আশ্বাসে নয়, অধিকার চাই: শিক্ষকদের ২০ শতাংশ ভাতার লড়াই

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষার মানের প্রশ্নসহ অসংখ্য সমস্যা প্রতিনিয়ত আলোচনায় আসে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়—যারা আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলছেন, সেই শিক্ষকরা কি নিজেদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন? তাদের বেতন, ভাতা ও জীবনমান কি রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

বর্তমান সময়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। তাদের দাবি—২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধি। সরকার দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যকর পদক্ষেপের দেখা মেলেনি। ফলে শিক্ষকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে, আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারী এমপিওভুক্ত আছেন। এরা দেশের প্রাথমিক ( শহরে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাথমিক থেকে শুরু) মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের একটি বড় অংশকে শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু তাদের বেতন কাঠামো রাষ্ট্রীয় শিক্ষক-কর্মচারীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শিক্ষক পরিবারের জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দ্বিগুণ হলেও শিক্ষকদের বেতন প্রায় একই জায়গায় থেমে আছে প্রায় ১৭/১৮ বছর ধরে কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে অনেক পানি যমুনায় গড়িয়েছে। কিন্তু একটা কানাকড়িও বাড়েনি। ফলে অনেকে বাড়ি ভাড়া, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে গিয়ে নুন আনতে পান্থা ফুরানোর অবস্থায় পড়ছেন।

শিক্ষকতা পেশা একসময় সম্মানের জায়গায় ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক অনটনের কারণে অনেক মেধাবী মানুষ আজ এই পেশায় আসতে অনাগ্রহী। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানের ওপর।

বাংলাদেশে যেকোন চাকুরীজীবিদের বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন খুব একটা নজরকাঁড়ার মতো নয়। কিন্তু শুধুমাত্র শিক্ষকদের আন্দোলনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ। প্রতিবার আন্দোলনের পর সরকার থেকে আশ্বাস আসে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এবারের দাবিও নতুন নয়। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

২০২৩ সালের শেষদিকে শিক্ষকরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মহাসমাবেশ করে বাড়ি ভাতা বাড়ানোর আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের আশ্বাস দিয়েছিল যে বিষয়টি দ্রুত সমাধান হবে। মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির একটি ড্রাফট তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে জটিলতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে, আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে—এমন এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফাঁদে আন্দোলন যেন বারবার থমকে যায়।

এটি শিক্ষকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক ধরনের ‘আশ্বাসের রাজনীতি’। যেখানে প্রতিশ্রুতির প্রাচুর্য থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপে ভাটা পড়ে।

মাউশির হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র স্কুল ও কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা দিতে বছরে প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। মাসিক হিসাবে এটি দাঁড়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কি রাষ্ট্রের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়? যদি তুলনা করা হয় বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প বা প্রশাসনিক খাতে ব্যয়ের সঙ্গে, তবে এ অর্থ কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেক বড় বড় প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বছরে ২,৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ কোনোভাবেই অতিরিক্ত মনে হওয়ার কথা নয়। বরং এটিকে রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

শিক্ষক জোট ইতোমধ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—১৪ সেপ্টেম্বর অর্ধদিবস কর্মবিরতি, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ১২ অক্টোবর থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি।

শিক্ষকদের এসব কর্মসূচি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তাদের আর কোনো উপায় নেই। কারণ বহু বছর ধরে শুধুই আশ্বাস পেয়ে তারা ক্লান্ত। এবার তারা আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চান।

যেকারণে  ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা জরুরি- বড় শহরগুলোতে শিক্ষকরা ভাড়া বাসায় থাকেন। বর্তমান বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে তাদের ভাতা কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শিক্ষকরা সমাজ গড়ার কারিগর। তাদের জীবনযাত্রা মানবেতর হলে এ পেশার প্রতি সম্মান ও আকর্ষণ কমে যাবে।

 অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় জর্জরিত শিক্ষক কখনোই শিক্ষার্থীদের প্রতি শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেন না। ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে শিক্ষার মান স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হবে।
 সরকারি চাকরিজীবীরা নিয়মিত ভাতা বৃদ্ধি পান। অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সবসময় উপেক্ষিত। এটি বৈষম্য তৈরি করে।

শিক্ষা কোনো দান নয়, এটি মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন শিক্ষকরা। তাই তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কেবল বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করলেই উন্নয়ন টেকসই হয় না, বরং শিক্ষা খাতকে শক্তিশালী করলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

অর্থনীতির অনেক দিকেই অপচয় বা অকার্যকর ব্যয়ের নজির আছে। যদি সেগুলো কমিয়ে শিক্ষক ভাতা বৃদ্ধির অর্থ বরাদ্দ করা যায়, তবে রাষ্ট্রের জন্য কোনো সমস্যাই থাকবে না।

এখানে আরেকটি বিষয়ও প্রাসঙ্গিক—শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবি। বর্তমানে অনেক শিক্ষক মনে করেন, এমপিওভুক্ত পদ্ধতিতে তাদের ন্যায্য অধিকার কখনোই নিশ্চিত হবে না। তাই তারা জাতীয়করণের দাবিও জোরালো করছেন। জাতীয়করণ হলে তারা সরকারি শিক্ষকদের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবেন।

যদিও জাতীয়করণের প্রশ্নে আর্থিক বোঝার যুক্তি তুলে ধরে সরকার অনেক সময় পিছিয়ে আসে, তবুও এটিকে এড়িয়ে গেলে শিক্ষা খাতে বৈষম্য আরও বাড়বে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 যদি একসঙ্গে ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব না হয়, তবে ধাপে ধাপে এটি করা যেতে পারে।
 বার্ষিক বাজেটে শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা উচিত।
 দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষকরা নিয়মিত সুবিধা পান।

শিক্ষকরা আন্দোলন চান না, তারা শ্রেণিকক্ষে থাকতে চান। কিন্তু রাষ্ট্র যখন তাদের ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে, তখন তারা বাধ্য হন রাস্তায় নামতে। ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তাদের বাঁচার অধিকার।

অতএব সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—শিক্ষকদের বারবার আশ্বাস দিয়ে আস্থা হারানো, নাকি তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা।

শিক্ষকরা দেশের আলোকবর্তিকা। তাদের অধিকার নিশ্চিত করা মানেই শিক্ষা খাতকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া। তাই আজকের সময়ে মূল বার্তাটি স্পষ্ট—
“আশ্বাসে নয়, অধিকার চাই: শিক্ষকদের ২০ শতাংশ ভাতার দাবি কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের প্রাপ্য।”

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা/এ/২৪/০৯/২৫


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.