এইমাত্র পাওয়া

ভর্তি নিয়ে বিভক্ত সমাজ: ভাগ্য না মেধা—কোন পথে শিক্ষা?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

২০২৬ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে স্কুলভর্তি নিয়ে দেশে আবারও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্নটি এখন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নয়, এটি হয়ে উঠেছে সমাজের নৈতিক অবস্থান ও শিক্ষাদর্শনের প্রতিফলন—আমরা কি চাই আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবনের সূচনা ভাগ্যের উপর নির্ভর করুক, নাকি মেধার পরিমাপে?

বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারি-বেসরকারি স্কুলে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এই পদ্ধতিতে ভর্তি বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়ম কমেছে, স্বচ্ছতা বেড়েছে। কিন্তু বিপরীতে, শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশ মনে করে—লটারি আসলে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে দুর্বল করছে। অভিভাবক সংগঠন ও শিক্ষক সংগঠন, উভয় পক্ষের যুক্তিই বাস্তবভিত্তিক। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী: সবার জন্য সুযোগ তৈরি করা, নাকি যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছাই করা?

অভিভাবক ঐক্য ফোরামসহ বেশ কিছু সংগঠন লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এটি একটি “সমান সুযোগের ব্যবস্থা”—যেখানে ধনী-গরিব, শহর-গ্রামের শিক্ষার্থী সবাই একই কাতারে দাঁড়ায়। এখানে কারও রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক সামর্থ্য বা পরিচিতির প্রভাব কম থাকে। বিশেষ করে রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার নামে যে “অঘোষিত কোচিং ব্যবসা” গড়ে উঠেছিল, সেটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে লটারির মাধ্যমে।

অভিভাবকরা আরও বলেন, ১০-১১ বছর বয়সী কোমলমতি শিশুদের উপর ভর্তি পরীক্ষার মানসিক চাপ দেওয়া মানবিক নয়। প্রতিযোগিতার এই প্রাথমিক ধাপ থেকেই শিশুর মনে ভয়, হতাশা ও হীনমন্যতা ঢুকে যায়। অনেকেই পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণে নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহে ভোগে, যা ভবিষ্যতে শেখার আনন্দ নষ্ট করে দেয়। লটারির মাধ্যমে ভর্তি হলে অন্তত শিক্ষার প্রারম্ভিক স্তরে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে শিশুরা মুক্তি পায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—লটারির ফলে অভিভাবক নির্ভর অর্থনৈতিক শোষণ কমে গেছে। কোচিং সেন্টার, গাইডবই প্রকাশক, এবং প্রাইভেট টিউটরদের ব্যবসায়িক দৌরাত্ম্য কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। ভর্তি বাণিজ্যের এই অবসান শিক্ষাকে আরও জনমুখী করেছে বলে মনে করেন অনেকে।

অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন লটারি পদ্ধতিকে “শিক্ষাবিরোধী ও মেধানাশী” বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা ও মেধা। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে ছাত্র ভর্তি মানে—মেধাবীরা সুযোগ হারাবে, অনুপ্রাণিত হওয়ার বদলে হতাশ হবে। এটি শুধু শিক্ষার্থীর নয়, পুরো সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিক স্তরে লটারির পদ্ধতি যুক্তিযুক্ত হতে পারে—কারণ সেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিশুর মানসিক বিকাশ। কিন্তু মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষা ধীরে ধীরে মূল্যায়নভিত্তিক হয়ে ওঠে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তিতে পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তত শিক্ষার্থীর পূর্ববর্তী শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করা উচিত। নইলে শিক্ষা একটি ‘লাকি ড্র’-তে পরিণত হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কেবল ভাগ্যের উপর।

তারা আরও আশঙ্কা করেন—লটারি পদ্ধতি দীর্ঘদিন চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় উদাসীন হয়ে পড়বে। কারণ, যখন মেধা বা পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না, তখন অনুপ্রেরণাও হারিয়ে যায়। এই পদ্ধতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতাহীন, আলসেমিপূর্ণ ও মধ্যমতার দিকে ঠেলে দেয়।

শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এক ধরনের অদৃশ্য চাপের মধ্যে রয়েছেন। তারা জানেন, ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনলে আবারও ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং নির্ভরতা, এমনকি ঘুষ ও সুপারিশ সংস্কৃতি ফিরে আসবে। আবার লটারি পদ্ধতি বজায় রাখলে শিক্ষকদের সমালোচনা, অভিভাবকদের বিভ্রান্তি, এবং মেধা ভিত্তিক মূল্যায়নের অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক বাড়বে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির জানিয়েছেন, এখনো ভর্তি নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়নি; তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভায় আলোচনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এখনো দোলাচল কাটেনি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুসারে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি স্কুলের মোট আসনের ৭৬ শতাংশ খালি ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী আবেদনই করেনি। অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব—কারণ প্রতিষ্ঠান সংখ্যা সীমিত, অথচ মানসম্পন্ন শিক্ষকের উপস্থিতি বেশি।
এই বৈষম্যই ভর্তি সংকটকে আরও জটিল করছে। ধনী পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানকে মানসম্মত সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে চান, অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো আসন পূরণে ব্যর্থ। ফলে ভর্তি নীতিমালার যেকোনো পরিবর্তনই এখন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

