।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
রাজধানীর শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন চলছিল। দশম গ্রেডে উন্নীতকরণের দাবিতে সারাদেশের শিক্ষকরা মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি থেকে শুরু করে প্রতিদিন রাজপথে ছিলেন। কেউ হাতে ব্যানার, কেউ মাথায় কাপড় বেঁধে শীত ও ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের দাবি আদায়ের আশায়। সেই আন্দোলনের মাঝেই এক শিক্ষক সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললেন—“আমার বয়স ৫০ বছর হয়ে গেছে, এখনো বিয়ে করতে পারিনি। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক শুনে কেউ মেয়ে দিতে চায় না!”
বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হলো বিতর্ক— কেউ বললেন এটি বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি, কেউ বললেন অতিরঞ্জন বা নাটকীয়তা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—সত্যিই কি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা এত অবহেলিত? এই পেশা কি এখন সমাজে সম্মান হারিয়ে ফেলেছে?
একসময় শিক্ষক ছিলেন সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষদের একজন। “গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু” – এই সংস্কৃত মন্ত্র শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলনও ছিল। গ্রামীণ সমাজে “মাস্টার সাহেব” মানেই ছিলেন শ্রদ্ধার প্রতীক। তাঁর কথা মানা হতো, তাঁর সামনে তরুণেরা মাথা নিচু করে চলত।
কিন্তু এখন? “প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক” শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে মুখে হাসি ফোটান, কেউ আবার দুঃখ মেশানো সহানুভূতির দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। সময় বদলেছে, সমাজের মূল্যবোধ বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে শিক্ষকের অবস্থানও।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা। প্রাথমিক শিক্ষকরা জাতির ভিত্তি নির্মাতা, কিন্তু তাঁদের জীবনের ভিত্তিটাই টলমলে। একদিকে দায়িত্ব পাহাড়সম, অন্যদিকে বেতন কাঠামো এত নিম্নমানের যে, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। ফলে সামাজিক মর্যাদা ক্রমেই তলানিতে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের একজন প্রাথমিক শিক্ষক সাধারণত ১৩তম গ্রেডে চাকরি শুরু করেন। বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে মাস শেষে যা হাতে আসে, তা দিয়ে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে সম্মানজনক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব।
এই শিক্ষকই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিশুদের অক্ষর শেখান, নৈতিকতা শেখান, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়েন। কিন্তু তাঁর নিজের সন্তানের জন্য ভালো পোশাক কেনার সামর্থ্য থাকে না, পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তাঁকে প্রায়ই ধারদেনায় জড়াতে হয়।
যে শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড, সেই মেরুদণ্ডটিকেই যেন ভেঙে দিয়েছে দারিদ্র্য। আর সমাজও তাঁকে দেখে মাপজোখ করে পকেটের টাকায়, নয় জ্ঞানের গভীরতায়। ফলে “প্রাথমিক শিক্ষক শুনে কেউ মেয়ে দিতে চায় না” – এই বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যা না হলেও, তা আসলে এক দীর্ঘ অবমূল্যায়নের প্রতীক।
যে শিক্ষক বলেছিলেন, “৫০ বছরেও বিয়ে হয়নি”— তিনি শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের কথা বলেননি; বলেছেন এক শ্রেণির পেশাজীবীদের মানসিক ও সামাজিক বঞ্চনার কথা। আমাদের সমাজে এখন পেশার মর্যাদা নির্ধারিত হয় আয়-ক্ষমতা দিয়ে, চরিত্র বা জ্ঞানের ভিত্তিতে নয়।
একজন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মচারী, এমনকি একটি মোবাইল কোম্পানির সেলস অফিসারও প্রাথমিক শিক্ষকের তুলনায় ‘যোগ্য পাত্র’ হিসেবে বিবেচিত হন, যদিও তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বা নৈতিক মান কম হতে পারে। কারণ আমাদের সমাজ এখন “কে কত আয় করে” তা-ই দিয়ে মানুষকে মাপছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল শিক্ষকদেরই নয়, পুরো সমাজকেই ধ্বংস করছে। কারণ যে সমাজ শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনোই প্রকৃত শিক্ষা পেতে পারে না।
তাইতো লক্ষ্মীচন্দ্র সেন বলেছেন-“যত সভ্য সমাজ, তত সম্মান শিক্ষককে।”অর্থাৎ সমাজের সভ্যতার মান পরিমাপ হয় শিক্ষককে দেওয়া সম্মানের মাধ্যমে।
