এইমাত্র পাওয়া

‘মানুষ ধ্বংস হতে পারে কিন্তু পরাজিত হয় না”

ইংরেজি ভাষায় আমার প্রিয় উপন্যাস Ernest Hemingway-এর The Old Man and the Sea. এই উপন্যাসের গল্প ক্লাস নাইন থেকে শুনলেও ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে বইটি পড়ি। তখন থেকেই এটি আমার প্রিয় উপন্যাস। আজকের এই বাংলা নববর্ষের দিনে এই উপন্যাসের মূল বাণী আমার কাছে খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় ঐ বইয়ের মূল বাণীর শিরোনাম দিয়েই লেখাটি শুরু করলাম।

সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ প্রতি পদে পদে অসহায়। কিন্তু মানুষ তার সহজাত উদ্যম ও সাহস দিয়ে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে আজকের এই সভ্যতার যুগে এসেছে। প্রকৃতির সাথেই মানুষের বসবাস। এ মহাবিশ্বে মানুষ যতদিন আছে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধও চলবে ততদিন।
যুগে যুগে মানুষ প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেলেও পরাজিত হয় নাই। এই যুদ্ধ চলছে নিরন্তর নিত্যনতুনভাবে। আজকের বিশ্ব যুদ্ধ করছে করোনা নামক প্রাণঘাতি ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এখানে শত শত মানুষ শারীরিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষ অবিরত যুদ্ধ করে যাচ্ছে ঐ ভাইরাসের বিরুদ্ধে।

প্রতিকূলতা মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রতিক্ষণ মানুষ প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে জয়লাভ করে। এই যুদ্ধে কতজন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শারীরিক ধ্বংস হলেও তার উদ্যম, সাহস, সংগ্রাম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। যেমন- দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বৈষম্য ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সকল মানুষের সমান অধিকার চেয়েছেন। জীবনের মূল্যবান ২৭ বছর এক নাগাড়ে জেল খেটে যৌবনের মূল সময় ধ্বংস করেছেন, কিন্তু পরাজিত হন নাই। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে বর্ণ বৈষম্য দূর করেছেন। অবধারিত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর শরীর ধ্বংস হলেও তাঁর সংগ্রাম, উদ্যম পরাজিত হয় নাই। যুগ যুগ ধরে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর ৫৪ বছরের জীবনকালের প্রায় ১৩ বছরই জেলে কাটিয়েছেন। একাধিকবার মৃত্যুর মুখেও তিনি মনোবল হারান নাই। অদম্য মনোবল ও দীর্ঘ সংগ্রাম করে বাঙালিকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে ঘাতকরা তাঁকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করলেও তাঁর আদর্শ ধ্বংস করতে পারে নাই। ঘাতকরা সাময়িকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিকূলতা সৃষ্টি করলেও পরিনামে এই চেতনাকে পরাজিত করতে পারে নাই। আজ বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করেছেন। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ উন্নতিলাভ করছে।

আজকের এই বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এটিই একমাত্র পর্ব যা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির নিকট একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আজকের এই দিনে শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্ব প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষ আজ গৃহে অন্তরীণ আছে -যুদ্ধের অংশ হিসাবে। আজ মানুষ এই ভাইরাস নিয়ে ভীত, প্রায় সকলেই আশঙ্কার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। তবে এই প্রাণঘাতি ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেমে নাই। সারা বিশ্বের চিকিৎসা বিঞ্জানীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন এই ভাইরাসকে পরাজিত করার জন্য। আশা করা যাচ্ছে অচিরেই মানুষ সফল হবে। যেমন-যুগ যুগ ধরে সফল হয়ে আসছে। অতীতে মানুষ ম্যালেরিয়াসহ অনেক প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছে। হয়তো অনেক মানুষ শারীরিকভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু মানুষের উদ্যম, সংগ্রাম থেমে নাই। হয়তো অচিরেই এই করোনা ভাইরাস মানুষের কাছে পরাজিত হবে। কেননা, সৃষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ। পৃথিবীতে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের অসাধারণত্বের প্রমাণ হলো, মানুষের মুখে আছে ভাষা, বুকে আছে অসীম সাহস আর হূদয়ে আছে কঠিন মনোবল। কেবল ক্ষুদ্রতাকে মানুষ সহজেই মেনে নিতে পারে না। ‘এ পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকর, যত বিস্ময়কর সৃষ্টি’ সবকিছুর মূলেই রয়েছে মানুষের বিদ্যা-বুদ্ধি আর প্রতিভার অপরাজেয় স্বাক্ষর।
কবি তাই বলেছেন-
”নতুন পথের যাত্রা-পথিক
চালাও অভিযান !
উচ্চ কণ্ঠে উচ্চার আজ –
“মানুষ মহীয়ান !”
মানুষ পরাজিত হওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। আজকের এই দিনে প্রতিবছরের মত উৎসব পালন করতে না পারলেও শারীরিক দূরে থেকেও আমরা ঘরে ঘরে উৎসবমুখর হবো। সকলের সাথে হৃদয়ের সৌহার্দ্য অনুভব করবো। মনোবল হারাবো না। আজ চারিদিকে যে অন্ধকার অমানিশা তা কেটে যাবেই। কবির ভাষায় বলি-

”পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি
ওই কেটে গেল, ওরে যাত্রী।
এসেছে নিষ্ঠুর,
হোক রে দ্বারের বন্ধ দূর,
হোক রে মদের পাত্র চুর।
নাই বুঝি, নাই চিনি, নাই তারে জানি,
ধরো তার পাণি;
ধ্বনিয়া উঠুক তব হৃৎকম্পনে তার দীপ্ত বাণী।
ওরে যাত্রী
গেছে কেটে, যাক কেটে পুরাতন রাত্রি।”

পরিশেষে সকল আত্মীয় -স্বজন, গুরুজন, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী সকলকে জানাই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।আর আকুতি জানাই-
”বন্ধু হও, শত্রু হও,
যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যতো।

লেখক-শ.ম. সাইফুল আলম

উপপরিচালক, সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি, এসইডিপি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা ভবন, ঢাকা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.