এইমাত্র পাওয়া

সংরক্ষিত আসনের গণ্ডি পেরিয়ে: নারীর নেতৃত্ব বিকাশের লড়াই

।। নাজমা হোসেন লাকী ।। 

বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি সময় পেরিয়েছে। রাষ্ট্রের সংবিধান নারীর সমান অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দিয়েছে। বাস্তবে নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও রাজনীতির মঞ্চে তারা এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছতে পারেননি। বিশেষ করে সংসদে নারীর উপস্থিতি এখনো “সংরক্ষিত আসন” নির্ভর, যেখানে সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ নেই। এর ফলে নারী নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, নারীরা রাজনীতিতে প্রতীকী উপস্থিতি মাত্র হয়ে থাকছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথম থেকেই সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ছিল ১৫টি আসন, বর্তমানে তা ৫০-এ উন্নীত হয়েছে। তবে নারীরা এসব আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন তালিকা থেকেই তারা সংসদে প্রবেশ করেন। ফলে ভোটারদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান না, এলাকায় নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধ থেকে যান।

এ ব্যবস্থায় নারীরা কার্যত নির্ভরশীল থাকেন পুরুষ নেতৃত্বাধীন দলের ওপর। ফলে সংসদে তাদের ভূমিকা অনেকটাই প্রতীকী হয়ে পড়ে। তারা দলীয় নেতৃত্বের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন, কিন্তু জনগণের কাছে নয়। নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও জবাবদিহিতা। কিন্তু সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা নারীদের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নারীর নেতৃত্ব বিকাশে তেমন আগ্রহী নয়। সংরক্ষিত আসন নিয়ে আলোচনা করতে গঠিত একাধিক কমিশন নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু দলগুলো এতে সম্মত হয়নি। বরং বিদ্যমান ৫০টি আসন বহাল রাখার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

এর মূল কারণ হলো দলের ভেতরে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা। এখনো অনেক রাজনৈতিক নেতা মনে করেন রাজনীতি মূলত পুরুষের ক্ষেত্র। নারীরা নাকি কেবল শহরে সীমাবদ্ধ, তারা মাঠ পর্যায়ে লড়তে পারবেন না। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী, আন্তরিক এবং সহজেই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন।

কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো পুরুষ প্রার্থীর ক্ষেত্রে যেমন শ্রম, মেধা, অর্থ, সময় ব্যয় করে তাদের জনপ্রিয় করে তোলে, নারীদের জন্য তেমনটি করে না। ফলে নারীরা দলীয় কাঠামোর ভেতরেই প্রান্তিক থেকে যান।

নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পথে নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় বাধা। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় যাতায়াতের অসুবিধা, রাতে প্রচারণা চালাতে ঝুঁকি, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা—এসব কারণে নারীরা প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করতে দ্বিধায় ভোগেন। দলগুলোও তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয় না।

এছাড়া অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা। নারীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অর্থনৈতিক জোগান, জনবল সরবরাহ, প্রচারণার সুযোগ—এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে।

প্রায়ই বলা হয়, যথেষ্ট যোগ্য নারী প্রার্থী নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শত শত পুরুষ প্রার্থী কীভাবে তৈরি হয়? পুরুষদের যোগ্য করে তুলতে যেমন দল, পরিবার, সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করে, নারীদের ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগ নেই। ফলে নারীরা সমান সুযোগ পান না।

নারীর যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে আসলে তাদের পিছিয়ে রাখা হয়। অথচ নারী নেতৃত্ব বিকাশে সুযোগ ও সহায়তা পেলে তারা পুরুষদের মতোই যোগ্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম।

সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারিতে ছিলেন। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন, সাহসিকতার সঙ্গে ঝুঁকি নিয়েছেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর তাদের অনেককেই প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে আবারও পুরুষদের প্রাধান্য বেড়েছে।

এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ, কীভাবে নারীর অবদান স্বীকৃতি পায় না। বরং তাদের ভয় দেখিয়ে, আক্রমণ করে, প্রান্তিক করে রাখা হয়, যাতে তারা ভবিষ্যতে আর সরব না হতে পারেন।

নারীর নেতৃত্ব বিকাশে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, সমাজ এবং সংস্কৃতি এখনো নারীকে গৃহকেন্দ্রিক করে রাখার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করলে তাকে নানা সমালোচনা, কটূক্তি, গুজব ও মানসিক চাপের মুখে পড়তে হয়।

রাজনীতি যেহেতু এখনও পেশিশক্তি ও ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখা হয়, নারীদের সেখানে দুর্বল ভাবা হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর শক্তি নয়, দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। এভাবেই নারীদের প্রান্তিক করে রাখা হয়।

নারী নেতৃত্ব বিকাশ শুধু সংখ্যার বৃদ্ধি নয়, বরং তাদের ক্ষমতায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এজন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—

১. সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ

সংরক্ষিত আসন বিলুপ্ত করে নারী প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনি বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে।

২. রাজনৈতিক দলের ভেতর নারীর ক্ষমতায়ন

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নারীদের প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও প্রচারণায় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সহায়তা

প্রচারণার সময় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গ্রামীণ এলাকায় যাতায়াত, প্রচারণার সুযোগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াতে হবে।

৪. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি

মিডিয়া ও শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীর নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে হবে।

নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক ধারণা ভাঙতে প্রচারণা চালাতে হবে।

৫. গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ

নারী নেতৃত্ব বিকাশে কোথায় কোথায় গ্যাপ আছে তা নিরূপণ করে করণীয় ঠিক করতে গবেষণা করতে হবে।

এসব গবেষণার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করতে হবে।

নারী নেতৃত্ব বিকাশ মানে শুধু নারী নয়, গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ। সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিশু সুরক্ষা, নারীর অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব।

নারীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে পারেন, তাদের সমস্যা বোঝেন, সমাধান খোঁজেন। ফলে আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর প্রধান কারণ কাঠামোগত বৈষম্য, রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা।

নারী নেতৃত্ব বিকাশে সংরক্ষিত আসনকে সরাসরি নির্বাচনে রূপান্তর, রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন এবং আইনি বাধ্যবাধকতা জরুরি।

নারী নেতৃত্ব মানে কেবল নারীর অধিকার নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। তাই সময় এসেছে নারীদের প্রতীকী উপস্থিতি নয়, বরং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার। নারী নেতৃত্ব বিকাশে বাধা দূর করতে হলে রাজনৈতিক দল, সরকার, সমাজ ও পরিবার—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী। 

শিক্ষাবার্তা /এ/১৪/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.