যে যুক্তিতে লটারির পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল—কোচিং ব্যবসা কমানো ও ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করা—তা আংশিক সফল হলেও সমস্যার শিকড় রয়ে গেছে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বেসরকারি বিদ্যালয় ভর্তি ফি ও বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে। অন্যদিকে অভিভাবকরা সরকারি স্কুলের লটারিতে নাম না উঠলে বেসরকারি “ব্র্যান্ড স্কুলে” ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছেন মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে।
অর্থাৎ লটারির মাধ্যমে “সমতা” আনার যে চেষ্টা ছিল, তা পরিণত হয়েছে নতুন ধরনের বৈষম্যে—যেখানে টাকার বিনিময়ে শিক্ষা মান নির্ধারিত হচ্ছে।

ভর্তি বিতর্কে সবচেয়ে অনুচ্চারিত বিষয়টি হলো—শিক্ষার্থীর মানসিক ও নৈতিক বিকাশ। ভর্তি পরীক্ষা থাকলে শিশুর মনে প্রতিযোগিতার বীজ বপন হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, আবার অতিরিক্ত চাপের কারণেও ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে লটারির মাধ্যমে ভর্তি হলে শিশুরা নির্ভার থাকে, কিন্তু সেই সঙ্গে “চেষ্টা না করেও পাওয়া যায়” এই মানসিকতা গড়ে ওঠে।
তাই এই বিতর্ক কেবল ভর্তি নীতির নয়, এটি শিক্ষার উদ্দেশ্য ও দর্শনের প্রশ্ন। আমরা কি চাই শিশুরা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে নামুক, নাকি প্রথমেই তাদের শেখানো হোক—জীবন ভাগ্যের খেলা?

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই দ্বন্দ্বের সমাধান একমুখী কোনো পথে নয়, বরং ভারসাম্যের মাধ্যমে সম্ভব।
** প্রাথমিক  স্তরে (১ম–৫ম শ্রেণি) লটারির মাধ্যমে ভর্তি, আর মাধ্যমিক স্তরে (৬ষ্ঠ–৯ম শ্রেণি) সীমিত আকারে মূল্যায়নভিত্তিক ভর্তি।
** ভর্তি পরীক্ষা থাকলেও সেটি যেন মানবিক ও শিশুবান্ধব হয়—অতি জটিল প্রশ্ন বা কোচিং নির্ভর পাঠ্য নয়, বরং শিক্ষার্থীর প্রাথমিক দক্ষতা যাচাই করা যায় এমনভাবে।
**অনলাইন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে—লটারির ফলাফল, পরীক্ষার নম্বর, ভর্তি ফি সবকিছু যেন খোলা তথ্য হিসেবে প্রকাশিত হয়।
**বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের ভর্তি ফি, বেতন, অবকাঠামো ও শিক্ষক মানের উপর সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
**কোটা ও পোষ্যনীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোটা সংস্কৃতি শিক্ষার মূল ন্যায্যতাকে নষ্ট করছে।

শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া নয়—এটি একটি সমাজের চিন্তা, ন্যায়বোধ ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। যখন আমরা ভর্তি পদ্ধতিকে ভাগ্যনির্ভর করি, তখন আসলে আমরা সমাজকে বার্তা দিই—“চেষ্টা নয়, সুযোগই সব।” আবার শুধুমাত্র মেধাভিত্তিক কঠোর প্রতিযোগিতাও সমাজকে নির্মম করে তোলে, যেখানে মানবিকতা হারিয়ে যায়।
তাই প্রয়োজন এমন একটি নীতিমালা, যা শিশুদের ন্যায়বোধ, আত্মবিশ্বাস ও সহমর্মিতা—এই তিনটি গুণ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

ভর্তি বিতর্কে একপক্ষ মেধার, অন্যপক্ষ ভাগ্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, তাহলে এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। ভাগ্য-নির্ভর লটারি বা মেধা-নির্ভর পরীক্ষা—কোনোটিই এককভাবে পরিপূর্ণ নয়।

ভর্তি প্রক্রিয়া এমন হতে হবে, যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে, কিন্তু সুযোগও থাকবে পরিশ্রমের ফল পাওয়ার। শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই ভারসাম্যপূর্ণ নীতির উপর, যা একই সঙ্গে শিশুর আনন্দ ও মেধার বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে।

২০২৬ সালের ভর্তি নীতিমালা তাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যবোধ নির্ধারণেরও এক পরীক্ষা।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/৩১/১০/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading