেবের একজন ভক্ত। তাঁর লেখা, কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। শুধু আমি নই—আমার পুরো পরিবারের আদর্শ ব্যক্তিত্ব জাফর ইকবাল। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন—‘কোনো কিছু বলা বা শেখা লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য নয়। লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন ছেলে বা মেয়ের ভেতরে জানা বা শেখার ক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া।’ বিষয়টি কি সত্যিই তাই!
আমরা যুগ যুগ ধরে জেনে আসছি—লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে জানা বা শেখা। শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীকে জানা বা শেখার ক্ষমতা তৈরিতে সাহায্য করেন। অর্থাত্ শিক্ষকের পাঠদানের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীকে বিষয়টি জানতে বা শিখতে সহায়তা করা।

এক জায়গায় তিনি যথার্থই বলেছেন—সব শিশুই কমবেশি জানা বা শেখার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কথাটি শতভাগ সত্য। সব শিশুই সমান মেধা নিয়ে জন্মায় না। জনাব জাফর ইকবালকে আমরা সবাই জানি, তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাঁর মতো মেধা নিয়ে বাংলাদেশে শতকরা একজনও জন্মায় না। তাঁর পক্ষে ঘরে বসে পুরো গণিত বইটি শেষ করতে হয়তো কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু বাকি ৯৯ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীর কী হবে! তাদের ঘরে বসে পুরো গণিত বইটি শেষ করতে প্রতিক্ষণ শিক্ষকের সহায়তা প্রয়োজন হবে।
কোচিং আজকে বাংলাদেশে একটি বিতর্কিত বিষয়। সুধীসমাজ থেকে আরম্ভ করে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের ব্যক্তিবর্গও কোচিংয়ের কুফল নিয়ে আলোচনা করছেন; কোচিংয়ের সমালোচনা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা কী! কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য আছে এমন একজনও কি আছেন—যিনি তাঁর ছেলে-মেয়েকে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন না!

আমি গত ২০ বছর ধরে আমার ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িত। একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি কেন আমার ছেলে-মেয়েকে এই কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর থেকে বের হতে পারছি না। কেন হাজার, লাখো টাকা খরচ করে সব মা-বাবা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন! যেখানে কোচিংয়ের কুফল সম্পর্কে প্রায় সব মা-বাবাই সমান অবগত।

একটি বিষয় না বলেই পারছি না, সেটি হলো আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ টার্গেট কি? বেশির ভাগই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা ক্যাডার সার্ভিসের একটি সম্মানজনক চাকরি বা সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা বা এ রকম কিছু! সেটি হতে হলে তাকে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে। গোল্ডেন পেতে হবে। বিসিএস পরীক্ষায় অত্যন্ত ভালো ফলাফল করতে হবে। আজকে যাঁরা মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাচ্ছেন বা বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসে সুযোগ পাচ্ছেন, এমন একজনও কী আছেন যিনি কোচিং বা প্রাইভেট না পড়েই তা পেয়েছেন! কোচিংয়ের কুফল নিয়ে যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁদের ছেলে-মেয়েরা কী কোচিং বা প্রাইভেট না পড়েই বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়েছেন!

একটি সত্যিকারের গল্প বলি। একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস চলাকালে একজন শিক্ষকের সঙ্গে আমার দেখা করার প্রয়োজন হয়েছিল। আমি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দোতলায় উঠে বারান্দায় অপেক্ষা করছি। শিক্ষক সে সময় ক্লাস নিচ্ছিলেন। লক্ষ্য করলাম ক্লাস চলাকালেও ছাত্র-ছাত্রীরা গল্প-গুজব করছে। ক্লাসে যথেষ্ট হৈচৈ হচ্ছে। হৈচৈতে স্যারের কথা ক্লাসের পেছন পর্যন্ত আসছেও না। অথচ স্যারসহ সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।

অন্য একদিন সেই শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর কোচিং সেণ্টারে যাই। তিনি তখন কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিচ্ছিলেন। সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। শুধু শিক্ষকের কথা ছাড়া আর একটি কথাও শোনা যাচ্ছে না। শিক্ষক যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াচ্ছেন। হোম ওয়ার্ক দিচ্ছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা এবার কিন্তু হৈচৈ করছে না বা করতে পারছে না। শিক্ষক তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের রেজাল্ট বা ফলাফল অভিভাবককে জানাচ্ছেন। সবকিছু যেন একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়ে চলছে।

বিষয়টি একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে কি? একটু চিন্তা করার অবকাশ আছে কি—কেন সাধারণ মানুষ তার কষ্টার্জিত টাকার বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াচ্ছে বা পড়াতে বাধ্য হচ্ছে! তাই কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রী বা তাদের অভিভাকদের দোষারোপ না করে, রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে পারলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব এবং সেটাই মনে হয় একমাত্র সমাধান।

এখন মূল বিষয়ে আসি। করোনাভাইরাসের প্রকোপ কতদিন থাকবে কেউ বলতে পারছে না। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্ন মেয়াদে লকডাউন ঘোষণা করছে এবং সংগত কারণে তা ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। অনেক দেশ এই ভাইরাসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে না আসার পরও জীবিকার তাগিদে দোকানপাট, কল-কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। দেখা গেছে, যেসব দেশ লকডাউন শিথিল করেছিল, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজ খুলে দিয়েছিল, সেসব দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ আবার বেড়ে যাচ্ছে। লকডাউন শিথিল করলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই ভাইরাসের প্রকোপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র করোনাভাইরাসের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, উপযুক্ত প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এই ঝুঁকি থেকেই যাবে।

তাহলে রাষ্ট্র এই অবস্থায় কি সিদ্ধান্ত নিতে পারে! গত দুই মাসের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, করোনাকালে অনেক অফিসের কার্যক্রম ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। বলা যায়, রাষ্ট্র এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

আমাদের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার যৌথ গবেষণা কার্যক্রমে গত দুই মাস যাবত্ অস্ট্রেলিয়ার পার্থ, ক্যানবেরা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতি মঙ্গলবার সকাল ৯টায় স্কাইপ মিটিং হচ্ছে। পাওয়ার পয়েন্টে মাঠের গবেষণার কর্মকাণ্ড দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এতে হয়তো আমরা শতভাগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারছি না, কিন্ত এখন পর্যন্ত আমাদের কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

করোনাকালে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এভাবে চলতে পারে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ক্লাস করতে পারে। যেহেতু প্রায় সবার স্মার্ট ফোন আছে, এমনকি অনেকের ল্যাপটপও আছে, ওয়াই-ফাই কানেকশন আছে, তাই বোধ করি এই ব্যবস্থা চালু করলে সবাই উপকৃত হবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. উইলিয়াম এরসকিন যাঁর অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে, তাঁর সঙ্গে স্কাইপে মতামত বিনিময়কালে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, করোনাকালে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। এটা একেবারেই বসে থাকার চেয়ে ভালো। অন্তত ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের পড়ার মধ্যে রাখতে পারবে।

তবে এটা ঠিক, মুখোমুখি ক্লাসের বিকল্প হিসেবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের শিক্ষক উভয়ের একটু সময় লাগবে। তবে মন্দ কি, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি করোনার মধ্য দিয়েই ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবেশ করতে পারে! অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলে প্রথম দিকে অনভিজ্ঞতার কারণে হয়তো বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। আস্তে আস্তে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে। ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের শিক্ষকরা এ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। তাতে করে হয়তো একটা বছর করোনার কারণে হারিয়ে যাবে না। শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

লেখক : ডেপুটি প্রজেক্ট লিডার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.