।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা—একসময় ছিল সংস্কৃতি, রাজনীতি ও নাগরিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শহর যেন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই শহরের কোনো না কোনো মোড়ে, প্রেসক্লাবের সামনে, শাহবাগে কিংবা শহীদ মিনারে দেখা যায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের। কারও দাবি চাকরি, কারও বেতন বৃদ্ধি, কারও এমপিওভুক্তি, আবার কারও সরকারি স্বীকৃতি। যেন দাবি-দাওয়ার এই রাজধানীতে এখন আর শান্তির জায়গা নেই। যে শহর একসময় সংগ্রামের প্রতীক ছিল, সেটি এখন হয়ে উঠছে বিশৃঙ্খলার প্রতীক।
গত ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় বেসরকারি শিক্ষকদের আন্দোলন। প্রথমে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান, পরে শহীদ মিনারে টানা আট দিন অনশন। তাদের দাবি ছিল—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি, এবং সরকারি চাকরিজীবীদের মতো সুযোগ-সুবিধা। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার পর সরকার আংশিকভাবে তাদের দাবি মেনে নেয়। কিন্তু এই আন্দোলনের মধ্যেই দেখা গেল এক ধরনের “প্যাটার্ন”—যে কেউ দাবি জানাতে চায়, সে রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসছে।
শিক্ষকদের পর এবার আন্দোলনে নেমেছেন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। তারা শাহবাগে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তাদের চাকরির দাবি নিয়ে। অন্যদিকে নন-এমপিও মাদ্রাসা শিক্ষকরা প্রেসক্লাবে নিয়মিত মানববন্ধন করছেন। আবার কখনও কখনও রাস্তায় বসে থাকা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের এই দাবির মিছিল মিলেমিশে এক অচল নগরে পরিণত করছে ঢাকা শহরকে।
বর্তমান সময়ের আন্দোলনগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—দাবি আদায়ের মাধ্যম হিসেবে “মানববন্ধন” বা “সড়ক অবরোধ” সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রেসক্লাব বা শাহবাগ এলাকায় প্রতিদিনই একাধিক সংগঠন মানববন্ধন করছে। কারও দাবির সঙ্গে অন্যের দাবি মেলে না, কিন্তু সবাই একই রকম স্লোগান তোলে—“আমাদের দাবি মেনে নিতে হবে।”
মানববন্ধন এখন শুধু প্রতিবাদের নয়, বরং “দৃষ্টি আকর্ষণের” হাতিয়ার। দাবি যতোই যৌক্তিক হোক না কেন, রাজধানীর মূল সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করলে তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীর জীবন বিপন্ন হয়, সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। তবু আন্দোলনকারীরা ভাবেন—ঢাকায় রাস্তায় নামলেই মিডিয়ার নজর পড়বে, আর তাতেই সরকার নড়েচড়ে বসবে।
রাজধানীজুড়ে চলমান এই ধারাবাহিক আন্দোলনে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন। প্রতিদিনই তাদের দায়িত্ব থাকে প্রেসক্লাব, শাহবাগ, জাতীয় প্রেসক্লাব, অথবা শিক্ষা ভবনের আশপাশে আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা। কখনও তাদের হাতে থাকে লাঠি, কখনও ব্যারিকেড। কিন্তু অনেক সময় আন্দোলনকারীদের উত্তেজনা ও রাস্তায় বসে পড়ার প্রবণতার কারণে পুলিশও অসহায় হয়ে পড়ে।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা এমনিতেই জটিল, তার ওপর প্রতিদিনের আন্দোলন-অবরোধ পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। ফলে পুলিশ বাহিনী যেমন ক্লান্ত, তেমনি নাগরিকরাও বিরক্ত। অথচ সরকার বা আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এই অব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্দোলন মানেই ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও অধিকারের সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান—সবই আমাদের গর্ব। কিন্তু বর্তমানে “আন্দোলন” শব্দটি যেন তার মহিমা হারাচ্ছে। আজকাল আন্দোলনের অর্থ দাঁড়িয়েছে, “চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায় করা।”
যে কোনো দাবি, তা যত ছোটই হোক না কেন, প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে “রাস্তায় নামা।” এ এক নতুন সংস্কৃতি—“দাবি মানলেই শান্তি, না মানলে আন্দোলন।”
ফলে কেউ সরকারকে বুঝিয়ে, আলোচনা করে, নীতিগতভাবে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে না। সবাই ভাবছে—আন্দোলন করলেই দাবি পূরণ হবে।
এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক। কারণ এতে প্রশাসনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি হয়, আর জনগণ আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি হারায়।
সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের দাবি শোনা এবং যৌক্তিক দাবি পূরণের ব্যবস্থা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সরকার অনেক সময় “চাপের মুখে” সিদ্ধান্ত নেয়। এতে একদিকে আন্দোলনকারীরা সাহস পায়—“দাবি আদায়ের পথ আন্দোলনই”—অন্যদিকে সরকার নিজেই এক ধরনের নীতি-অসঙ্গতিতে পড়ে।
যদি সরকারের নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হতো, কে কোন দাবিতে কিভাবে আবেদন করবে, কোথায় যাবে, কতদিনের মধ্যে সমাধান হবে—তাহলে হয়তো মানুষ রাস্তায় নামত না। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই মানুষকে আন্দোলনের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের অনেক দপ্তরে অনিয়ম, দেরি, জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক অচলাবস্থা মানুষকে হতাশ করছে। তারা মনে করছে, দাবি আদায়ের একমাত্র পথ হলো মিডিয়ার নজরে আসা, আর তা সম্ভব কেবল রাস্তায় নামলে।
ঢাকা শহরে এখন প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো জায়গায় সড়ক বন্ধ থাকে। কোনো দিন শিক্ষক, কোনো দিন ছাত্র, কোনো দিন পেনশনভোগী বা প্রতিবন্ধী সংগঠন। এতে নগরবাসীর জীবন একেবারে স্থবির হয়ে পড়ছে। সকাল-বিকাল অফিসে যাতায়াত করা মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়।
একটি শহর তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সড়ক, প্রশাসন, ও নাগরিক শৃঙ্খলা সমন্বিতভাবে কাজ করে। কিন্তু ঢাকায় এখন তার উল্টো চিত্র। শহরের কেন্দ্রস্থলগুলো আন্দোলনের মঞ্চে পরিণত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
একজন রিকশাচালক বা অফিসগামী কর্মচারীর কাছে আন্দোলনের আদর্শ বড় নয়—তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সময়মতো কাজে পৌঁছানো, সন্তানকে স্কুলে নেওয়া, অথবা অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রতিনিয়ত এসব কাজ ব্যাহত হচ্ছে এই ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে।
দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার—এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই আন্দোলন যদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তবে তা গণতান্ত্রিক নয়, বরং স্বার্থান্বেষী হয়ে পড়ে।
এখন সময় এসেছে সরকার, নাগরিক সমাজ, ও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর একসঙ্গে বসে “বিকল্প পদ্ধতি” খোঁজার।
অনলাইন পিটিশন বা ডিজিটাল আবেদন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে মানুষ সহজেই সরকারের কাছে দাবি জানাতে পারবে।
প্রেসক্লাব বা শাহবাগের পরিবর্তে নির্ধারিত “প্রতিবাদ অঞ্চল” তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে সীমিত সময়ে অনুমতি নিয়ে কর্মসূচি পালন করা যাবে।
প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে “দাবি পর্যবেক্ষণ সেল” চালু করা যেতে পারে, যাতে সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।
এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো মানুষ আন্দোলনের বদলে সংলাপ ও আলোচনা বেছে নেবে।
অনেকে মনে করছেন, সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে—না হলে সবাই রাস্তায় নামবে। কিন্তু কঠোরতা কখনও টেকসই সমাধান দিতে পারে না। বরং এতে সামাজিক ক্ষোভ বাড়ে, দমননীতি জন্ম দেয় নতুন প্রতিবাদের।
সমাধান হলো ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলা। যদি মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে সরকারের নীতি স্বচ্ছ এবং সঠিক, তাহলে তারা রাস্তায় নামবে না।
ঢাকা আজ সত্যিই আন্দোলনের শহরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন দাবি, নতুন মানববন্ধন, নতুন স্লোগান—কিন্তু সমাধান আসছে না। আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও, তা যখন জনদুর্ভোগের কারণ হয়, তখন তা সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে।
এই বিশৃঙ্খলার জবাব দিতে হলে সরকার, আন্দোলনকারী এবং নাগরিক—সব পক্ষকেই আত্মসমালোচনা করতে হবে।
সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে হবে, আন্দোলনকারীদের জানতে হবে কোথায় সীমা টানতে হবে, আর নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে যাতে তাদের অধিকার অন্যের কষ্টের কারণ না হয়।
ঢাকা যদি আবার সংস্কৃতি ও মানবতার শহর হয়ে উঠতে চায়, তবে এখনই প্রয়োজন সংলাপ, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের পুনর্জাগরণ।
নইলে রাজধানী ঢাকার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে—“আন্দোলনের শহর, বিশৃঙ্খলার প্রতীক।”
শিক্ষাবার্তা /এ/ ২৯/ ১০ /২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
