।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় বাংলাদেশের রাজনীতির ‘নার্সারি’। এখান থেকে জন্ম নিয়েছে জাতীয় পর্যায়ের বহু প্রভাবশালী নেতা, আন্দোলন ও মতাদর্শ। তাই ডাকসু নির্বাচন কেবল একটি ছাত্রসংসদ গঠনের বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও প্রতিফলন। এবারের ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা বেশ কিছু আলোচিত নেতা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তারা ভরাডুবির শিকার হয়েছেন। প্রশ্ন জাগে, এত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই ছাত্রনেতারা কেন নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হলেন?
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে যেসব শিক্ষার্থী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা শুরুতে শিক্ষার্থীদের কাছে ‘নায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। অনেকের প্রত্যাশা ছিল—এই নেতৃত্ব হয়তো ছাত্ররাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরি করবে, যা ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-শিবিরের মতো ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলোর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু অভ্যুত্থানের অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ঐক্য ভেঙে যায়। একদল নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে, অন্যরা ক্যাম্পাসে থেকে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ গঠন করেন। বিভক্তির এই প্রবণতা শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে।
শিক্ষার্থীরা ভেবেছিলেন—যারা একসাথে লড়াই করে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন, তারা ক্ষমতা বা পদবির লোভে এত দ্রুত বিভক্ত হয়ে পড়লেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাননি কেউই।
যে কোনো ছাত্রসংগঠনের শক্তি নির্ভর করে হলে ও তৃণমূলে তাদের ভিত্তি কতটা মজবুত তার ওপর। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ শুরুতেই ঘোষণা দিয়েছিল, তারা হলে বা একাডেমিক এলাকায় রাজনীতি করবে না। শিক্ষার্থীরা শুরুতে এই অবস্থানকে সাধুবাদ দিলেও নির্বাচনের সময় এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হলে কোনো কমিটি গঠন না করার কারণে তারা মাঠ পর্যায়ে শক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল হলে সক্রিয়ভাবে সময় দেয়, কমিটি গঠন করে, শিক্ষার্থীদের উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত রাখে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদেরকে ‘কাজের লোক’ হিসেবে চিনেছে। কেবল বড় বড় বক্তব্য বা অনলাইন প্রচারণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়নি।
ডাকসু নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল অভ্যন্তরীণ অনৈক্য। এক পদে একাধিক প্রার্থী দাঁড়ানো, প্যানেল গোছাতে ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা সংগঠনটিকে দুর্বল করেছে। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদেই তাদের পাঁচজন নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে ভোট ভাগ হয়ে যায় এবং শিক্ষার্থীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যায়—তারা এখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেননি।
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, যারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য রাখতে পারেন না, তারা কীভাবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেবে?
ইসলামী ছাত্রশিবির এবারের নির্বাচনে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। তারা জানাতে পেরেছে, জয়ী হলে কী কী করবে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের প্রার্থীরা এই প্রশ্নে ব্যর্থ হন। তাদের বক্তব্য ছিল অস্পষ্ট, বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ছিল নিয়মিত ঘটনা।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দেখতে চেয়েছিলেন—ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, একাডেমিক উন্নয়ন, আবাসন সংকট, নারীর নিরাপত্তা, গবেষণা সুবিধা, টিউশন ফি ইত্যাদি বিষয়ে তাদের অবস্থান কী? কিন্তু প্রার্থীরা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা দিতে ব্যর্থ হন। ফলে ভোটাররা মনে করেছেন, এরা কেবল আন্দোলনের তাত্ত্বিক নায়ক, বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—পরবর্তীতে তারা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, সুবিধাভোগী হয়েছেন। যদিও সবাই নয়, কিন্তু এই দায় গোটা সংগঠনের ওপর এসে পড়ে। শিক্ষার্থীরা মনে করেছেন, যাদের হাতে ক্ষমতা এলে তারা আদর্শ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত লাভে ব্যস্ত হয়, তাদের ভোট দেওয়া নিরাপদ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে ‘অঞ্চলভিত্তিক ভোট’ একটি বড় ফ্যাক্টর। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা সাধারণত সংগঠিতভাবে ভোট দেন। শিবির ও ছাত্রদল এ বিষয়ে সচেতন ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ প্রার্থী বাছাইয়ের সময় এই বিষয় বিবেচনায় নেয়নি। ফলে তারা কোনো আঞ্চলিক ভোটব্যাংক তৈরি করতে পারেনি।
একইভাবে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোট, নারী ভোটার ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট আকর্ষণেও তারা উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়। নারী নেত্রীরা কিছু হলে ভালো করলেও সেই প্রভাব কেন্দ্রীয় পদগুলোতে টানতে পারেননি কাদের বা বাকের।
নির্বাচনে মাঠের প্রচারণা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ মূলত অনলাইন প্রচারণায় নির্ভর করেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতায় অনলাইন প্রচারণা সীমিত প্রভাব ফেলে। হলে, ক্যান্টিনে, বিভাগে, ক্লাসে গিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। শিবির-ছাত্রদল এ ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল, কিন্তু গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ তা পারেনি।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। অভ্যুত্থানের পর তারা দ্রুত জনপ্রিয় হলেও, সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে তাদের বিভক্তি, কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা, কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি এবং অনভিজ্ঞ নেতৃত্বের কারণে।
এই পরাজয় অবশ্যই গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের জন্য বড় শিক্ষা। তারা যদি টিকে থাকতে চায়, তবে প্রথমেই প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব। সংগঠনের ভেতরে কোন্দল মেটানো, বিদ্রোহী প্রবণতা ঠেকানো এবং তৃণমূলে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি। হলে কমিটি গঠন না করলে কোনো ছাত্রসংগঠন সফল হতে পারে না—এ শিক্ষাটি তাদের নিতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে। কেবল আন্দোলনের স্মৃতিচারণ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
তাদের আরও বুঝতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি কেবল স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় টিকে থাকে না। দরকার মাঠে উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক চর্চা।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের এবারের ভরাডুবি প্রমাণ করেছে—কেবল আন্দোলনের নায়ক হলেই ছাত্ররাজনীতিতে সাফল্য আসে না। নেতৃত্বের আসল পরীক্ষার জায়গা হলো সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মপরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের নেতারা সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। তবে এই ব্যর্থতা যদি তারা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে তারা শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন।
ডাকসুর ফলাফলে একদিকে যেমন ইসলামী ছাত্রশিবির সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের ব্যর্থতা দেখিয়েছে—শুধু আলোচিত হওয়া যথেষ্ট নয়, আস্থা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, ঐক্য ও কর্মপরিকল্পনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
লেখা: সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা।
শিক্ষাবার্তা/ এ/ 24/০9/25
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
