এইমাত্র পাওয়া

২৩৭ প্রার্থী, একজনও শিক্ষক নয়: বিএনপির সিদ্ধান্তে হতাশ শিক্ষাঙ্গন

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, সেই তালিকা প্রকাশের পর দলীয় অঙ্গন ছাড়িয়ে দেশের শিক্ষা সমাজেও এক প্রকার হতাশার ঢেউ বয়ে গেছে। কারণ, তালিকায় জায়গা পেয়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ—ডাক্তার, আইনজীবী, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী, এমনকি ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত মুখও—কিন্তু একজনও শিক্ষক নেই। এই অনুপস্থিতি কেবল সংখ্যার দিক থেকে নয়, অর্থবহ দিক থেকেও গভীর প্রতীকী প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জাতির বিবেক” বলে পরিচিত শিক্ষকরা কি সত্যিই অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েছেন?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষক সমাজের অংশগ্রহণের ঐতিহ্য এক সময় ছিল গর্বের। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন পর্যন্ত—শিক্ষকরা ছিলেন নেতৃত্ব ও প্রেরণার প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, কলেজ বা স্কুলের শিক্ষক—সবাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নৈতিক শক্তির মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে গেছে। এখন রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষক নয়, দেখে থাকেন পেশাগত প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বা সামাজিক ‘ওজন’।

বিএনপির ২৩৭ আসনের ঘোষণায় শিক্ষকদের বাদ দেওয়া যেন এই প্রবণতারই সর্বশেষ উদাহরণ। যেখানে প্রতিটি নির্বাচনে দলের সঙ্গে থাকা শিক্ষকদের ত্যাগ, জেল-জুলুম, ও রাজনৈতিক নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে—সেখানে মনোনয়ন তালিকায় তাদের অনুপস্থিতি এক প্রকার নৈতিক অবজ্ঞার নামান্তর।

মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে জোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন লিখিত বক্তব্যে বলেন—“দলের কঠিন সময়ে শিক্ষক সমাজ সবসময় মাঠে ছিল। অথচ এবার প্রার্থী তালিকায় শিক্ষকদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।”

তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এ.এইচ.এম. সায়েদুজ্জামান, সহকারী মহাসচিব শাহানাজ পারভীন, কালচারাল সম্পাদক নাজমা হোসেন লাকী,  সাংগঠনিক সম্পাদক হাওলাদার আবুল কালাম আজাদ, সহকারী মহাসচিব প্রফেসর বদরুল আলম, প্রফেসর আবদুল হাকিম,  এমপি প্রাথী আক্তারুল আলম মাস্টার  সহ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শিক্ষকরা শুধু ভোটের সময় নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির পাশে থেকেছেন; অথচ প্রার্থিতার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ও অবদানের কোনো মূল্যায়ন হয়নি।

এখানে তাদের প্রশ্নটা যৌক্তিক—যদি ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ—সবাই পেশাজীবী কোটা থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন, তাহলে শিক্ষকরা কেন বাদ পড়বেন? শিক্ষা পেশা কি পেশাজীবীদের তালিকার বাইরে? নাকি শিক্ষকের ‘ভোট আছে, ভোটাধিকার নেই’?

“শিক্ষক” শব্দটা পেশা নয়, এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন—“শিক্ষক জাতির বিবেক।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন—“যে জাতি শিক্ষককে সম্মান করতে জানে না, সে জাতি কখনও মহান হতে পারে না।”

আর লক্ষ্মীচন্দ্র সেন বলেছেন-“যত সভ্য সমাজ, তত সম্মান শিক্ষককে।”অর্থাৎ সমাজের সভ্যতার মান পরিমাপ হয় শিক্ষককে দেওয়া সম্মানের মাধ্যমে।

এই বাণীগুলো এখন শুধু বইয়ের পাতায় টিকে আছে। বাস্তবে দেখা যায়, শিক্ষক সমাজকে দিন দিন প্রান্তিক করে তোলা হচ্ছে—অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, এমনকি রাজনৈতিকভাবেও।

রাজনীতিতে শিক্ষকের অংশগ্রহণ মানে শুধু ভোটের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নয়; এর মানে সমাজে যুক্তিবোধ, নীতি ও মূল্যবোধের নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু দলগুলো এখন সেই নেতৃত্বের জায়গায় অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খোঁজে। ফলে শিক্ষকের জায়গা সরে যাচ্ছে প্রান্তে, আর রাজনীতি হচ্ছে মুখোশধারী ব্যবসায়ীদের দখলে।

বিএনপির পক্ষ থেকে অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন—২৩৭টি আসন ঘোষণার বাকি আসনগুলো জোটের শরিক দলগুলোর জন্য রাখা হয়েছে, সেখানে হয়তো শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব পেতে পারেন।

কিন্তু এই যুক্তি শিক্ষকদের হতাশা ঘোচাতে পারছে না। কারণ, বিএনপির ঘোষিত তালিকায় বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্ব রাখা হলেও, ‘শিক্ষক সমাজ’ পুরোপুরি উপেক্ষিত।