সরকার প্রতিনিয়ত বলে—“শিক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার।” কিন্তু এই অগ্রাধিকার যদি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা এক প্রকার উপহাস ছাড়া কিছু নয়। প্রাথমিক শিক্ষকরা যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন—যেমন ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ, সময়মতো ইনক্রিমেন্ট, বাসস্থান ও চিকিৎসা ভাতা—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ন্যায্য অধিকার। দুঃখের বিষয়, তাঁদের এই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হয় শুধু আন্দোলনের চাপেই। রোদে, বৃষ্টিতে, রাজপথে রাত কাটানোর পর যখন সরকার আংশিক আশ্বাস দেয়, তখন তাঁরা কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ঘরে ফেরেন।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষাকে “বিনিয়োগ” হিসেবে দেখে, তাহলে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নকে প্রাথমিক শর্ত হিসেবে নিতে হবে। কারণ ক্ষুধার্ত শিক্ষক কখনো আদর্শবান নাগরিক গড়তে পারেন না।
অবহেলা শুধু বেতনে নয়, রয়েছে নীতিতেও। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগকে প্রশাসনিক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে, পেশাগত উন্নয়নের দৃষ্টিতে নয়। অনেক সময় জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা শিক্ষকদের এমনভাবে আচরণ করেন যেন তারা “চাকর” মাত্র।
প্রশিক্ষণ, গবেষণা, কর্মপরিবেশ—কোনো ক্ষেত্রেই প্রাথমিক শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। তাঁদের অবদানকে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং অনেক সময় তুচ্ছ কাজের নির্দেশ দিয়ে অপমানিত করা হয়।এই অবহেলা তাদের আত্মসম্মানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ফলাফল—এক শ্রেণির শিক্ষক পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন, অনেকে চাকরির পাশাপাশি অন্য উপার্জনের পথ খুঁজছেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে।
আজকের সমাজে “কত আয় করেন” প্রশ্নটি “কেমন মানুষ তিনি” প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষকরা সেই বাস্তবতার শিকার। বিয়ে বা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন স্থায়ী চাকরি বা সরকারি পদ নয়, বড় বিষয় হচ্ছে মাসিক আয় ও জীবনযাত্রার মান। ফলে একজন শিক্ষক যতই জ্ঞানী, নৈতিক বা সৎ হোন না কেন, তাঁর আয় সীমিত বলেই তাঁকে কম যোগ্য হিসেবে দেখা হয়।
এখানে কেবল সমাজ নয়, মিডিয়া ও সংস্কৃতিকেও দায়ী করা যায়। নাটক-চলচ্চিত্রে “মাস্টারমশাই” চরিত্রকে প্রায়ই হাস্যরসের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়, যা অজান্তেই মানুষকে শেখায়—শিক্ষক মানেই দুর্বল, অসহায়, গরিব।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনে দরকার নীতিগত পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতা। প্রথমত, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো জাতীয় অন্যান্য সেবাখাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। “দশম গ্রেড” শুধু দাবি নয়, এটি মর্যাদার প্রতীক।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, মিডিয়া ও সমাজকে শিক্ষককে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে হবে—যাতে তরুণ প্রজন্ম এই পেশাকে অবহেলার চোখে না দেখে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে হবে চিন্তার ভেতর।
যে সমাজে পেশা দিয়ে মানুষের চরিত্র বিচার হয়, সেখানে শিক্ষক অবহেলিত থাকবেনই। আমাদের ভাবতে হবে—একটি শিশুর প্রথম আদর্শ কে? উত্তর একটাই—তার শিক্ষক। তাহলে সেই মানুষটিই যদি সম্মান না পান, তাহলে সমাজের ভবিষ্যৎ কীভাবে সুশৃঙ্খল হবে?
“৫০ বছরেও বিয়ে হয়নি”— এই আর্তনাদ শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মানসিক অবক্ষয়ের প্রতীক। একজন শিক্ষক যখন তার পেশার কারণে অপমানিত হন, তখন পুরো জাতিই অপমানিত হয়।
আমরা ভুলে গেছি, শিক্ষা কোনো পণ্য নয়— এটি মানবিকতার ভিত্তি। আর যিনি এই মানবিকতা শেখান, তাঁকে যদি সমাজ অবহেলা করে, তবে সেই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
প্রাথমিক শিক্ষকরা অবহেলিত—এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক বাস্তবতাও। তাঁদের জীবনমান, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।নইলে হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক শিক্ষক বলবেন—
“আমার বয়স ৫০ বছর হয়ে গেছে, এখনো বিয়ে করতে পারিনি।”
আর আমরা তখনও হয়তো ভাবব—এটা নাটক, এটা অতিরঞ্জন। কিন্তু সত্যিই কি তাই?
লেখা: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/১২/১১/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
