নিজস্ব প্রতিবেদক।।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও জরুরি বিবেচনায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। নির্ধারিত পদে যোগ্য ব্যক্তি না পেলে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত কাউকে চুক্তিতে দায়িত্ব দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে যোগ্য ব্যক্তির পদোন্নতি করে পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর অভিযোগ আসে মাঝে মধ্যে। এক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তি কিংবা অর্থ লেনদেনের ঘটনাও থাকে। সচিব কিংবা দপ্তরপ্রধান যে পদেই হোক না চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আগে কর্মরত সত্যিকারের দক্ষ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ছেন কিনা তা পরখ করতে অভিমত দিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ ছিল। একই সচিবকে চার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দৃষ্টান্ত আছে। কেউ কেউ টানা আট বছর একই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রশাসনের ভারসাম্য আনতে অনেককে ওএসডি আবার কাউকে অবসরে পাঠাতে হয়েছে। সে সময় অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। আবার শেখ হাসিনার আমলে বঞ্চিত হওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা চলছে। সর্বশেষ শনিবার সচিব পদমর্যাদায় এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ওয়াকফ প্রশাসক পদে তিনজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক হয়েছেন ড. মোহাম্মদ জকরিয়া। সাফিজ উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়াকফ প্রশাসক। মো. আব্দুল্লাহ আল বাকীকে ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। সাবেক এ আমলাদের এক বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তিনটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন স্থানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রশাসনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আবার বিতর্কের মুখে নিয়োগ বাতিলের দৃষ্টান্ত আছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে ১৩ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে। এরপর অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারাও আছেন। যেমন-মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে এক বছরের চুক্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতন্ত্র’ বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে রাষ্ট্র। এটি ভালো দিক। তবে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি পান না ফলে তাদের মনে কষ্ট থাকে। আবার এটাও ঠিক সব কর্মকর্তাকে চাইলেই সচিব করা সম্ভব নয়। যদিও দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে গুরুত্ব মেলে আওয়ামী লীগের আমলে। পরবর্তী সময় তাদের অনেকে শাস্তির মুখে পড়তে দেখে আমলারা নিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু আবারও কিছু কর্মকর্তার মধ্যে দলীয় লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ আসছে। এর আগে ২০১৪ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নীতিমালার আলোচনা ছিল। তবে আলোর মুখ দেখেনি।
মূলত ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর ৪৯ ধারার ক্ষমতাবলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আইনের ৪৯ ধারার ১-উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের পর, সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করিতে পারিবেন।’ উপধারা-২ এ বলা হয়েছে ‘উপ-ধারা (১)-এর অধীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে, উক্ত ছুটি স্থগিত থাকিবে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমাপ্তির পর উক্ত অবশিষ্ট অবসর-উত্তর ছুটি ও তদ্?সংশ্লিষ্ট সুবিধা ভোগ করা যাইবে।’
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ নজরুল ইসলাম বলেন, দলীয় মনোভাব বাদ দিয়ে একান্ত জরুরি হলে মেধাবী ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতেই পারে। এর দরকার আছে। মনে রাখতে হবে নিয়মিত চাকরিজীবীদের মধ্যে বঞ্চিত করার মাত্রা কতটুকু। তা ছাড়া অর্থ লেনদেন কিংবা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এ কাজ করলে সরকারের বদনাম বেশি হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ২৮ মার্চ তার সেই নিয়োগ আদেশ আবার বাতিলও হয়।
এর আগে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনও দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। ১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান। ৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল। ২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে নতুন সরকারের কাছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে নয়। আবার এখনো বিআরটিএসহ বিভিন্ন দপ্তর প্রধানের পদ ফাঁকা। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।- আমাদের সময়
শিক্ষাবার্তা /এ/ ২১/০৪/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