এতে ধারণা তৈরি হয়েছে—দলটি হয়তো মনে করে, শিক্ষকরা ভোট এনে দিতে পারেন না, মাঠের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেন না। এই মানসিকতা কেবল শিক্ষক নয়, সমাজের চিন্তাশীল শ্রেণির প্রতিও এক ধরনের অবমূল্যায়ন।

রাজনীতি যদি কেবল ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে সেই রাজনীতি আদর্শ হারায়। বিএনপি সবসময় নিজেকে “বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তের দল” বলে দাবি করে এসেছে। কিন্তু শিক্ষক বঞ্চনার এই সিদ্ধান্ত সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলনে শিক্ষক সমাজের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনগুলো বরাবরই দলের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম থেকেছে। ২০০১ সালের পর থেকে বিএনপির প্রতিটি কঠিন সময়ে—গ্রেফতার, হয়রানি, মামলায়—শিক্ষকরাই ছিলেন দৃঢ়ভাবে পাশে। আজ সেই শিক্ষকদের রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে মনোনয়নে শূন্যতা পাওয়া কেবল হতাশাজনক নয়, এটি দল ও পেশাজীবী সম্পর্কের ওপরও আঘাত হানে।

যখন একজন শিক্ষক দেখেন যে, তার সহকর্মী ডাক্তার বা আইনজীবী দলীয় টিকিট পাচ্ছেন, অথচ তিন দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে নিবেদিত শিক্ষক সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত—তখন এই অবিচার কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রতীকী হয়ে ওঠে।

আজকের বাংলাদেশে শিক্ষক মানে—অল্প বেতনের মানুষ, আন্দোলনরত মানুষ, কিংবা প্রশাসনের অবহেলিত অংশ।

যে সমাজে শিক্ষককে ‘দারিদ্র্যের প্রতীক’ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের অবদানকে প্রভাব হিসেবে গণ্য করে না।ফলে দেখা যায়—যারা সমাজে সেবা দেন, তারাই রাজনীতির প্রতিদান পান না।

এই বৈপরীত্যই এখন আমাদের রাজনীতির দুর্বলতা।
একজন শিক্ষক যেখানে নীতির প্রতীক, সেখানে দলগুলো এখন টাকার জোরে টিকিট দেয় এমন মানুষকে, যাদের সমাজে নৈতিক অবস্থান প্রায় নেই।

এভাবে রাজনীতিতে মেধা ও নীতিবোধ হারিয়ে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে এক ধরণের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি—যেখানে শিক্ষক, লেখক, চিন্তাবিদদের কোনো স্থান নেই।

বিএনপি এখনও পুরো ৩০০ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করেনি। বাকি আসনগুলো শরিক দল বা পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে পূরণ করা হবে। এই জায়গায় দলটির কাছে এখনো সুযোগ আছে—শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার।

যদি তারা অন্তত কয়েকজন শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া ও মো: জাকির হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে শিক্ষাঙ্গনের হতাশা কিছুটা হলেও কাটবে। কারণ শিক্ষক শুধু ভোটার নয়, তারা মতামতের নির্মাতা। রাজনীতিতে শিক্ষকের উপস্থিতি মানে, রাজনৈতিক বক্তব্যে যুক্তি ও নৈতিকতার সংযোজন।

রাজনীতি যদি শিক্ষকের জ্ঞান ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে সেই রাজনীতি দিক হারায়।
শিক্ষকরা সমাজে চিন্তার স্থপতি, তারা নীতি নির্ধারণে যুক্তিসঙ্গত চিন্তা উপহার দিতে পারেন। কিন্তু আজ তাদের স্থান হচ্ছে মিছিলের পেছনে, সিদ্ধান্তের টেবিলের বাইরে।

এই বাস্তবতা শুধু বিএনপির নয়, প্রায় সব দলের ক্ষেত্রেই সত্য।তবে বিএনপির মতো একটি পুরনো, আদর্শনির্ভর দল যখন শিক্ষকদের এমনভাবে বাদ দেয়, তখন সেটি সমাজে হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

২৩৭ প্রার্থী, একজনও শিক্ষক নয়—এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। বিএনপি যেভাবে পেশাজীবী কোটা ব্যবহার করেছে, তাতে মনে হয় দলটি শিক্ষার জায়গায় পেশাগত প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু দলগুলো ভুলে যাচ্ছে—জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে শিক্ষক শুধু পাঠশালা নয়, সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশনাও দেন। তাদের বাদ দেওয়া মানে সমাজের প্রজ্ঞাকে বাদ দেওয়া। বিএনপির এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত হোক বা অবচেতন ভুল—এর প্রভাব শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী হবে।

রাজনীতিতে শিক্ষকের জায়গা পুনরুদ্ধার না হলে আমরা একদিন এমন রাজনীতি পাব, যেখানে জ্ঞানের আলো নয়, অন্ধ ক্ষমতার প্রতিযোগিতাই প্রধান হবে।

লেখক:
শিক্ষক  ও সমাজ বিশ্লেষক।

শিক্ষাবার্তা /এ/১২/১১/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading