এইমাত্র পাওয়া

সাংবাদিকদের মামলা, হামলা ও ভয়ভীতি: দুর্নীতি আড়াল করা সম্ভব কি?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

সাংবাদিকতা সমাজের প্রতিচ্ছবি। এটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। সাংবাদিকরা সমাজের আয়না তুলে ধরেন—যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সত্য প্রকাশের জন্য তাদেরই শত্রুতার টার্গেট হতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হয়রানি, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা এমনভাবে বেড়েছে যে, এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং সমগ্র সাংবাদিক সমাজকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা।

সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত জীবনে বিপদ সৃষ্টি করছে না, বরং এটি সমাজের তথ্যপ্রাপ্তি ও গণতান্ত্রিক চর্চাকেও সীমিত করছে। তথ্যপ্রকাশ, দুর্নীতি উন্মোচন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা—এসবই সাংবাদিকদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই দায়িত্ব পালনের পথে তাঁদের ওপর হামলা, মামলা এবং হুমকি নেমে আসে, তখন তথ্যের স্রোতই বন্ধ হয়ে যায়। তথ্যের স্বাধীন প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে, দুর্নীতির অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সন্ত্রাসের চিত্র লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।

এ প্রসঙ্গে ১৭ জুলাই মাউশির পরিচালক আবু কাইয়ুম শিশিরের উদাহরণ লক্ষ্যণীয়। তিনি শিক্ষাবর্তার সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢাকা সিএমএম আদালতে ১০০ কোটি টাকা মানহানী মামলা করেন। কোনো সরকারি চাকরিজীবী যদি কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে চায়, তাহলে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠান পরিচালক হিসেবে তিনি আইন অমান্য করে মামলা করে থাকেন। এ ধরনের মামলার মাধ্যমে সাংবাদিকদের আতঙ্কিত করে সত্য প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি তিনি দুর্নীতির মামলায় দুদকের মামলা ফাঁকি দিয়ে, খালেদা জিয়ার উপর লেখা বই প্রকাশ ও এক কোটি টাকার চাঁদাবাজির মামলাকে রমনা থানায় প্রয়োগ করেন—যা স্পষ্টতই সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ সময়ে প্রায় ৫০০ সাংবাদিক হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। শুধু চলতি বছরেই অন্তত ১২৬ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। এই হামলার শিকারদের মধ্যে একজন নারী সাংবাদিক সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো বিভৎস নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। আগস্ট মাসে ৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, হুমকি, হত্যা ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। জুলাই মাসের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার খেলা নয়। এটি প্রমাণ করে যে, সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত ভয়, হুমকি এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা তাদের কাজের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতি করছে না; এটি পুরো সাংবাদিক সমাজকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে, তথ্যপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সমাজে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম ঢেকে রাখার একটি প্রক্রিয়া তৈরি করছে।

যখন সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়, মামলা হয় এবং তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে বাধা দেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সংবিধান অনুযায়ী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজ করে, সেই হিসেবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসন, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা প্রমাণ করছে যে, এই দায়িত্ব পালনে সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, হয়রানি বা হুমকি কখনোই কাম্য নয়। সাংবাদিক সমাজকে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে দিতে হবে। এজন্য প্রথমে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে এটি ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা ও হয়রানি কমাতে সহায়ক হবে।

সাংবাদিক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নও অত্যন্ত জরুরি। কমিশনের প্রস্তাবিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনি সুরক্ষা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সাংবাদিক সমাজকে শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সাংবাদিকদের বৈধ সুরক্ষা দেওয়া প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অঙ্গ।

বর্তমানে আত্মরক্ষার প্রশ্নেও সাংবাদিকদের বৈধ অস্ত্র বহনের অনুমতি প্রদানের দাবি উঠেছে। যদিও এটি বিতর্কিত, ক্রমবর্ধমান হামলার প্রেক্ষাপটে এটি অমূলক নয়। সাংবাদিকরা যদি সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে প্রাণ হারান, তবে সমাজে ন্যায় ও গণতন্ত্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পেশাগত নয়, এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকার পূর্বশর্ত।

সাংবাদিকদের উপর হামলা ও মামলা, ভয়ভীতি মূলত একটি বার্তা বহন করে—“সত্য প্রকাশ করলে ফল ভোগ করতে হবে।” এটি এক প্রকার মানসিক ও শারীরিক চাপের মাধ্যমে সমাজে একটি আতঙ্ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা স্বাভাবিকভাবে আত্মসংরক্ষণে মনোযোগী হন, ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দুর্নীতির তথ্য জনগণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। জনগণ যখন তথ্যহীন থাকে, তখন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম আরও নির্ভীকভাবে চালু থাকে।

তবে আমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারি যে, মামলা, হামলা বা ভয়ভীতির মাধ্যমে দুর্নীতি আড়াল করা সম্ভব? বাস্তবতা হলো—সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকরা সমাজের সচেতন চোখ। হামলা ও মামলা সাময়িকভাবে তথ্যপ্রকাশ বন্ধ করতে পারে, কিন্তু চিরকালীনভাবে সত্যকে স্তব্ধ করতে পারে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে তথ্যের স্বাধীনতা শক্তিশালী হয়, সেখানেই দুর্নীতি এবং অন্যায় উন্মোচন সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মামলা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ও সামাজিক মানককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাদের ওপর আক্রমণ ও হয়রানি করলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না; এটি পুরো সমাজে একটি ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। সাংবাদিকরা যদি তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে ভয় পান, তবে জনগণ সত্য জানতে পারে না। জনগণ যখন সত্য জানতে পারে না, তখন দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও অদৃশ্য হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু তাদের জন্য নয়, এটি পুরো সমাজের জন্য প্রয়োজন। সুরক্ষিত সাংবাদিক সমাজই একটি তথ্যসমৃদ্ধ, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ সমাজ গড়ে তুলতে পারে। যেখানে সাংবাদিকরা সাহসের সঙ্গে তথ্য প্রকাশ করতে পারে, সেখানে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা তাদের কার্যকলাপে সীমাবদ্ধ থাকে।

চতুর্থত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। সংবিধান অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ, মামলা বা হয়রানির ঘটনা রোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একইসঙ্গে আদালত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই সতর্ক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। দোষীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈধ অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। যদিও এটি বিতর্কিত, কিন্তু ক্রমবর্ধমান হামলা ও হয়রানির পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আত্মরক্ষার অধিকার রক্ষার জন্য এটি যৌক্তিক। আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হলে সাংবাদিকরা আরও নির্ভয়ে পেশাগত কাজ করতে পারবেন।

সবশেষে, সাংবাদিকরা সমাজের চোখ। তারা সত্য প্রকাশের মাধ্যমে সমাজকে সচেতন রাখে। যদি সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির মাধ্যমে তাদের কাজ সীমিত করা হয়, তবে সমাজ ও গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্নীতি ও অনিয়ম লুকানো সম্ভব হতে পারে সাময়িকভাবে, কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে এটি সম্ভব নয়। সমাজের সচেতন জনগণ, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকরা মিলিতভাবে সব সত্য উন্মোচন করে দুর্নীতির চক্র ভেঙে দিতে সক্ষম।

সুতরাং, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও ভয়ভীতি দমনের মাধ্যমে দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা একটি অস্থায়ী কৌশল মাত্র। সত্যের আলো চিরকাল বিজয়ী হয়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগ করা, সাংবাদিক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা এবং আত্মরক্ষার অধিকার প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। সাংবাদিকরা যদি নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তবেই সমাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় থাকবে।

লেখক: যুগ্ম- মহাসচিব 

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটি। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১৪/০৯/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.