শিক্ষায় জালিয়াতি: দায় শুধু শিক্ষকের নয়, প্রশাসনেরও!

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

সাম্প্রতিক সময়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষক এর জাল সনদ নিয়ে তথ্য পেয়েছে । এটি একটি উদ্বেগজনক চিত্র, কারণ এর আগে গত কয়েক বছরে ৬৭৮ জন শিক্ষককে শনাক্ত করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সুপারিশ করা হয়।

জানুয়ারি–জুন ২০২৫ পর্যন্ত ডিআইএ পরিদর্শন করেছে ২,৭৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান । এর মধ্যে ৩০০‑৩৫০ জন শিক্ষক জাল সনদের মাধ্যমে চাকরি করেছেন বলে প্রাথমিক তথ্য প্রতিবেদন করেছে ।

পূর্ববর্তী সময়ে ২০২১‑২৩ সালে ১৫৪ জন, তার আগে ৬৭৮ জন শিক্ষককে শনাক্ত করা হয়েছিল । মে ২০২২ পর্যন্ত একক সময়ে ১,১৫৬ জন শিক্ষক শনাক্ত করা হয়েছিল, যাতে ৭৯৩ জন জাল NTRCA সনদ, ২৯৬ জন কম্পিউটার শিক্ষার ভুয়া সনদ, ৬৭ জন বিএড বা অন্যান্য সনদ জাল ছিল । 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জাল সনদের সমস্যা নতুন নয়, তবে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এটি মহামারী আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দলীয় লোকদের সরকারি সুবিধাভোগী করার প্রবণতাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট অনেক ব্যক্তি অবৈধভাবে শিক্ষকতার পদে প্রবেশ করেছে জাল সনদের মাধ্যমে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের অভাব, প্রশাসনের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক চাপের কারণে এই অপকর্ম দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অভিযোগ রয়েছে, এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসার পর্যন্ত ঘুষের বিনিময়ে জাল সনদধারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মান ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই সব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় সনদ জালিয়াতি একটি সুগভীর সমস্যা।

এই জালিয়াতির প্রথম দায়ী ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধান। কারণ তিনিই প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগের পর তার সনদ যাচাই করে সুপারিশ করেন । যদি তিনি দায়িত্বশীল হতেন, জাল সনদ চিহ্নিত করা কঠিন হতো না। কিন্তু বাস্তবে অনেকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই দায়িত্বে চোখ বন্ধ করে দেন।

পরবর্তী ধাপে উপজেলা শিক্ষা অফিসার নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সনদের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই এখানেই প্রথমে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়।

জেলা পর্যায়ে যাচাই করার সুযোগ থাকে। কিন্তু যদি দুর্নীতি উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু হয়, তাহলে জেলা অফিসেও সেই প্রভাব পৌঁছায়।

এ পর্যায়ে অনুমোদন পেতে সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

শেষ ধাপ হলো মাউশি, যেখানে চূড়ান্ত এমপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। আর্থিক সুবিধা ছাড়া এখানে কাজ হয় না—এমন অভিযোগ বহুদিনের।

এই চেইনের প্রতিটি ধাপে যদি দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেত, তবে কোনোভাবেই জাল সনদধারী শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে পারতেন না। বাস্তবতা হলো—এটি ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, একটি সংগঠিত প্রশাসনিক দুর্নীতি।

জাল সনদ জমা দেওয়া শিক্ষকরা অবশ্যই অপরাধীর মতো বিবেচিত — তারা সরাসরি প্রতারণার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

NTRCA, DSHE ও মাউশির মতো বিভাগগুলোর মাধ্যমে নিয়োগ ও এমপিও স্বীকৃতি পায়। তদন্তে উঠে এসেছে — অনেকে অবৈধভাবে যাচাই সংক্রান্ত দুর্নীতি করে অনুমোদন দিয়ে আসছে, যা প্রক্রিয়ার নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা উভয়কেই আঘাত করেছে ।
শিক্ষকই নয় দায়ীদের মধ্যে সেই অনিচ্ছাকৃত অনুমোদনকারী কর্মকর্তারাও অপরাধী।

প্রকৃত ঘটনা থেকে জানা গেছে, হাজার হাজার শিক্ষক সরকার থেকে পূর্বে বেতন ও ভাতা পেয়েছেন কিন্তু জাল সনদ সনাক্তকরণের পর সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ হয়েছিল ।

শিক্ষক বরখাস্ত করা হলেও অবৈধ অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তেমন কার্যকর হয়নি।

কিন্তু ঐ প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশ ছিলো:

–শিক্ষক নথি যাচাইয়ের অনলাইন ডাটাবেজ সম্পৃক্ত একটি ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম বাস্তবায়ন।

-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি এবং অনুমোদনকারীদের দায়িত্বে সম্মানীহীন পদক্ষেপ ও শাস্তির আওতায় আনা।

-এমপিওভুক্তিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।

-সনদ যাচাইয়ে স্বতন্ত্র তৃতীয় পক্ষের স্বচ্ছ-নিরপেক্ষ যাচাই বিভাগ গঠন।

করণীয়:

-শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শাস্তি নয় — প্রকৃত প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদল প্রয়োজন।

-প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নয়।

-অনেক উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর অনলাইন যাচাই, স্বচ্ছ নিয়োগ বোর্ড, অভ্যন্তরীণ নিয়মিত অডিট এবং মাসিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সতর্ক।
বাংলাদেশেও NTRCA অনলাইনে যাচাই চালু করার পর অন্তত কিছু ক্ষেত্রে জাল সার্টিফিকেটের হার কমেছে বলে জানা গেছে । এই অভ্যাস আরও দৃঢ় করা প্রয়োজন।

একদিকে রয়েছে শিক্ষক ব্যক্তির দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সরকারের দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক অনিয়ম; এ দুটি মিলে তৈরি করছে একটি স্বল্পেন্দ—শিক্ষা ব্যবস্থার মানহানি ও অর্থের অপচয়।

জাল সনদ দিয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক যেমন দোষী, তেমনি যারা অনুমোদন দিয়েছেন তারা নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অপরাধী।

শিক্ষা খাতকে দুর্নীতি মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন:

ডিজিটাল স্বচ্ছতা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি,স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি।

দায় কার—শিক্ষক নাকি প্রশাসন?

এখানেই বড় প্রশ্ন—এই জাল সনদে নিয়োগের দায় কার? শুধু শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে দায়ী? নাকি নিয়োগ ও এমপিও (শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সরকারি অংশ) অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারাও সমান দায়ী?
একজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে হলে তার নিয়োগপত্র, সনদ এবং অন্যান্য যোগ্যতা উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিস, আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস এবং সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদিত হয়। এতগুলো ধাপ পার হয়ে যদি জাল সনদধারী শিক্ষক চাকরি পেয়ে যান, তবে এটিকে নিছক শিক্ষক ব্যক্তির অপরাধ বলা যায় না। এখানে একটি প্রশাসনিক দুর্নীতির চক্র কাজ করছে।

এই বিষয়ে  বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিক্ষক সংগঠনের  শীর্ষ নেতা অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া’র বক্তব্য –
“শিক্ষাক্ষেত্রে যে জালিয়াতি ঘটছে, তার দায় শুধু এককভাবে শিক্ষকের নয়। এখানে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অনিয়ম ও দুর্নীতিও সমানভাবে দায়ী। প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঠিক তদারকি ও দায়িত্বশীলতা না থাকায় এই ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষাক্ষেত্রে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সরকারের উচিত কঠোর নজরদারি ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে শিক্ষক এবং প্রশাসন কেউই দায় এড়াতে না পারে।”

দীর্ঘ দিনের বিচারহীনতা:

সরকার প্রতিবছর শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিতে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়। যদি জাল সনদধারীরা এই সুবিধা পেয়ে থাকে, তবে তা জাতীয় সম্পদের অপচয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুর্নীতিবাজদের শাস্তির প্রত্যাশা থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনের এই বড় ধরনের অনিয়মে এখনো তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জাল সনদধারী শিক্ষককে বরখাস্ত করা হলেও যারা এই যাচাই-বাছাইয়ে অবহেলা বা দুর্নীতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির দুর্লভ।

যেকারণে  থামছে না এই অনিয়ম:

– নিয়োগ ও এমপিও অনুমোদনের সময় সনদ যাচাইয়ের জন্য ডিজিটাল সিস্টেমের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়নি।

– কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা নিয়ে যাচাই প্রক্রিয়ায় চোখ বন্ধ করে অনুমোদন দেওয়া হয়।

– জাল সনদধারী শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় অনিয়মকারীরা উৎসাহিত হয়।

সমাধান যা হতে পারে: 

-নিয়োগ ও এমপিও অনুমোদনের আগে সনদ যাচাইয়ে শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাটাবেসের সঙ্গে অনলাইন সংযোগ স্থাপন জরুরি।

– শুধু শিক্ষক নয়, যারা অনুমোদন দিয়েছেন তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

– মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

– সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেও দায় বহন করতে হবে।

জাল সনদধারী শিক্ষক যেমন অপরাধী, তেমনি যারা এই জালিয়াতিকে বৈধতা দিয়েছে তারাও সমানভাবে দায়ী। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষ ঘুষের বিনিময়ে জাল সনদধারীদের এমপিওভুক্ত করেছেন, তারা শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শত্রু।

এই চক্রের কারণে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে। শিক্ষার মান ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ অযোগ্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই দুর্নীতি শিক্ষা ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার প্রতি আস্থা নষ্ট করেছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল জাল সনদধারীদের শাস্তি দিলেই হবে না। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, সনদ যাচাইয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধ করতে হবে।

অন্যথায়, দুর্নীতি, অপচয় এবং শিক্ষার মানহানি কখনোই থামবে না। এই অপকর্মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়, এটি জাতির মেরুদণ্ড—এ মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে রাষ্ট্রও ভেঙে পড়বে।

লেখক : সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা। 

শিক্ষাবার্তা /এ/০৭/০৮/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.