।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় “শ্রেণিকক্ষ থেকে অফিসে নিয়ে পেটানো হলো শিক্ষককে” এই শিরোনামে একটা নিউজ প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি জয়পুরহাটের পাঁচবিবির রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের। এটা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের গভীর সংকট ও অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। শ্রেণিকক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে শিক্ষককে বের করে অফিসে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো—এমন ঘটনা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। অথচ বাংলাদেশে এমন দৃশ্য বারবার ঘটছে। শিক্ষকরা যাদের হাতে আগামী প্রজন্ম গড়ে ওঠে, তারাই বারবার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বলি হচ্ছেন।
এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম ও তার আত্মীয়রা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—চাঁদাবাজি ও পূর্বশত্রুতার জেরে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষককে প্রকাশ্যে মারধর করা। শিক্ষক সাইদার রহমানকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন:শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি এখন আর নিরাপদ নয়? রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা কি ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষককে অপমান করতে পারে? রাষ্ট্র ও প্রশাসন কি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ?
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষক ছিলেন সমাজের আলোকবর্তিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষকরা ক্রমেই লাঞ্ছিত, অপমানিত ও নির্যাতিত হচ্ছেন। কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, কোথাও ছাত্ররাজনীতি, আবার কোথাও অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষ—সবাই শিক্ষকদের টার্গেটে পরিণত করছে।
কয়েক মাস আগেও কিশোরগঞ্জে বেতনের টাকার জন্য শিক্ষককে গালাগাল ও মারধরের ঘটনা ঘটেছিল।
গাজীপুরে শিক্ষককে লাঠিপেটা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা আহত করেছিল।
বরিশালে হিজাব ইস্যুতে এক নারী শিক্ষককে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়।
এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তা এখন চরম সংকটে। একসময় যিনি সমাজে “গুরুজন” হিসেবে শ্রদ্ধা পেতেন, আজ তিনি “ক্ষমতার খেলায়” অবমাননার শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় রাজনীতির প্রভাববলয়ে চলে এসেছে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রবেশ করেন, তাদের ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ, বরাদ্দ বণ্টন, এমনকি দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও হয়। ফলে শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।
রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনাটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম শুধু জন প্রতিনিধি নন, বরং তিনি স্থানীয় ক্ষমতার প্রতীক। তিনি মনে করেন, বিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষককে অপমান করার অধিকার তার আছে। কারণ তিনি জানেন—তার বিরুদ্ধে আইন প্রক্রিয়া হবে ধীরগতি ও দুর্বল।
শিক্ষককে মারধর করা মানে কেবল একজন মানুষকে আহত করা নয়; এর মাধ্যমে সমাজের মূল্যবোধ ও শিক্ষার ভিত্তিকে আঘাত করা। একটি প্রবাদ আছে—“যে জাতি শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সে জাতি কখনো উন্নত হয় না।” বাংলাদেশে শিক্ষকরা বারবার অপমানিত হচ্ছেন, অথচ সমাজের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক নীরব।
এই নীরবতা আসলে শিক্ষার প্রতি আমাদের অবহেলা এবং শিক্ষকতার পেশাকে তুচ্ছ করার মানসিকতার প্রতিফলন। সমাজ যখন শিক্ষককে আর আলোকবর্তিকা নয়, বরং দুর্বল পেশাজীবী হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন এই ধরনের নির্যাতন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেল এই ঘটনায় মামলা নেওয়া এবং একজনকে আটক করা হয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় শুধু মামলা নিলেই চলবে না, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে একপ্রকার ‘লোকাল ইস্যু’ হিসেবে ধামাচাপা দেওয়া হয়। অথচ শিক্ষক নির্যাতন একটি জাতীয় সংকট।
প্রধান শিক্ষক নিজেই স্বীকার করেছেন, “আমরা শিক্ষক-কর্মচারী সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।” এই উক্তি ভয়াবহ। বিদ্যালয়—যা হওয়া উচিত শান্তি ও শিক্ষার স্থান—সেটি যদি ভয় ও সন্ত্রাসের জায়গায় পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে?
শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে তাদের শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে পেটানো হচ্ছে। এ ঘটনা তাদের মনে কী বার্তা দেবে?—
“শিক্ষক আসলে সম্মানের নয়।”
“ক্ষমতাশালী হলে যেকোনো অন্যায় করা যায়।”
“হিংস্রতাই সমাধান।”
ফলে শিক্ষার্থীরা সহিংস সংস্কৃতি শিখে ফেলে। সমাজের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার জায়গাই যদি সহিংসতার আখড়ায় পরিণত হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি খুবই গভীর। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলে সাধারণত শাস্তি পান না। ফলে তাদের দুঃসাহস বাড়তে থাকে। জয়পুরহাটের ঘটনাও যদি শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়, তবে অন্য মেম্বার, চেয়ারম্যান কিংবা ছাত্রনেতারা আরও বেপরোয়া হবে।
শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর আইন থাকলেও তা প্রয়োগ করা হয় না। “শিক্ষক সুরক্ষা আইন” কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব।
শিক্ষক নির্যাতন প্রতিরোধে এখনই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিশেষ আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তা কার্যকর করতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী এবং শিক্ষকদের জন্য হেল্পলাইন চালু করতে হবে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করা ছাড়া শিক্ষকরা কখনো নিরাপদ হবেন না। শিক্ষক নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুধু শিক্ষক সমাজ নয়, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে সোচ্চার হতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শিক্ষককে টেনে নিয়ে গিয়ে মারধর করা শুধু একজন শিক্ষকের উপর হামলা নয়—এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আঘাত। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে শিক্ষকরা হতাশ, নিরুৎসাহিত এবং আত্মমর্যাদাহীন হয়ে পড়বেন। যে শিক্ষক নিজের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত, তিনি আর শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, মূল্যবোধ বা নৈতিকতা শেখাতে পারবেন না।
আজ তাই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষক মর্যাদা রক্ষার জন্য একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। অন্যথায় আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলব, যারা তাদের শিক্ষকের অপমানকে স্বাভাবিক মনে করবে। আর যে জাতি শিক্ষকের সম্মান দিতে জানে না, সে জাতি কখনোই সত্যিকার অর্থে আলোকিত হতে পারে না।
লেখক: যুগ্ম-মহাসচিব
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।
sayedzamanwlfsac@gmail
শিক্ষাবার্তা /এ/২৮/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
