এইমাত্র পাওয়া

নাদের আলী স্যার চলে গেলেন, রেখে গেলেন হাজার আলোকিত জীবন

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান। 

শিক্ষকতা পেশা নয়, এটি এক আজীবনের ব্রত।  প্রিয় নাদের আলী স্যার সেই ব্রতেরই এক অনন্য প্রতীক ছিলেন। পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক বিএসসি শিক্ষক জনাব নাদের আলী স্যার কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন নির্মল মানুষ, একজন আলোকিত আত্মা, যিনি তাঁর জ্ঞান, চরিত্র ও মমতায় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। তাঁর মৃত্যু মানে যেন এক যুগের অবসান।

১৯৮৬ সালের কথা। কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র নাদের আলী স্যার ছিলেন  বিজ্ঞানের শিক্ষক। তখনকার দিনে বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়কে এত সহজভাবে শেখানো শিক্ষক খুব কমই ছিলেন। নাদের আলী স্যার সেই বিরল ব্যতিক্রম। চক-ডাস্টে ভরা বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এমনভাবে পাঠ দিতেন যে, বিজ্ঞানের সূত্র, প্রক্রিয়া কিংবা ধারণা যেন গল্পের মতো প্রাণ পেত। শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হয়ে শুনত, প্রশ্ন করত, স্যার ধৈর্য ধরে উত্তর দিতেন।

বিজ্ঞানের ক্লাসে তিনি শুধু সূত্র শেখাতেন না, শেখাতেন যুক্তি, শৃঙ্খলা ও সততার পাঠও। তাঁর চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা, যা ছাত্রদের মনে অনুপ্রেরণা জাগাত। স্যার বলতেন, “বিজ্ঞান শেখা মানে শুধু বই পড়া নয়, শেখা মানে পৃথিবীকে জানা।”এই এক বাক্যই যেন প্রজন্মকে ভাবতে শিখিয়েছে, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়েছে।

নাদের আলী স্যার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, শান্ত ও সংযমী মানুষ। তাঁর কণ্ঠ ছিল নরম, কিন্তু কথার মধ্যে ছিল এমন প্রভাব—যা শ্রদ্ধা আদায় করত, ভয় নয়। তিনি কখনো রাগ করতেন না, গালাগাল করতেন না। বরং কেউ ভুল করলে তিনি চুপচাপ ডেকে নিতেন, মৃদু স্বরে বলতেন—“ভুল করেছো, এবার ঠিকটা শিখে নাও।”

একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর এই মানবিকতা ছিল সবচেয়ে বড় গুণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানে কেবল তথ্য দেওয়া নয়, শিক্ষার্থীর ভেতর নৈতিকতা জাগিয়ে তোলা। আজকের যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ শব্দগুচ্ছটি অনেক সময় কেবল কাগজে থাকে, সেখানে নাদের আলী স্যার ছিলেন তার জীবন্ত উদাহরণ।

স্যারের পাঠশালার সীমানা ছিল না বিদ্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে—কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু সবাই যখন শৈশবের স্মৃতি টেনে আনে, তখন নাদের আলী স্যারের নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে।

তাঁর এক সাবেক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, “স্যারের কাছে শুধু বিজ্ঞান নয়, জীবন শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁর কথাগুলো আজও সিদ্ধান্তের সময় মনে পড়ে।”

এমন একজন মানুষ যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন তা কেবল একটি পরিবার বা একটি বিদ্যালয়ের ক্ষতি নয়—এটি পুরো সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

দীর্ঘদিন ধরে স্যার অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মাঝেও তিনি কখনো অভিযোগ করেননি, কখনো কষ্টের কথা বলেননি। তাঁর চোখে-মুখে ছিল প্রশান্তির ছায়া, মুখে উচ্চারণ ছিল—“সবই আল্লাহর ইচ্ছা।” মৃত্যুর পরও যেন সেই প্রশান্তি ছড়িয়ে গেছে তাঁর ছাত্র, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মনে।

আজ যখন তাঁর মৃত্যু সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন সামাজিক মাধ্যমে, ফোনে, ব্যক্তিগত স্মৃতিতে যে আবেগের ঢেউ উঠেছে, তা প্রমাণ করে—একজন প্রকৃত শিক্ষকের মৃত্যুও শিক্ষা দিয়ে যায়, কীভাবে মর্যাদা অর্জন করতে হয়।

স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে স্যারের বোর্ডে লেখা সুন্দর হাতের অক্ষর, চক ধরে লেখা সূত্র, আর মাঝে মাঝে ঠোঁটে ফুটে ওঠা হাসি। তিনি আমাদের বুঝিয়েছিলেন, “শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, নিজের ও সমাজের উন্নতির জন্য।”

স্যারের হাঁটার ভঙ্গি, তাঁর শার্টের পকেটে থাকা ছোট্ট কলম, আর ক্লাস শেষে তিনি যেভাবে বলতেন—“আগামী ক্লাসে দেখা হবে”—সবই এখন স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে রইল।

নাদের আলী স্যার রেখে গেছেন হাজার আলোকিত জীবন—এ শুধু কথার অলংকার নয়, এটি নির্মোহ সত্য। তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ সমাজের নানা স্তরে যে ভূমিকা রাখছেন, তা স্যারের শেখানো নৈতিকতা, পরিশ্রম ও সততার ফল।

একজন শিক্ষক যখন তাঁর ছাত্রদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তখন তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর প্রভাব অমর হয়ে থাকে। স্যারও সেই অমর প্রভাব রেখে গেছেন। তাঁর ক্লাসে যে শৃঙ্খলার পাঠ, যে মানবতার শিক্ষা, তা প্রতিটি ছাত্রের জীবনে এক অনন্ত আলো হয়ে রয়ে গেছে।

নাদের আলী স্যার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর ছায়া এখনো টের পাওয়া যায় পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথরে। শিক্ষক কক্ষে, বিজ্ঞানের ল্যাবে, কিংবা পুরনো শ্রেণিকক্ষের কাঠের বেঞ্চে যেন এখনো ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠ—“বিজ্ঞান শেখো, কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হয়ো।”

এই বাক্যটাই যেন এখন প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনের ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর নৈতিকতা ও তাঁর শিক্ষাদর্শন আজও বেঁচে আছে আমাদের ভেতর।

তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারালাম এক শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষককে, এক আলোকিত মানুষকে। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি, সহকর্মী ও অসংখ্য গুণগ্রাহী শিক্ষার্থী। এই শোকের মুহূর্তে তাঁদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।

মহান আল্লাহ তাআলা যেন তাঁর সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন—এই দোয়া করি।

মানুষ হিসেবে কেউ চিরকাল বেঁচে থাকে না, কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান তাঁদের কর্মে, চরিত্রে, প্রভাবের বিস্তারে। নাদের আলী স্যার তাঁদেরই একজন। তাঁর মৃত্যু আমাদের চোখে জল এনে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের দিয়েছে দিশা।

একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো মরে না—তিনি বেঁচে থাকেন প্রতিটি ছাত্রের চিন্তায়, প্রতিটি সাফল্যে, প্রতিটি মানবিক সিদ্ধান্তে।
আজ তাই মনে হয়,
নাদের আলী স্যার চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন হাজার আলোকিত জীবন—যারা এখনো পৃথিবীকে আলোকিত করে চলেছে।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১২/১১/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.