অব্যাহতি চাইলেন মাউশি ডিজি, প্রত্যাহারের উদ্যোগ মন্ত্রণালয়ের, নেপথ্যে কী? 

আল আমিন হোসেন, মৃধা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদন করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান।

মঙ্গলবার রাতে বিষয়টি শিক্ষাবার্তা’কে নিশ্চিত করেছেন মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ। এদিন বিকেলে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে অব্যাহতির আবেদন পাঠিয়েছেন।

এর আগে গতকাল সোমবার আলোচনা শুরু হয় মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে। কারণ, গতকালই এ পদে নিয়োগ দিতে আবেদন আহ্বান করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের পর তিনি নিজ থেকেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলেন। বিষয়টি তার ক্ষেত্রে আত্মসম্মানের বলছেন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা।

তবে অব্যাহতির আবেদনে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান লিখেছেন, ‘মাউশির মহাপরিচালক পদে বিগত ২০/০২/২০২৫ খ্রি. তারিখ যোগদান করে অদ্যাবধি কর্মরত আছি। স্বাস্থ্যগত কারণে আমার পক্ষে দায়িত্ব পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই আমি মহাপরিচালকের দায়িত্ব হতে অব্যাহতির আবেদন করছি।’

মাউশির ডিজির পদটি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শীর্ষ পদ। এভাবে আবেদন আহ্বান করে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগকে নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, মাউশির মহাপরিচালক পদে কাজ করতে আগ্রহী বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৬তম এবং তদূর্ধ্ব ব্যাচের কর্মকর্তারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্তসহ অফলাইনে (সশরীর) আবেদন করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। আগ্রহী প্রার্থীকে সৎ, দায়িত্বপরায়ণ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ হতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর থাকা আবশ্যক।

গত বছরের ডিসেম্বরে মাউশি মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক এ বি এম রেজাউল করীম। তিনি অবসরে যাওয়ার পর গত ৩০ জানুয়ারি এ পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন রসায়নের অধ্যাপক এহতেসাম উল হক। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর আওয়ামী লীগের ভোল্ট পাল্টিয়ে এন্ট্রি আওয়ামী লীগ সাজার চেষ্টা করা, শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ পদ থেকে প্রত্যাহার হওয়া ও বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুচর হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ড. এহতেসাম উল হককে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নতুন মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্বে) হিসেবে পদায়ন পান অধ্যাপক এহতেসাম উল হক। এ নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি ডিজি পদে পদায়ন পাওয়ার পরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে প্রত্যাহার হওয়া ব্যক্তিই মাউশির নতুন ডিজি শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে। তারপর বিএনপির শিক্ষক সংগঠন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করে ডিজির প্রত্যাহারের দাবিতে। পরে দাবির মুখে নিয়োগ দেওয়ার মাত্র ২০ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তখন তাঁকে ওএসডি করা হয়। এরপর জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানকে মাউশির নতুন মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) করা হয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

 অধ্যাপক ড. আজাদকে ডিজির পদ থেকে প্রত্যাহারের উদ্যোগের নেপথ্যে কী ? 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ আজাদ খানের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকেরা সন্তুষ্ট নন। এ জন্য তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। এ অবস্থায় এ পদে তদবির করে যেনতেন ও অভিযুক্ত কেউ যাতে নিয়োগ পেতে না পারেন, সে জন্য সাক্ষাৎকার ও যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দিতেই এই আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। 

আসলেই কী আজাদ খানের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকেরা সন্তুষ্ট নন, না মূল ঘটনা অন্য কিছু?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক আবু কাজী কাইয়ুম শিশির মাউশি ডিজির চেয়ারে অধিষ্ঠিত হবার আশায় দীর্ঘদিন ধরে তদবির চালাচ্ছিলেন। পাঁচ আগস্টের পরে সর্বপ্রথম পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে পদায়ন পাওয়ার পরে মাত্র তিন মাসের মাথায় ঘুষ দুর্নীতির দায়ে তাকে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ছয় মাসের মাথায় ফের মন্ত্রণালয়ে একটি পদায়ন চক্রের হাত ধরে মাউশির পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইং) পদে পদায়ন নেন। মাউশির পরিচালক পদ বাগানোর পর নিজের ইচ্চেমত শোকজ ও তদন্ত করতে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী মাউশির সব কর্মকাণ্ডে মাউশির মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন কিন্তু অধ্যাপক শিশির কোনো নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছে মত কর্মকাণ্ড করতে থাকেন এবং মহাপরিচালকের সাথে বিবাদে জড়ান। এ নিয়ে সর্বপ্রথম গত ১৪ জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘শিক্ষা ক্যাডারের আবু কাইয়ুম শিশিরই যেন শিক্ষা উপদেষ্টা, মাউশি ডিজি তার ‘অধীনস্থ’!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর গত ২০ জুলাই ‘আরও বেপরোয়া মাউশির পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশিরএবং ২০ আগস্ট ‘‘খালেদা জিয়া’কে পুঁজি করে চাঁদাবাজি করা শিশির হতে চান এনসিটিবির চেয়ারম্যান‘ শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হয়। শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর পত্রিকাটির প্রতিবেদক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার মানহানি মামলা করেন অধ্যাপক কাজী শিশির। আর এই মামলাটি করেন মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পক্ষ থেকে। নিয়মানুযায়ী কোনো দপ্তরের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে সেই দপ্তরের প্রধানের নিকট থেকে অনুমোদন নিতে হয় এবং মামলায় স্বশরীরে উপস্থিতির জন্য ছুটি নিতে হয়। কোনো অনুমোদন না নিয়ে এই কর্মকাণ্ড করায় আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৮ সেপ্টবর তাকে  শোকজ করে মাউশি মহাপরিচালক। একই দিন অধ্যাপক কাজী কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগে তদন্তের চিঠি ইস্যু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

জানা গেছে, শিশিরের সাথে বিবাদের কারণে (শিশিরের অপকর্ম নিয়ে বিবাদ) বিভিন্ন তদবির ও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় গত ১৭ এপ্রিল, ২০২৪ জামালপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত মুজিবনগর দিবস উপলক্ষ্যে এক প্রেজেন্টেশনে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে দেওয়া এক বক্তৃতার ভিডিওতে শেখ মুজিবের বন্দনা করা হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আজাদের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ প্রকাশ করে এবং সেই সংবাদ বিভিন্ন দপ্তরে দিয়ে অপপ্রচার চালান। এর আগে গত আগস্ট মাসে অধ্যাপক আজাদ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকলে অসুস্থতার সময়ে নজিরবিহীনভাবে বিতর্কিত পরিচালক অধ্যাপক শিশির তার নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পেতে নিজেই একটা আবেদন নিয়ে হাজির হন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তবে সে যাত্রায় সে না পারলেও এবার মন্ত্রণালয় কর্তৃক তার নানা অপকর্মের অভিযোগ তদন্তাধীন অবস্থাতেই তিনি ব্যাপক তদবির চালান ডিজির চেয়ারের জন্য। কোনো অনিয়ম না করেও অধ্যাপক ড. আজাদকে ছাড়তে হলো ডিজির পদ অন্যদিকে নানা অপকর্ম করেও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন অধ্যাপক শিশির। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আজাদ খান কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি। তিনি আল্লাহর উপরে বিচারের ভাড় ছেড়ে দিয়েছেন। 

শিক্ষাবার্তা ডটকম/এএইচএম 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.