স্বস্তির দরজা খুললেও সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বহুদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বদলির সুযোগ চালু করল সরকার। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা ২০২৬’ জারির মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে, যা তাদের পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত বাস্তবতায় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। এত দিন একই প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর কর্মরত থেকে পারিবারিক দূরত্ব, যাতায়াতের দুর্ভোগ ও মানসিক চাপ সামলে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে অসংখ্য শিক্ষককে। নতুন নীতিমালার ফলে সেই কঠিন বাস্তবতা বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নীতিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে তৈরি সফটওয়্যারের মাধ্যমে ঘরে বসেই বদলির আবেদন করা যাবে; জানা যাবে শূন্যপদের সুনির্দিষ্ট তথ্য। এতে তদবির, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি নারী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার, নিজ জেলা বা স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থলকে বিবেচনায় রাখার বিধান নীতিমালাটিকে মানবিক মাত্রাও দিয়েছে।

তবে স্বস্তির এই দরজা খুললেও সামনে রয়েছে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ। চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার বদলি এবং প্রতিবারের মধ্যে অন্তত দুবছর একই প্রতিষ্ঠানে থাকার শর্ত অনেকের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছেÑ অভিজ্ঞ শিক্ষকরা শহরমুখী হলে গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষক সংকটে পড়তে পারে। এ ছাড়া স্থানীয় পরিচালনা কমিটির প্রভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও হবে বড় পরীক্ষা।

নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হলো ডিজিটাইজেশন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করবে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষকরা ঘরে বসেই বদলির আবেদন করতে পারবেন। জালিয়াতি ও জটলা এড়াতে কোন স্কুলে কোন বিষয়ে কতটি পদ খালি আছে, তা আগেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। তবে ইচ্ছে করলেই ঘন ঘন বদলি হওয়া যাবে না। একজন শিক্ষক তার পুরো চাকরিকালে সর্বোচ্চ তিনবার বদলি হতে পারবেন। প্রথমবার চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর এবং পরবর্তী প্রতি বদলির পর অন্তত দুই বছর একই স্কুলে চাকরি করা বাধ্যতামূলক। তবে বদলির ক্ষেত্রে নিজ জেলা অথবা স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থলকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

একই শূন্যপদের জন্য একাধিক শিক্ষক আবেদন করলে যোগ্যতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকদের সবার আগে সুযোগ দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বর্তমান স্কুল থেকে দূরত্বের হিসাব, স্বামী বা স্ত্রীর জেলার দূরত্ব এবং শিক্ষকের চাকরির বয়স (জ্যেষ্ঠতা) দেখা হবে। তবে ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি স্কুল থেকে বছরে সর্বোচ্চ দুজন এবং এক বিষয়ে একজনের বেশি শিক্ষককে বদলি করা হবে না।

নীতিমালা প্রসঙ্গে মিরপুর আইডিয়াল হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষিকা রাবেয়া সুলতানা বলেন, এই নীতিমালা বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি নিয়ে আসবে। দূরদূরান্তে যাতায়াতের ক্লান্তি ও পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট দূর হলে শিক্ষিকারা ক্লাসরুমে নিজেদের সেরাটা দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, অনলাইন বদলির ফলে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের কালো অধ্যায় বন্ধ হবে। শিক্ষকরা পারিবারিক মেলবন্ধনে থেকে কাজের সুযোগ পাওয়ায় শিক্ষার মান বাড়বে। তবে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবেদন করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সব অভিজ্ঞ শিক্ষক নিজ জেলার আকর্ষণে শহরমুখী হলে গ্রামের স্কুলগুলোর শিক্ষার মান ধসে পড়ার শঙ্কা থাকবে। এ ছাড়া জীবনে মাত্র তিনবার বদলি এবং প্রতিবার দুই বছরের কঠিন শর্ত জরুরি প্রয়োজনে অনেকের জন্য বড় বাধা হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতি ছাড়া এই নীতিমালার বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনায় শতভাগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন গ্রামের শিক্ষার্থীরা দক্ষ শিক্ষক থেকে বঞ্চিত না হয়।

রামপুরা আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ ড. আনিসুর রহমান বলেন, বছরে সর্বোচ্চ দুজন বদলি হওয়ার নিয়মটির কারণে অনেক সময় এক বিষয়ে শিক্ষক সংকট দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া স্থানীয় পরিচালনা কমিটির (গভর্নিং বডি) প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে অনলাইনে বদলি হলেও শিক্ষকরা ছাড়পত্র পাবেন না।

সর্বোপরি, বেসরকারি শিক্ষা খাতের এই বদলি নীতিমালা কেবল একটি কাগুজে নিয়ম নয়, এটি শিক্ষকদের আত্মমর্যাদার প্রতীক। সরকারি এই উদ্যোগ তখনই পুরোপুরি সফল হবে, যখন এর ডিজিটাল ব্যবস্থা দুর্নীতিমুক্ত থাকবে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী কমিটির অনীহা দূর করা যাবে।- সূত্রঃ আমাদের সময়

শিক্ষাবার্তা /এ/ ০৭/০৫/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.