।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসাস্থল—এই বিশ্বাসই সাধারণ মানুষকে সব কষ্ট সয়ে সেখানে ছুটে যেতে বাধ্য করে। কিন্তু আজ সেই ভরসা মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। হাসপাতালের মূল গেট থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত সক্রিয় এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট—দালালচক্র।
তারা রোগীকে বিভ্রান্ত করে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়, বিনামূল্যের ওষুধকে বাজারমূল্যে বিক্রি করে, আবার ভেতরের অসাধু কর্মচারীদের সঙ্গে মিলে সেবাকে পণ্য বানিয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করা হলেও শাস্তি সামান্য হওয়ায় কয়েকদিনের মধ্যেই তারা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। ফলে প্রশ্ন জাগে—দালালবৃত্তি কি এখন সরকারি হাসপাতালের অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে?
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পঙ্গু হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই এদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। গেট, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ—কোথাও তারা অনুপস্থিত নয়। রোগীদের বিভ্রান্ত করে বলা হয়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বা পরীক্ষা সম্ভব নয়, যন্ত্রপাতি নষ্ট, ডাক্তার দেখা যাবে না ইত্যাদি। এরপরই শুরু হয় প্রলোভন দেখানো—“চলুন প্রাইভেট হাসপাতালে, আজই অপারেশন হবে, কালকে বাড়ি ফিরবেন।”
গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে লেখাপড়া কম জানা গরিব রোগীরাই এদের সহজ শিকার। কেউ বিনামূল্যের ওষুধ না পেয়ে পাশের ফার্মেসি থেকে কিনতে বাধ্য হন, কেউ আবার লাইনে না দাঁড়িয়েই পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনে দেন দালালের মাধ্যমে। ফলে সরকারি হাসপাতালে ফ্রি বা স্বল্প খরচে সেবা পাওয়ার বদলে কয়েকগুণ খরচ করতে হয় তাদের।
এখানেই শেষ নয়। দালালদের একার পক্ষে এত বড় নেটওয়ার্ক চালানো সম্ভব নয়। হাসপাতালের ভেতরের অসাধু কর্মচারী, ওয়ার্ডবয়, আয়া, এমনকি নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গেও তাদের সরাসরি যোগসাজশ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্ব নেওয়া হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে, আর যদি লাইনে না দাঁড়িয়ে কাজ করতে চান তবে আরও টাকা। এসব টাকা ভাগাভাগি হয়ে যায় ভেতরের কর্মচারী ও দালালের মধ্যে। এক অর্থে এটি একটি সাংগঠনিক সিন্ডিকেট, যা সরকারি হাসপাতালকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে।
সময় সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায়। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে একসঙ্গে ২২ জন দালাল গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছিল। তাদের অনেককে মোবাইল কোর্টে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই তারা আবার বের হয়ে এসে আগের মতোই সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, এত বড় অপরাধের শাস্তি যদি হয় মাত্র ১৫ দিনের সাজা, তবে তারা ভয় পাবে কেন? বরং সাংবাদিকদের সামনেই দালালরা হাসতে হাসতে বলে বসে—“১৫ দিনের ব্যাপার তো, তারপর দেখা যাবে।”
একজন রোগীর স্বজন বলছিলেন, তার বোনের আলট্রাসনোগ্রাম জরুরি ভিত্তিতে করাতে হবে। টোকেন নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও কোথাও কাজ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকা দিয়ে এক দালালকে ম্যানেজ করতে হলো। তার প্রশ্ন ছিল—গর্ভবতী বোনকে নিয়ে আর কতবার ছুটোছুটি করা যায়? পত্রিকায় প্রকাশিত।
আরেকটি ঘটনায় দেখা গেছে, কুমিল্লা থেকে আসা এক পরিবার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ছানি অপারেশনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গেটেই তাদের ঘিরে ধরল এক দালাল, জানাল সরকারি হাসপাতালে অপারেশনের তারিখ পেতে এক মাস সময় লাগবে। সাথে সাথে প্রাইভেট ক্লিনিকে যাওয়ার প্রলোভন। রোগীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে দেড় লাখ টাকার বিল ধরানো হলো। পত্রিকায় প্রকাশিত।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, দালাল চক্র শুধু অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে না, বরং রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিলম্বিত চিকিৎসা কিংবা ভুল চিকিৎসা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দালাল টিকে থাকার কারণ; প্রতিদিন সরকারি হাসপাতালে রোগীর ঢল নামে। অনেক যন্ত্র নষ্ট, টোকেন সিস্টেম জটিল। পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্সের অভাব। কর্মচারী ও দালালের ভাগাভাগি। সর্বোচ্চ ১৫ দিনের শাস্তি, সহজে জামিন। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হন।
আমরা যদি কেবল দালালদের দোষ দিই, তবে ভুল করব। দায়ভার পড়বে প্রশাসনের ওপরও। হাসপাতালের পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবার সমন্বিত ব্যর্থতাই এ চিত্রের জন্য দায়ী। অভিযান একদিন হয়, প্রচার হয়, তারপর সব আগের মতোই চলতে থাকে।
দালাল মুক্ত করতে হলে- দালালির বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন টোকেন, স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষার তালিকা চালু করা জরুরি। হাসপাতালের প্রতিটি করিডর ও গেট নজরদারির আওতায় আনতে হবে। শুধু দালাল নয়, তাদের সহযোগী কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনকে এ বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে।
সরকারি হাসপাতাল দেশের সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়। কিন্তু যদি সেই আশ্রয়েই দালালদের দৌরাত্ম্যে রোগীরা হয়রানির শিকার হন, তবে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। দালাল শুধু একটি অসামাজিক উপদ্রব নয়, এটি আসলে রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। অভিযান চালালেই হবে না, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান, কঠোর আইন এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা। নাহলে হাসপাতালের গেটেই রোগীরা প্রতিদিন যে প্রহসনের শিকার হন, তা চলতেই থাকবে।
আর তখন মানুষের মুখে মুখেই থেকে যাবে সেই ব্যঙ্গাত্মক সত্য—
“দালাল থাকাটাই যেন হালাল!”
লেখক: যুগ্ম-মহাসচিব
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি।
শিক্ষাবার্তা /এ/১৪/০৯/২০২৫
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
